জনমিতিক পরিবর্তন, বিরূপ জলবায়ু ও দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তর: হুমকিতে শিশুদের ভবিষ্যৎ
উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৪, আপডেট ১৫:৩০
চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি: ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
মো. আসাদুজ্জামান : সারা বিশ্বেই মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যার তুলনায় শিশু জন্মের হার কমছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে শিশুদের নানামুখী সংকট মোকাবিলা করতে হতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে ইউনিসেফ ২০৫০ সালের মধ্যে শিশুদের সম্ভাব্য বিপদগুলো চিহ্নিত করতে ভবিষ্যৎ তিনটি প্রধান কারণ তুলে ধরেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জনমিতিক পরিবর্তন, বিরূপ জলবায়ু ও দ্রæত প্রযুক্তিগত রূপান্তর। এসব তরুণ প্রচন্মের জন্য এক অন্ধকার ভবিষ্যতের ঝুঁকি তৈরি করছে। নীতি নির্ধারকেরা সঠিক ব্যবস্থা না নিলে চলমান সংঘাতের অনিশ্চিত পরিণতির পাশাপাশি এসব বিষয় শিশুদের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
ইউনিসেফ বলছে, বর্তমানে বিশ্বে শিশুর সংখ্যা ২৩০ কোটি। তবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা বেড়ে ১ হাজার কোটিতে পৌঁছালেও শিশুর সংখ্যা প্রায় একই থাকবে। এতে তারা বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশে পরিণত হবে। যেখানে কিছু অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সে অনুপাতে শিশুর সংখ্যা কমে যাবে। তবে সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলে, বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকায় শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। কিছু উন্নত দেশে, ২০৫০ সালের মধ্যে শিশুর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম হয়ে যেতে পারে। গড় আয়ু বাড়াতে ব্যস্ত দেশগুলোতে শিশুদের গুরুত্ব ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ
শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য আরেকটি হুমকি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বর্তমানে যে হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে শিশুরা ২০০০ সালের তুলনায় আট গুণ বেশি তাপপ্রবাহ, তিন গুণ বেশি মারাত্মক বন্যা এবং ১ দশমিক ৭ গুণ বেশি দাবানলের সম্মুখীন হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ইউনিসেফ। এ ছাড়া নতুন প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নতুন উদ্ভাবন ও অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এটি দারিদ্র্য ও ধনী দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যগুলো আরও বাড়িয়ে তুলবে। উন্নত দেশগুলোর আনুমানিক ৯৫ শতাংশ লোকের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, তবে সবচেয়ে কম উন্নত দেশগুলোতে মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেন্ট সংযোগ বা ডিভাইসের অভাবও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
ইউনিসেফ আরও বলেছে, নিম্ন আয়ের দেশের শিশুদের, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধা দূর করার ব্যর্থতা সুবিধাবঞ্চিত প্রজন্মকে ‘পিছিয়ে যাওয়া প্রজন্ম’ হওয়ার পথে এগিয়ে নিতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা শিশু ও তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করে। তারা অনলাইন অপরাধীদের কবলে পড়তে পারে।
শিশুদের বিরুদ্ধেই যেন সংঘাত চলছে
রিন্টু হাসান : ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, শিশুরা অসংখ্য সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। জলবায়ু বিপর্যয় থেকে শুরু করে অনলাইনের ঝুঁকি বাড়ছে। এগুলো ভবিষ্যতে আরও তীব্র হবে। বছরের পর বছর ধরে অর্জিত সাফল্য, বিশেষ করে কমবয়সী মেয়েরা, এখন হুমকির মুখে। ইউনিসেফের গবেষণা বিভাগের উপ-নির্দেশক সেসিল অ্যাপটেল বলেন, ভবিষ্যতের শিশুরা অনেক ঝুঁকির মুখোমুখি হবে। তবে সমাধানগুলো আজকের নীতি নির্ধারকদের হাতে রয়েছে। ইউনিসেফ আশা করছে, নতুন এই যুব জনসংখ্যার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ইউক্রেন কিংবা গাজা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সুদান বা মিয়ানমারের সহিংসতা-সব ক্ষেত্রেই শিশুদের প্রতি অমানবিক হয়ে উঠছে পক্ষগুলো। তবে শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা থামাতে জাতিসংঘ সব সময়ই সোচ্চার। শিশুর প্রতি আগ্রাসনকে ‘গুরুতর লঙ্ঘন (গ্রেভ ভায়োলেশনস)’ বলে অভিহিত করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। শিশুর প্রতি সংঘাত সম্পর্কিত সবশেষ প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘শিশুরা যুদ্ধ সম্পর্কিত সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।’
জাতিসংঘ মহাসচিবের কথা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তব চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব সহিংসতা চলছে, তাতে করে সবচেয়ে বাজে অবস্থায় পড়েছে শিশুরা। হত্যা ও পঙ্গুত্ব, ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, অপহরণ, স্কুলে হামলা ও শিশুসেনা নিয়োগের মতো বহু ঘটনা ঘটছে যুদ্ধকবলিত শিশুদের সঙ্গে। এ ধরনের প্রবণতা যে কাউকে ব্যথিত করে স্বাভাবিকভাবেই।

ক্যাথরিন রাসেল
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কথাই যদি বলি, দেখা যায়-২০২২ সালে দেশটিতে শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণ বেড়েছে ১৪০ শতাংশের বেশি। একইভাবে দক্ষিণ সুদানে শিশুদের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে চলমান আন্তঃসাম্প্রদায়িক সহিংসতা। জাতিসংঘের নথিভুক্ত এমন দেশের তালিকায় রয়েছে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ইসরাইল-ফিলিস্তিন, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইউক্রেন, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনের নাম। ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে চলমান সংঘাতে এরই মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সি প্যালেস্টাইনির সংখ্যাই সিংহভাগ। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, যুদ্ধ সর্বদাই শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। গাজার শিশুদের অবস্থা আরো বিভীষিকাময়। এই অবস্থায় গাজার ১০ লাখেরও বেশি শিশুর জরুরি ভিত্তিতে মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।
ইউনিসেফের ভাষ্য, ‘সব যুদ্ধেই সবার আগে ভুক্তভোগী হয় শিশুরা। সবচেয়ে বেশি কষ্ট ও আঘাত আসে তাদের ওপরেই। যদিও যুদ্ধেরও নিয়ম রয়েছে।’ ইউনিসেফের ভাষায়, ‘যুদ্ধের সময় কোনো শিশুকে প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত নয়… কোনো শিশুকে জিম্মি করা উচিত নয়… হাসপাতাল বা স্কুলগুলোকে অবশ্যই বোমা হামলা থেকে রক্ষা করা উচিত… শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে তার দায় বহন করতে হবে আগামী প্রজন্মকে।’
কৃশকায়তা: উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে
আরাফাত রহমান : শিশুদের অবস্থা নিয়ে ২০২২ সালে করা এক সতর্কবার্তায় ইউনিসেফ বলেছে, কৃশকায় শিশুর সংখ্যা ইউক্রেন যুদ্ধের আগেও বাড়ছিল, যা বিশ্বকে একটি জটিল বৈশ্বিক খাদ্য সংকটে নিমজ্জিত করেছে এবং এই পরিস্থিতি ক্রমেই আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করার আগেই সংঘাত, জলবায়ুজনিত অভিঘাত ও কোভিড-১৯ পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের খাদ্য যোগানের মূলে আঘাত করেছে। বিশ্ব দ্রæত প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যু এবং কৃশকায় শিশুদের একটি ভার্চুয়াল টিন্ডারবক্সে পরিণত হচ্ছে।

বর্তমানে অন্তত ১ কোটি শিশু বা প্রতি ৩ জনে ২ জন শিশু কৃশকায়। কিন্তু তারা এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে পরিচিত তাৎক্ষনিকভাবে ব্যবহারযোগ্য থেরাপিউটিক খাদ্য (আরইউটিএফ) পায় না। ইউনিসেফ সতর্ক করে বলছে, বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তায় ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাব, মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে ভুগতে থাকা দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছু দেশে ক্রমাগত খরা পরিস্থিতির মতো বৈশ্বিক অভিঘাত সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক পর্যায়ে শিশুদের মধ্যে কৃশকায়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করছে। রাসেল বলেন, প্রতি বছর লাখ লাখ শিশুর জন্য এই থেরাপিউটিক পেস্টের প্যাকেটগুলো জীবন ও মৃত্যুর মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করে। বৈশ্বিক খাদ্যের বাজারের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সরবরাহ শৃঙ্খলের শেষ ভাগে আছে নিদারুণ অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা, যাদের জন্য বিষয়টি সামাল দেওয়া একেবারেই সম্ভব নয়।
কৃশকায় শিশুরা তাদের উচ্চতার তুলনায় খুব বেশি শীর্ণ হয়ে থাকে, যার ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এটি অপুষ্টির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান ও মৃত্যুঝুঁকি তৈরির ধরন। বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী অন্তত ১ কোটি ৩৬ লাখ শিশু কৃশকায় অবস্থার শিকার, যার কারণে এই বয়সী শিশুদের প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন মারা যায়। দক্ষিণ এশিয়া কৃশকায়তার ‘কেন্দ্র’ হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে প্রতি ২২ জনের মধ্যে প্রায় ১ জন শিশু কৃশকায়, যা সাব-সাহারা আফ্রিকার তুলনায় তিনগুণ। আর বাকি বিশ্বের দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ হারে কৃশকায়তার সম্মুখীন হচ্ছে।
শিশুদের অবস্থা নিয়ে সতর্কবার্তায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, তুলনামূলকভাবে উগান্ডার মতো স্থিতিশীল দেশগুলোতেও ২০১৬ সাল থেকে কৃশকায় শিশুর সংখ্যা ৪০ শতাংশ বা তার বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে শিশু ও অন্তঃসত্ত¡া নারীদের জন্য খাবারের গুণমান ও পরিমাণে অপর্যাপ্ততা তৈরি হয়েছে। তীব্র চক্রাকার খরা, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সেবা প্রাপ্তির পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত অভিঘাত ক্রমবর্ধমান এই সংখ্যায় অবদান রাখছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, কৃশকায় শিশুদের চিকিৎসায় প্রাপ্ত সহায়তা অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে, যা আগামী বছরগুলোতে আরও কমবে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৮ সালের আগে প্রাক-মহামারি পর্যায়ে পুনরুদ্ধারের আশাও খুব ক্ষীণ। সংক্ষিপ্ত একটি নতুন বিশ্লেষণ অনুসারে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য খাত ওডিএ’র (অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স) মাত্র ২.৮ শতাংশ এবং মোট ওডিএ’র মাত্র ০.২ শতাংশ ব্যয় হয় কৃশকায় শিশুদের চিকিৎসায়।
প্রতিটি কৃশকায় শিশুকে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ইউনিসেফ আহ্বান জানাচ্ছে: বেশি সংখ্যক কৃশকায় শিশু থাকা শীর্ষ ২৩টি দেশের এই অসুস্থ শিশুদের কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকারগুলোকে ২০১৯ সালের ওডিএ’র চেয়ে অন্তত ৫৯ শতাংশ বেশি সহায়তা প্রদান করতে। দেশগুলোকে স্বাস্থ্য খাতের আওতায় কৃশকায় শিশুদের চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন তহবিল ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে, যাতে শুধু মানবিক সংকটময় পরিস্থিতিতে থাকা শিশুরা নয়, বরং সব শিশুই চিকিৎসা কর্মসূচি থেকে উপকৃত হতে পারে।
বৈশ্বিক ক্ষুধা সংকট মোকাবিলায় অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৃশকায়তায় আক্রান্ত শিশুদের জরুরি প্রয়োজনগুলো মেটাতে থেরাপিউটিক ফুডের ব্যবস্থা করার জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ যাতে থাকে তা নিশ্চিত করতে। দাতাদের সহায়তার বৈচিত্র্যময়, ক্রমবর্ধমান এবং স্বাস্থ্যকর ইকোসিস্টেম নিশ্চিত করার জন্য দাতা ও সুশীল সমাজের সংস্থাগুলো কৃশকায় শিশুদের চিকিৎসার জন্য তহবিল প্রদানকে অগ্রাধিকার দিতে। একটি শিশুর মারাত্মক কৃশকায় হওয়ার কোনো কারণ নেই, বিশেষ করে যখন আমাদের এটি প্রতিরোধ করার সামর্থ্য রয়েছে। তবে খারাপ পরিস্থিতি অধিকতর খারাপ হওয়ার আগেই অপুষ্টি প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার জন্য একটি বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে পুনরুজ্জীবিত করতে সময় খুব বেশি নেই।
আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি: নেতিবাচক প্রভাব
আরেফিন বাঁধন : প্রযুক্তি যেমন বিজ্ঞানের একটি অবিস্মরণীয় আবিষ্কার তেমনি এর ঝুঁকিও অনেক। আর তা যদি হয় শিশুর ক্ষেত্রে, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য হুমকি। একটি শিশু যখন খুব সহজেই হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন পেয়ে যায় তখনই সে নানা খারাপ সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতে থাকে। যা তাকে ধীরে ধীরে বিপথে নিয়ে যেতে পারে। ইন্টারনেটে অবাধ আনাগোনা তাকে নানা খারাপ সাইটগুলো সম্পর্কে ধারণা দেয়। যাতে তার কোমল মনে শুরু থেকে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থেকে গেম খেলা তাদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। দীর্ঘ সময় প্রযুক্তির ব্যবহার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ করে আনে অনেক সময়। যার ফলে খুব কম বয়সে চোখে কম দেখা শুরু হয়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুকে উচিৎ প্রযুক্তি থেকে দূরে রেখে বই কিংবা পরিবারে সঙ্গে সময় কাটাতে অভ্যস্ত করা।
ইউনিসেফ বরছে, নতুন প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নতুন উদ্ভাবন ও অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এটি দারিদ্র্য ও ধনী দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যগুলো আরও বাড়িয়ে তুলবে। উন্নত দেশগুলোর আনুমানিক ৯৫ শতাংশ লোকের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, তবে সবচেয়ে কম উন্নত দেশগুলোতে মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়। নিম্ন আয়ের দেশের শিশুদের, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধা দূর করার ব্যর্থতা সুবিধাবঞ্চিত প্রজš§কে ‘পিছিয়ে যাওয়া প্রজন্ম হওয়ার পথে এগিয়ে নিতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা শিশু ও তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করে। তারা অনলাইন অপরাধীদের কবলে পড়তে পারে।

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, অতিমাত্রায় প্রযুক্তি ব্যবহারে খাওয়া-দাওয়া, ঘুম এবং স্বাভাবিক দৈনন্দিন কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটছে। শুধু তাই নয়, ভিডিও গেইমের আদলে, শিশুদের মধ্যে বিশেষ রকমের আক্রমণাত্মক মনোভাব পরিলক্ষিত হয়, যেখানে এই বয়সে শিশুদের কাছে প্রত্যাশা থাকে সহানুভ‚তিশীল হওয়ার, সহমর্মী হওয়ার বোধগুলো ধীরে ধীরে জেগে উঠার। অপরদিকে, ভার্চুয়াল জগতের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায়, বাস্তব জীবনে পরিবার-পরিজনের, প্রতিবেশী, বন্ধুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, ভার্চুয়াল জীবনের বন্ধু-বান্ধব, যাদেরকে হয়তো বাস্তবে কখনো দেখার সুযোগই হয়নি। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাøের পরিবর্তে মুখ্য হয়ে উঠছে তথাকথিত অনলাইন অ্যাকটিভিটিজ।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুবান্ধব পরিবেশ, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও পরিচর্যায় দায়িত্বশীল সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে প্রযুক্তির কড়াল গ্রাসে অচিরেই বর্তমান প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাবে। বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের বিনোদনের একমাত্র সঙ্গী হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরাই এখন গেমিংয়ে আসক্ত হয়ে পড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত গেমিংয়ে আসক্তির ফলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বাড়ছে নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের অনুভ‚তি। এছাড়া টেলিভিশনের ‘কার্টুন’, ‘অ্যানিমেশন’, ‘ফেসবুক’, ‘কম্পিউটার’, ‘ল্যাপটপ, ‘ইন্টারনেট’, ‘টুইটার’- এসবে বুঁদ হয়ে আছে বর্তমান প্রজšে§র শিশু-কিশোররা। ফলে শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটছে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : ইউনিসেফ’র পূর্বাভাস
কিফায়েত সুম্মিত : শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য আরেকটি হুমকি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বর্তমানে যে হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে শিশুরা ২০০০ সালের তুলনায় আট গুণ বেশি তাপপ্রবাহ, তিন গুণ বেশি মারাত্মক বন্যা এবং ১ দশমিক ৭ গুণ বেশি দাবানলের সম্মুখীন হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ইউনিসেফ। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম অরক্ষিত দেশের একটি। জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে সামাজিক সমস্যাগুলোকে প্রকট করছে তাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক করে ইউনিসেফ একাধিকবার বলেছে শিশুদের ইতিমধ্যে এ গ্রহে যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে তার পাশাপাশি একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিশুদের বেঁচে থাকার ও বিকাশের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ অর্জনকেই ক্ষুণ্ন করে দিতে পারে। চরম আবহাওয়াগত পরিস্থিতি ও বাতাসে বিষাক্ততা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও আকস্মিক বন্যা- সবকিছুই এ সংকটের অংশ এবং অসামঞ্জস্যহীনভাবে দরিদ্রতম, সবচেয়ে অরক্ষিত শিশুরাই এসবে আক্রান্ত হচ্ছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২১ নভেম্বর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
ইউনিসেফের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিধ্বংসী বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশে ১ কোটি ৯০ লাখের বেশি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যতকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ যা দরিদ্র বাংলাদেশিরা তাদের ঘরবাড়ি, আত্মীয়-স্বজন ও নিজের সামাজিক গোষ্ঠীদের ফেলে অন্যত্র নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিশুদের ঝুঁকি বড়দের চেয়ে বেশি। গরম ও অন্যান্য জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বড়দের তুলনায় তাদের কম। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তাদের ডায়রিয়া ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। পুষ্টিহীনতায় ভোগারও ঝুঁকি থাকে এসব শিশুদের।
অনেকে ঢাকা ও অন্য বড় শহরগুলোতে যাচ্ছে, যেখানে শিশুদের বিপজ্জনক শ্রম বা বাল্যবিয়ের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ৬০ লাখ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসী রয়েছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। এছাড়া, উপক‚লীয় অঞ্চলে বসবাসকারী আরও ৪৫ লাখ শিশু নিয়মিত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দ্বারা আক্রান্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম অরক্ষিত দেশের একটি। জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে সামাজিক সমস্যাগুলোকে প্রকট করছে তাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি সংকটে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়। জলবায়ু পরিবর্তনও তার ব্যতিক্রম নয়। যে সময়টাতে মানুষ বিকাশিত হয়, সেই বয়সটাই শিশু বয়স। নিঃসন্দেহে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে বহুমুখী পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, সেটা থেকে শিশুরাও রক্ষা পাবে না। সেজন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিকল্পনার ক্ষেত্রে শিশুদের বিষয় আলাদা করে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
ইউডি/এজেএস

