পানির স্তর নেমেছে, বোরো আবাদ না করার পরামর্শ
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৪, আপডেট ১০:২০
আসন্ন মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আটটি ইউনিয়নসহ উঁচু এলাকায় বোরো ধানের আবাদ না করার পরামর্শ দিয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নেমে যাওয়ায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব জায়গায় গমসহ কম সেচের ফসল আবাদে উৎসাহিত করছে তারা। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রচার চালানো হচ্ছে। এ জেলার বাইরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর, সাপাহার ও পোরশায় একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও গোমস্তাপুরের আংশিক এবং নাচোলের বড় অংশজুড়ে এ আট ইউনিয়ন। কৃষকরা বলছেন, আকস্মিক এমন ঘোষণা দেওয়ায় তারা বিপদে পড়েছেন। ধানচাষ নিরুৎসাহিত করে লিফলেট বিতরণ ও প্রতি স্কিমে ডিপ থেকে পানি দেওয়ার কর্মঘণ্টা বেঁধে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আমন ধান ঘরে তোলার পর বোরো আবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নাচোলের মনিরুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, হঠাৎ পানির কর্মঘণ্টা বেঁধে দেওয়ায় তারা বিপদে পড়েছেন। ধানের আবাদে প্রতি স্কিমে প্রায় ২ হাজার ঘণ্টা পানি লাগবে। কিন্তু বিএমডিএ এবার ৯৮০ ঘণ্টা দেবে। এতে আবাদ সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি কম জমিতে ধানের আবাদ করবেন।
বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এলাকার নলকূপের পানির স্তর ১০০ ফুট। কিন্তু এ স্তরে ঠিকমতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বোরো ধানে সেচ লাগে ১১-১৮টি। সময় লাগে গড়ে ২ হাজার ঘণ্টা। গমে লাগে মাত্র দুই-তিনটি সেচ। কয়েক বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তাতে ভূগর্ভে পানির স্তর তেমন বাড়ে না। এসব এলাকায় গড় বৃষ্টির চাহিদা ১ হাজার ৩০০ মিলিমিটার। কয়েক বছর গড়ে ১ হাজার ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে ২০০ মিলিমিটার গড়িয়ে চলে যায়। ঘাটতি থাকে ৪০০ মিলিমিটার।
এ পরিস্থিতিতে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্র অঞ্চল মরূকরণ থেকে বাঁচাতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঝিলিম, গোমস্তাপুরের রাধানগর ও পার্বতীপুর এবং নাচোলে ধানের আবাদে নিরুৎসাহিত করছে বিএমডিএ। শিবগঞ্জ পৌর এলাকার পিঠালীতলা গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম বাচ্চু জানান, তিনি নাচোলের জমি থেকে যে ধান পেতেন, তা দিয়ে সারা বছরের খাবারের সংস্থান হতো। হঠাৎ পানি নিয়ে এমন সিদ্ধান্তের পর সারা বছর কী খাবেন, তা নিয়ে উদ্বেগে আছেন।
সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের কৃষক রাসেলের ভাষ্য, বিএমডিএর এমন সিদ্ধান্তের পর পাঁচ বিঘা জমির মধ্যে দুই বিঘায় আবাদ করতে পারবেন। এতে কাজ কমে যাওয়ায় সমস্যায় পড়বেন তারা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় অনেক নলকূপ হুমকিতে রয়েছে। এসব পুনর্খনন বা পুনর্বাসন করতে হচ্ছে। এটি ভালো উদ্যোগ হলেও আকস্মিক করা ঠিক হয়নি। তারা বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারতেন। এ সিদ্ধান্তে চালের সংকট ও দাম বাড়তে পারে।
স্থানীয় শফিকুল ইসলামের স্কিমে ১৪০ বিঘা জমি রয়েছে। এর মধ্যে গত বছর ১০০ বিঘায় বোরোর আবাদ হয়েছিল। এ বছর মাত্র ২০ বিঘায় আবাদ করা হবে। তিনি বলছিলেন, মানুষ ভাত বেশি খায়, গম খায় কম। তাই ধানের আবাদ হলে কৃষকের জন্য ভালো। এখন অগ্রহায়ণ মাসে ১ হাজার ৪৫০ টাকা মণ ধান। বোরোর আবাদ না হলে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা হয়ে যাবে।
নাচোলের নলকূপ চালক আব্দুস সাত্তার বলেন, বিএমডিএর চেয়ারম্যানের উদ্যোগে এ পরিস্থিতি থেকে টেকসই সেচ ব্যবস্থাপনায় ফিরতে উপকারভোগী কৃষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে দু’দফা মতবিনিময় হয়েছে। বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় বোরোতে ৯৮০ ঘণ্টা সেচের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। মরূকরণের হাত থেকে রক্ষায় এসব এলাকায় গভীর নলকূপ পুনর্বাসন করা যাবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বোরো ধানের আবাদে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করায় এবার গমের আবাদ বাড়বে বলে জানান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. পলাশ সরকার। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে কৃষককে ডাল, গম, ভুট্টা জাতীয় ফসল চাষ করতে বলা হয়েছে। তবে সিদ্ধান্তটি আগে জানলে ভালো হতো।
চাঁপাইনববাগঞ্জ বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুনুর রশীদ বলেন, দীর্ঘদিন ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপক হারে উত্তোলনের ফলে স্তর নিচে নেমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বোরোর মতো বেশি সেচের আবাদ না করে কম পানি লাগে– এমন ফসল চাষাবাদের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। গম, যব, ভুট্টা, সরিষা, ছোলা, মাষকলাইসহ শাকসবজি আবাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ক্যাশক্রপ ও হর্টিকালচারাল ক্রপ বিশেষ করে আম, পেয়ারা, ড্রাগন, বরই, মালটার বাগানও তৈরি করা যেতে পারে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুনুর রশীদের ভাষ্য, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের অধ্যাপক জেন রুস্তুন তাঁর গবেষণায় মত দিয়েছেন, উঁচু এলাকা টেকসই করতে হলে ভূমির উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি পরিবর্তিত ফসল চাষাবাদ করতে হবে। এর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ডব্লিউএআরপিওর মাধ্যমে গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডব্লিউএমকে দিয়ে গবেষণা করেছে। সব মিলিয়ে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে ৯৮০ ঘণ্টা সেচ কার্যক্রম চালোনোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ইউডি/কেএস

