চাহিদা ১০ হাজার ৬০০ টন বিএডিসির বরাদ্দ ২৭৩
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০২ ডিসেম্বর, ২০২৪, আপডেট ১১:০০
রবি মৌসুমের শুরুতে সার ও আলু বীজের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে। লালমনিরহাটে বীজ আলুর চাহিদা যেখানে ১০ হাজার ৬০০ টন, সেখানে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ২৭৩ টন। এটি চাহিদার মাত্র আড়াই শতাংশ। রাজারহাট উপজেলার অবস্থা আরও করুণ। এখানে ৩ হাজার ৮৭৭ টন বীজ আলুর বিপরীতে বিএডিসি ডিলাররা পেয়েছেন মাত্র ৬৪ টন, যা চাহিদার মাত্র দেড় শতাংশ। এ ছাড়া সুযোগ পেয়ে প্রতি বস্তা সারে কয়েকশ টাকা করে বেশি নিচ্ছেন ডিলাররা।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করে কৃষকরা হন্যে হয়ে খুঁজছেন সার ও বীজ আলু। তবে চড়া দামে সার মিললেও আলুর বীজ কোনোভাবেই মিলছে না। কৃষকদের অভিযোগ, বেশি দামে বিক্রির জন্য অধিকাংশ ব্যবসায়ী তাদের দোকান বা গুদামে সার ও বীজ রাখছেন না। কৃষকের সঙ্গে দামে দফারফা হলে অজ্ঞাত স্থান থেকে আসছে সার ও বীজ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাজারে দাম বেশি হওয়ায় চলতি মৌসুমে কৃষক আলু আবাদে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বীজ ব্যবসায়ী ও সার কোম্পানিগুলো কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে
চড়া দাম নিচ্ছে। এ ছাড়া উচ্চমূল্য পাওয়ায় হিমাগারে রাখা বীজ অনেকে খাবারের আলু হিসেবে বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। এটিও সংকটের অন্যতম কারণ।
লালমনিরহাটের কৃষকরা জানান, গত বছর কার্ডিনাল ও গ্রানালো আলুর বীজ ৪৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এবার তা ৯০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশের বাইরে থেকে আসা বীজ আলুর দামও অস্বাভাবিক। স্ট্যারিস বা স্টিক (হল্যান্ড) জাতের বীজ আলু ৫০ কেজির কার্টুন বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা, যা গত বছর ছিল ১৮ হাজার টাকা। ডায়মন্ড জাতের আলু বীজের দাম দ্বিগুণ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকায়। দেশীয় প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ও কিষান আলু বীজও কার্টুনপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। বিএডিসি অনুমোদিত ডিলার এবং হিমাগারে বীজ না পেয়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই কৃষকরা এমন অস্বাভাবিক দাম গুনছেন।
সারের বাজারেও চলছে কারসাজি। লালমনিরহাট সদর ও আদিতমারী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি মূল্য অনুযায়ী দেশি টিএসপি প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকার বিপরীতে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি (তিউনিশিয়া) ১ হাজার ৪০০ টাকার বিপরীতে ১ হাজার ৭৫০ টাকা, পটাশ ১ হাজার টাকার স্থলে ১ হাজার ২৫০, ডিএপি (ড্যাপ) ১ হাজার ৫০ টাকার স্থলে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আদিতমারী উপজেলার সাকোঁয়া গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, উচ্চমূল্যে সার কিনে জমি তৈরি করেছেন। কিন্তু আলু বীজ কিনতে পারছেন না। একই গ্রামের এক দোকানদার বলেন, যে যেভাবে পারছে সেভাবে সার বিক্রি করছে।
লালমনিরহাটের মোস্তফি কোল্ডস্টোরের তত্ত্বাবধায়ক আখের বলেন, বীজের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকে বলা মুশকিল। বাজারে দাম বেশি হওয়ায় অনেক কৃষক বীজ আলু বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে বীজ আলু পাওয়া যাচ্ছে না।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি। সেই হিসাবে বীজ আলুর চাহিদা ১০ হাজার ৬০০ টন। লালমনিরহাট বিএডিসি জানিয়েছে, জেলায় তারা বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র ২৭৩ টন বীজ আলু।
রাজারহাট উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জানা যায়, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উপজেলায় ২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষে লাগবে ৩ হাজার ৮৭৭ টন বীজ। কিন্তু উপজেলায় বিএডিসির ২৫ ডিলার সব মিলিয়ে পেয়েছেন মাত্র ৬৪ টন আলু বীজ।
এদিকে বিএডিসির ডিলাররাই প্রায় দ্বিগুণ
দামে বীজ বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন রাজারহাটের কৃষকরা। সর্বোচ্চ ৬৬ টাকা কেজি দরে বীজ বিক্রির নিয়ম থাকলেও কেউ মানছেন না। অধিকাংশ ডিলারই দাম হাঁকাচ্ছেন ১০০ টাকার ওপরে।
অবশ্য উপজেলায় বিএডিসির ডিলার তপুর দাবি, সামান্য বরাদ্দ পাওয়ায় অনেক আগেই বীজ আলু বিক্রি শেষ হয়েছে। আর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, বিএডিসি বরাদ্দ কম দেওয়ায় কিছু ডিলার অন্য কোম্পানির আলু বীজ বিক্রি করছেন। সে ক্ষেত্রে দাম কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে তদারকি চলছে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইখুল আরেফিন জানান, হিমাগারে ৭ হাজার টন বীজ আলু মজুত ছিল। তবে অনেকে খাবারের আলু হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সিন্ডিকেটের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন।
রংপুর বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক (সার) নির্মাল্য কুমার দাস বলেন, পরিবহনজনিত কারণে সার সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
ইউডি/কেএস

