রাতে সক্রিয় সিন্ডিকেট কেটে নিচ্ছে টপ সয়েল

রাতে সক্রিয় সিন্ডিকেট কেটে নিচ্ছে টপ সয়েল

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি, ২০২৫, আপডেট ০৯:০০

দিনের আলোয় দেখা মেলে না কারও। তবে রাত হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। ভোর পর্যন্ত অবৈধভাবে চলে মাটি কাটার কর্মযজ্ঞ। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এভাবে এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে নিচ্ছেন চক্রের সদস্যরা। উর্বর মাটি ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থান ভরাটের কাজে বিক্রি করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এসব পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত গাড়িতে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রামীণ পাকা সড়ক।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অবৈধভাবে মাটি কাটা বন্ধে সম্প্রতি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযানসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এরপর দিনের বেলায় চক্রের সদস্যরা নিষ্ক্রিয় থাকলেও রাতের বেলায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে বিভিন্ন ফসলের আবাদ করেন কৃষক। এসব ফসল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। পাট, পেঁয়াজ, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁচামরিচ, ধানসহ নানান ধরনের ফসলের আবাদ করেন তারা। তবে মাটি কেটে নেওয়ায় প্রতি বছর আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে কৃষকের দীর্ষস্থায়ী ক্ষতি হলেও মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন মাটি ব্যবসায়ীরা।

সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার সাতগাছিয়া গ্রামের ধানের জমি থেকে এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কেটে পুকুর খনন করা হচ্ছে। জমির মালিক সাদিকপুর গ্রামের মোস্তফা কামালের ভাষ্য, মাটি কাটার কাজ করছেন তারেক নামে সাব-কনট্রাক্টর। তিনি ডিসি অফিস থেকে অনুমোদন নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ৮ থেকে ১০টি ট্রাক্টরে এসব পরিবহনের কাজ হচ্ছে।
জায়গাটিতে আগে সমতল জমি ছিল বলে জানান গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন। তবে পুকুর কাটায় প্রায় ২০০ বিঘা জমির আবাদ নষ্ট হবে অভিযোগ করে তিনি বলেন, গ্রামের লোকজন প্রথমে বাধা দিয়ে পুকুর কাটা বন্ধ করেছিল। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের সহযোগিতা করায় আবার এ কাজ শুরু করেছে। পুকুর খনন করায় অন্য কৃষকরা উদ্বেগে আছেন।

ডিসি অফিস থেকে অনুমোদন নিয়ে মাটি কাটার কাজ করছেন বলে দাবি করেন সাব-কনট্রাক্টর তারেক রহমান। এ সময় অনুমোদনের কাগজ দেখতে চাইলে ‘আবেদন করেছি’ বলে তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, মাটি বিক্রি করছেন জমির মালিক মোস্তফা কামাল। এসব ছয় লেন সড়ক নির্মাণের কাজে ব্যবহার হচ্ছে। তবে এ মাটি ইটভাটাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলায় কয়েকটি শক্তিশালী মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা দরিদ্র কৃষককে নানান প্রলোভন দেখিয়ে উর্বর অংশের মাটি কিনে নিচ্ছেন। অসচেতনতায় অনেকে নগদ অর্থ পেতে বিক্রি করছেন। কৃষিজমি থেকে কেটে নেওয়া মাটি বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রলি। এতে গ্রামীণ সড়কে খানাখন্দ তৈরি হচ্ছে। একপর্যায়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ট্রলি চলাচল করায় আবাদি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপজেলার সুন্দরপুর দুর্গাপুর ইউনিয়নের ভাটপাড়া, বেজপাড়া, ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের সিমলা ও কালুখালী, নিয়ামতপুর ইউনিয়নের দাপনা এবং পৌরসভার বাকুলিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বেশির ভাগ মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়। বাকুলিয়া গ্রামের মাসুদ রানার ভাষ্য, সিন্ডিকেটের সদস্যরা ট্রাক্টরের লাইট জ্বালিয়ে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত মাটি কাটে। সাত-আটটি ট্রাক্টর পরিবহনের কাজ করে।

জমির উপরিভাগের মাটি বা টপ সয়েল ফসল উৎপাদনের জন্য খুবই দরকারি বলে জানান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সয়েল মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড বায়োকেমিস্ট্রি শাখার কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম জগলুল পাশা। তিনি বলেন, যদি টপ সয়েল বা জৈব উপাদান কেটে ফেলা হয়, তাহলে সে জমিতে আর ভালো ফসল আশা করা যাবে না।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেদারুল আলম বলেন, কৃষিজমির মাটি কাটার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এটি বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading