বাইডেনের অনুমোদিত হামলা চালাল ইউক্রেন : রাশিয়ার পাল্টা আঘাত নিয়ে বিশ্বব্যাপী শঙ্কা

বাইডেনের অনুমোদিত হামলা চালাল ইউক্রেন : রাশিয়ার পাল্টা আঘাত নিয়ে বিশ্বব্যাপী শঙ্কা

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৪, আপডেট ১৫:১০

প্রথমবারের মতো আমেরিকার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার

আসাদ এফ রহমান : হঠাৎ করেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে নিজেদের নীতিতে পরিবর্তন আনে আমেরিকা। রাশিয়ার ভূখন্ডের গভীরে আমেরিকার তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর অনুমতি দেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। যদিও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে গত রবিবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, রাশিয়ার বেশ খানিকটা গভীরে হামলা চালাতে আমেরিকার তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন বাইডেন। কয়েক দিনের মধ্যেই এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রথম হামলাটি চালাবে ইউক্রেন। আর এই খবর ঘিরে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা তুঙ্গে ঠিক তখনই আমেরিকার সরবরাহ করা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেন প্রথমবারের মতো রাশিয়ার ভূখন্ডে হামলা করেছে।

মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) এই হামলা হয়েছে বলে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেন মঙ্গলবার সকালে আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস) ব্যবহার করে রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক এলাকায় হামলা করেছে। পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে ভ‚পাতিত করা হয়েছে এবং একটি ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের কারণে ওই এলাকায় একটি সামরিক স্থাপনায় আগুন ধরেছে বলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানোর কথা ইউক্রেনের গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে এখনো ইউক্রেন সরকারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিবৃতিতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ২৫ মিনিটে এই হামলা চালানো হয়েছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার পর আগুন ধরে যায়। দ্রুত ওই আগুন নেভানো হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। এর আগে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করে যে তারা রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক এলাকায় একটি গোলাবারুদের গুদামে হামলা চালিয়েছে।

তবে এই হামলায় এটিএসিএমএস ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটা তারা নিশ্চিত করেনি। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বলেছে, সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটারের মতো দূরে কারাচেভ শহরের কাছে একটি ডিপোতে ওই হামলা হয়েছে। হামলার পর ১২টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সামরিক বাহিনীর সূত্রের বরাত দিয়ে ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই হামলায় আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এদিকে, এই হামলার আগে মঙ্গলবারই রাশিয়ার পরমাণুনীতিতে পরিবর্তন এনেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাতে বলা হয়েছে, পারমাণবিক শক্তিধর কোনো দেশের সমর্থন নিয়ে রাশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হলে পাল্টা জবাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে মস্কো। এর মধ্য দিয়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র হামলা চালানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করবেন। তিনি শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর পক্ষে। এর দুই মাস আগে আমেরিকা ক্ষেপনাস্ত্র ইস্যুতে অনুমতির এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ক্রেমলিনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এ পদক্ষেপ ‘আগুনে ঘি ঢালার’ মতো। এখন রাশিয়া এর প্রেক্ষিতে কি পদক্ষেপ নেয় তা ঘিরে বিশ্বব্যাপী শঙ্কা জাগছে। তারা কি পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে এটা নিয়েই চলছে আলোচনা।

ভ্লাদিমির পুতিন

পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে রাশিয়া

শহীদ রানা : পারমাণবিক শক্তিধর কোনো দেশের সমর্থন নিয়ে রাশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হলে পাল্টা জবাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে মস্কো। রাশিয়ার পরমাণুনীতি হালনাগাদ করে এমন সুযোগ রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) এই নীতিতে বদল এনেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এমন এক সময় রুশ পরমাণুনীতিতে পরিবর্তন আনা হলো, যখন ইউক্রেনকে আমেরিকার তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভূখন্ডের গভীরে হামলার চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ওই অনুমতির জবাব দিতেই নিজেদের পরমাণুনীতিতে পরিবর্তন এনেছে ক্রেমলিন। আর এরই মধ্যে সেই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলাও চালিয়েছে ইউক্রেন।

কোন কোন হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার নেতারা পারমাণবিক হামলার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবেন, তা উল্লেখ করা হয়েছে হালনাগাদ করা পরমাণুনীতিতে। বলা হয়েছে, প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য আকাশযানকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন রুশ নেতারা। এ ছাড়া কোনো জোটের সদস্যদেশ যদি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালায়, তাহলে পুরো জোটই এই আগ্রাসন চালিয়েছে বলে বিবেচনা করতে পারবে মস্কো।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, একটি পারমাণবিক রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সাথে একটি অ-পারমাণবিক রাষ্ট্রের আগ্রাসনকে যৌথ আক্রমণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের নীতিগুলি পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল।
তিনি জানান, রাশিয়া ‘সব সময় পারমাণবিক অস্ত্রকে প্রতিরোধের উপায় হিসাবে দেখেছে।’ রাশিয়া যদি প্রতিক্রিয়া জানাতে ‘বাধ্য’ মনে করে তবেই সেগুলো মোতায়েন করা হবে।

দিমিত্রি পেসকভ

আগুনে ঘি ঢালতে’ এ পদক্ষেপ: মার্কিন দূরপাল্লার ক্ষেপণাত্র ব্যবহার করতে বাইডেনের অনুমোদনের খবর সামনে আসার পর এ নিয়ে মুখ খুলেছে মস্কোও। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ঘটনা সত্যি হলে এটা স্পষ্ট যে ওয়াশিংটনের বিদায়ী প্রশাসন ‘আগুনে ঘি ঢালতে’ এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে করে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা আরও বেড়ে যাবে। পেসকভ আরও বলেন, এ নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন গত সেপ্টেম্বরেই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকা যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ বেধে যাবে। হামলা হলে তার দায় শুধু ইউক্রেনই নয়, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া দেশগুলোর ওপরও বর্তাবে।

এ বিষয়ে কথা বলেছেন রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির উপপ্রধান ভ্লাদিমির ঝাবারভ। তার মতে, ওয়াশিংটনের এ সিদ্ধান্তের ফলে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বেধে যেতে পারে। আর রাশিয়ার ফেডারেশন কাউন্সিলের সদস্য আন্দ্রেই কলিশাস বলেছেন, পশ্চিমাদের সিদ্ধান্তের কারণে রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

জো বাইডেন

ট্রাম্পমিত্ররা বলছেন -‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বাধাতে চাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন

সাদিত কবির: ইউক্রেনকে রাশিয়ার ভূখন্ডের গভীরে আমেরিকার তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলার অনুমতি দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ওপর চটেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্ররা। এ নিয়ে কড়া সমালোচন করছেন তারা। ট্রাম্পশিবিরে বাইডেনের এই সমালোচকদের মধ্যে রয়েছেন তার ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র, মার্কিন কংগ্রেসে তার দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থী সদস্যসহ আরও অনেকে। তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আগামী জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে বসার আগেই ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বাধাতে চাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন। গত ৫ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন তিনি। সে পর্যন্ত দেশ সামলাবেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আমার বাবা শান্তি প্রতিষ্ঠা ও জীবন বাঁচানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স (সামরিক বাহিনী ও অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো) তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাচ্ছে।

বাইডেনের কড়া সমালোচনা করছেন ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় গোয়েন্দার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে কাজ করা রিচার্ড গ্রেনেলও। তিনি লিখেছেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়ে বাইডেন যে ইউক্রেন যুদ্ধের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন, তা কেউ ধারণা করেননি। বিষয়টি এমন, তিনি নতুন একটি যুদ্ধ শুরু করেছেন। ফলে সব বদলে গেল। আগের সব হিসাব–নিকাশ এখন অকার্যকর। অন্যান্য সমালোচনাকারীর মধ্যে রয়েছেন কট্টর ডানপন্থী কংগ্রেস সদস্য মার্জরি টেইলর গ্রিনি এবং ইউটা অঙ্গরাজ্যের সিনেটর মাইক লি। মাইক বলেছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর জন্য একটি মঞ্চ তৈরি করে দিলেন জো বাইডেন। এটা যেন সত্যি না হয়; আসুন, সেই প্রার্থনা করি।

ম্যাথু মিলার

নীতি পরিবর্তনের বিষয়টি এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়: আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নিজেদের সক্ষমতা ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ করতে ইউক্রেনকে সহায়তা করবে আমেরিকা। এ কথা তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে। মিলার সাংবাদিকদের বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়া ‘আগ্রাসন’ চালিয়েছে, এটাই মূল বিষয়। আমেরিকার নীতি পরিবর্তনের বিষয়টি এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মিলারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোনো প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ শেষের দু-এক মাসে উল্লেখযোগ্য কোনো নীতিগত পরিবর্তন কতটা স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক? উত্তরে মিলার বলেন, বাইডেন ‘চার বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিন বছর ১০ মাসের জন্য নয়’।

আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের এ মুখপাত্র বলেন, আমরা যদি কোনো বিষয়ে আমেরিকার জনগণের স্বার্থ আছে বলে মনে করি, তাহলে আমরা আমাদের মেয়াদের প্রতিটি দিন সেই নীতিগত স্বার্থ অর্জনের জন্য কাজ করব। নবনির্বাচিত সরকার যদি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে চায়, তেমনটি করার অধিকার তাদের অবশ্য আছে। ম্যাথু মিলার বলেন, নতুন সরকারকে প্রথম দুই মাস বর্তমান প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তগুলো হয়তো বজায় রাখতে হবে, এমনটি কেউ মনে করেন না। কোনো প্রেসিডেন্ট এভাবেই তার মেয়াদে কাজ করেন। কোনো একটি সময়ে একজনই প্রেসিডেন্ট থাকেন। যখন নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণ করবেন তখন তিনি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

জেলেনস্কি

নতি স্বীকার করবে না ইউক্রেন: জেলেনস্কি

মহোসু: যুদ্ধের এক হাজার তম দিনে মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) রাশিয়ার আগ্রাসনের কাছে নতি স্বীকার না করার অঙ্গীকার করেছে ইউক্রেন। ইউক্রেইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বলেছে, দখলদারদের কাছে ইউক্রেন কখনও আত্মসমর্পণ করবে না এবং আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের জন্য রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে সাজা দেওয়া হবে। গত সোমবার রাতে ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সামি অঞ্চলে ড্রোন হামলায় এক শিশুসহ ৮ জন নিহত হয় এবং রোববার আলাদা আরেকটি হামলায় ৮৯ জন নিহত হয়। ছোট্ট শহর হালখিভের আবাসিক ভবনে ড্রোন হামলায় দুই শিশুসহ ১২ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেইনের ন্যাশনাল পুলিশ বাহিনী। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এক্সে লিখেছেন, ভবনটি ছিল স্থানীয় স্কুলের একটি ডরমিটরি।

রাশিয়ার এসব হামলার পরই ইউক্রেন যুদ্ধের ১০০০ দিনে এসে নতি স্বীকার না করার অঙ্গীকার করলেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক বিশেষ অধিবেশনেও জেলেনস্কির ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। জেলেনস্কি এক্সে লেখেন, রাশিয়া আমাদের সীমান্ত অঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে। তাদের হামলায় এটিই প্রতিপন্ন হচ্ছে যে, পুতিন চান যুদ্ধ চলতে থাকুক। তিনি শান্তি নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী নন।

ইউক্রেনের জন্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ: ইউক্রেন চাইলে দূরপাল্লার কৌশলগত এ ক্ষেপণাস্ত্র কুরস্কে রুশ ও উত্তর কোরীয় সেনাদের নিশানা করে হামলায় ব্যবহার করতে পারবে। রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় এ অঞ্চল ছাড়া দেশটির ভেতরে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালাতে পারবে ইউক্রেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, কিয়েভ খুব সম্ভবত কুরস্ক ঘিরে রাশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও হামলা চালাবে। আগস্টে ইউক্রেনীয় বাহিনী অভিযান চালিয়ে কুরস্কের ২৮টি বসতির প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে। রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়া থেকে পাঠানো সেনাদের কুরস্কের কাছে মোতায়েন করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখ্য, আমেরিকা ইউক্রেনকে যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, তা ‘আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস)’ নামে পরিচিত। এটির পাল্লা ৩০০ কিলোমিটার (১৯০ মাইল)। ১৯৮০-এর দশকে এর প্রথম উন্নয়নসাধন করা হয়। ইউক্রেনে এটিএসিএমএস সরবরাহ করার আগে গত বছরের অক্টোবরে দেশটিতে স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পাঠায় আমেরিকা। ব্রিটিশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চাথাম হাউসের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ফেলো তিমোথি অ্যাশ বলেছেন, রাশিয়ার অস্ত্র ও সেনা সরবরাহব্যবস্থায় ইউক্রেনের হামলা চালানোর প্রয়োজন। কিন্তু দেশটির নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দিয়ে এটি সম্ভব নয়। অ্যাশের ধারণা, ভবিষ্যতে দর-কষাকষিতে ইউক্রেন যাতে আরও বেশি সুবিধা পায়, সে লক্ষ্যেও দেশটিকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে বাইডেন প্রশাসন।

বিশ্বজুড়ে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়লো

আশিকুর রহমান: দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার গভীরের হামলা চালানোর ফলে যুদ্ধের গতিপথ কতটা বদলাতে পারবে, তা নিয়ে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন, এ সিদ্ধান্ত রুশ সেনাদের ভ‚খø দখলের চলমান সময়টাতে ইউক্রেনকে হয়তো সহায়তা করতে পারবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হলে তা দর-কষাকষিতে কিয়েভকে ভালো অবস্থানে রাখবে। তবে ক্ষমতা নেওয়ার পর ট্রাম্প বাইডেনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। ইউক্রেনকে যে পরিমাণে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সেটার সমালোচনা করে আসছিলেন। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর দ্রæত যুদ্ধ শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে তা কীভাবে করবেন, সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাননি। এদিকে রিপাবলিকান পার্টির কিছু কংগ্রেস সদস্য ইউক্রেনকে আমেরিকার দেওয়া অস্ত্র ব্যবহারের নীতিমালা সহজ করার জন্য বাইডেনকে অনুরোধ জানিয়েছেন। ইউক্রেনের আমেরিকার অস্ত্র ব্যবহারের সীমারেখা শিথিল করা নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। এ ধরনের সিদ্ধান্তকে বড় ধরনের উসকানি বলে মন্তব্য করেছে দেশটি। রুশ আইনপ্রণেতা মারিয়া বুতিনা বার্তা সংস্থাকে বলেছেন, আমেরিকার এ সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে সংঘাত শুরুর ঝুঁকি তৈরি হবে। তা ছাড়া দুই মাস আগেই রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন দূরপাল্লার এসব মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পরিণাম সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে পুতিন বলেছিলেন, যদি এমনটা ঘটে, তবে মনে রাখতে হবে, এ সংঘাতের রূপে বদল আসবে। আমাদের জন্য যে ধরনের হুমকি তৈরি হবে, সে অনুযায়ী আমরা যথাযথ সিদ্ধান্ত নেব।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২০ নভেম্বর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এটিএসিএমএস কী?: দূর পাল্লার এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘আর্মি টেকনিক্যাল মিসাইল সিস্টেম’-( এটিএসিএমএস) নামে পরিচিত। এটি ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য এক ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এ ক্ষেপণাস্ত্র ৩০০ কিলোমিটার (১৮৬ মাইল) পর্যন্ত দূরের নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম। এগুলো আর্টিলারি রকেটের তুলনায় অনেক উঁচুতে ওঠে এবং অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছায়। ক্ষেপণাস্ত্রটির এই পাল্লার কারণেই এটি বিশেষত ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লকহিড মার্টিন কোম্পানি এটিএসিএমএস তৈরি করেছে। এগুলো ট্র্যাকড এম ২৭০ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম (এমএলআরএস) বা চাকাযুক্ত এম ১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (এইচআইএমএআরএস) থেকে নিক্ষেপ করা হয়। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১৫ লাখ ডলার।

এই ক্ষেপণাস্ত্রে দুটি ভিন্ন ধরনের ওয়ারহেডও বহন করানো যেতে পারে।প্রথমটি হল বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে হালকা-সাঁজোয়া ইউনিটগুলো ধ্বংস করার জন্য শত শত ছোট বোমা ভরা একটি ক্লাস্টার ওয়ারহেড। দ্বিতীয়টি হল একটি একক ওয়ারহেড, ২২৫ কেজি ওজনের শক্তিশালী বিস্ফোরক ভরা বোমা, যা বৃহত্তর কাঠামো ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়। এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় কয়েক দশক ধরে রয়েছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রথম এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। আমেরিকার সেনাবাহিনী এর পরিবর্তে পরবর্তী প্রজন্মের ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্র’ ব্যবহার করছে। এটি আরও দ্রæতগতির এবং হালকা ওজনের। প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্র।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading