আইএমএফের বাড়তি ঋণের সমঝোতায় দ্বিধান্বিত সরকার
উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৪, আপডেট ০৮:০০
চলমান ঋণ কর্মসূচির অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার চাইলে প্রাথমিকভাবে ১ বিলিয়ন ডলারের কম দিতে রাজি হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে এ বাড়তি ঋণের জন্য বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিসহ বেশকিছু কঠিন শর্ত আরোপ করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। এ অবস্থায় বাড়তি ঋণ নেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বিধান্বিত সরকার। তাই ঢাকা সফররত আইএমএফ মিশনের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছাতে আরও এক দিন বেশি সময় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ গতকাল মঙ্গলবারের পরিবর্তে আজ বুধবার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। এরপর তিন কিস্তিতে সংস্থাটি থেকে প্রায় ২৩১ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সাল নাগাদ পুরো অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে। এর বাইরে সংস্থাটি থেকে সম্প্রতি আরও ৩০০ কোটি ডলার ঋণের আবেদন করে বাংলাদেশ। চলমান ঋণ কর্মসূচির চতুর্থ কিস্তি ছাড়ের আগে শর্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা ও নতুন ঋণের বিষয়ে দরকষাকষি করতে ৩ ডিসেম্বর থেকে আইএমএফ গবেষণা বিভাগের ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রোইকোনমিকসের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিওর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করছে। মিশনটি চতুর্থ কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে অনেকটা ঐকমত্যে পৌঁছালেও নতুন ঋণের বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত আরোপের কথা বলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ঋণের শর্ত হিসেবে রাজস্ব আদায় ও নীতি গ্রহণ সংস্থাকে আলাদা করতে হবে। কারণ একই প্রতিষ্ঠান দুই কাজ করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিকভাবে ছাড় দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ থাকে। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারও এটি করতে চায়। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে আরও শক্তিশালী করে আলাদা সচিব নিয়োগ দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। যার নেতৃত্বেই হবে রাজস্ব সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন। আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের দায়িত্বে থাকবে।
বর্তমানে একজনই অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আবার এনবিআরও এটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে চায় না। তাই এটি কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তা ছাড়া নতুন ঋণের শর্তে করছাড় আরও কমিয়ে আনার পাশাপাশি ভ্যাটহার এক স্তরে নামিয়ে আনার বিষয়টিও থাকছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ভর্তুকির চাপ কমিয়ে আনতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মতো জনসম্পৃক্ত কঠিন শর্তও সংযুক্ত করার কথা রয়েছে। তবে সরকার অন্তত আগামী জুন পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় না। এর বাইরে আরও কিছু শর্তের পাশাপাশি চলমান ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলোও অব্যাহত থাকবে।
এদিকে প্রায় আড়াই মাস আগে যখন বাড়তি তিন বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়, তখন দেশে বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থা বেশ নাজুক ছিল। বর্তমানে এ অবস্থা বেশ উন্নতি হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহও ভালো। এ অবস্থায় এসব কঠিন শর্তে বাড়তি মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার নিবে কিনা, তা নিয়ে দ্বিধান্বিত সরকার। এসব শর্ত ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তি ঋণের বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টার দেখা করেন। প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শের ভিত্তিতে আইএমএফ মিশনের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে প্রধান উপদেষ্টা কী পরামর্শ দিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে প্রতিটি কিস্তি পেতে বেশকিছু শর্ত পরিপালন করতে হচ্ছে। চতুর্থ কিস্তির জন্য গত জুনভিত্তিক দেওয়া বিভিন্ন শর্তের মধ্যে কর-রাজস্ব সংগ্রহ ছাড়া সব শর্ত পূরণ হয়েছে। তাই এবার মিশনের অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের সঙ্গে বৈঠকে বারবারই উঠে এসেছে কর আহরণ বাড়ানোর বিষয়টি। চলতি অর্থবছরেই অতিরিক্ত ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বলেছে মিশন। এ লক্ষ্য অর্জনে বেশকিছু পণ্যে হ্রাসকৃত হারের ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
এদিকে চলমান কর্মসূচির চতুর্থ কিস্তিতেও বাড়তি ডলার পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম কিস্তি ছাড় করার পর পরবর্তী অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে ছাড় করার কথা ছিল। সে হিসেবে প্রতি কিস্তির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০ কোটি ডলার। কিন্তু বাংলাদেশ ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ করলে সংস্কার কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে তৃতীয় কিস্তিতে ১১৫ কোটি ডলার ছাড় করে আইএমএফ। সফররত মিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আগামী জানুয়ারি মাস নাগাদ চতুর্থ কিস্তিতেও প্রায় ১১০ কোটি ডলার পাবে বাংলাদেশ। চতুর্থ কিস্তিতেও বাড়তি ডলার দেওয়ার বিষয়ে মিশন ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
ইউডি/কেএস

