সয়াবিন তেলে নৈরাজ্য, পণ্যের চড়া দামে অস্বস্তিতে ক্রেতা

সয়াবিন তেলে নৈরাজ্য, পণ্যের চড়া দামে অস্বস্তিতে ক্রেতা

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০৩ মার্চ, ২০২৫, আপডেট ১৪:১০
প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানে স্বস্তি নেই বাজারে। অধিকাংশ ইফতারি পণ্যের চড়া দাম ক্রেতাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। ক্রেতাদের অভিযোগ-শসা, বেগুন ও লেবুর দাম রাখা হচ্ছে বেশি। আবার পেঁয়াজু, আলুরচপ বানাতে প্রয়োজন সয়াবিন তেল। পণ্যটি ঘিরে নৈরাজ্য চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বাজারে সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। যেখানে পাওয়া যাচ্ছে সেখানেও তেলের চড়া দাম।

রমজান এলেই হাতের নাগালের বাইরে চলে যায় সব খাদ্যপণ্যের দাম। বিশেষ করে বুট, ছোলা, ডাল, চিনি, মরিচ ও মাছ-মাংসের দাম হয়ে যায় দ্বিগুণ। ফলে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে বছরের এই সময়টায় একটু ভালো কিছু খাওয়ার চেষ্টা কষ্টকর হয়ে যায়। তবে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে হলেও বাধ সেধেছে ভোজ্যতেল সয়াবিন। বলতে গেলে বাজার থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল একপ্রকার ‍উধাও।

গত ডিসেম্বরে বিশ্ববাজারে ক্রুড সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতি টন ১২শ’ ডলার। সেটি এখন নেমে এসেছে ১ হাজার ৯৯ ডলারে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের দাম কমেছে টনপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি। প্রায় একই হারে বিশ্ববাজারে দাম কমেছে পাম অয়েলেরও। অথচ উল্টো পথে হাঁটছেন দেশের ভোজ্য তেল ব্যবসায়ীরা। বিশ্ববাজারে দাম কমে এলেও দেশের বাজারে আবারও ভোজ্য তেলের দাম বাড়াতে চান ব্যবসায়ীরা।

এ জন্য চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ট্যারিফ কমিশনে লিটারে ১২ থেকে ১৫ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে ভোজ্য তেল মিল মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে। আর প্রতিবারের ন্যায় এবারও ট্যারিফ কমিশনে প্রস্তাব পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজারে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে সরবরাহ কমানো হয় ইচ্ছাকৃতভাবে। সংকট তৈরি করে ইতিমধ্যে খোলা সয়াবিন তেলে কেজিতে ১৫ টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন মিল মালিকরা। আর বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ এখনও তারা কমিয়ে রেখেছেন।

জানা গেছে, বোতলজাত সয়াবিনেরও দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে দুয়েক দিনের মধ্যে বাজারে সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অথচ ট্যারিফ কমিশন ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।

অন্যদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এভাবে বারবার ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানো দেশের মানুষের ওপর জুলুম হিসেবে উল্লেখ করে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা প্রতিবার দেশের মানুষকে জিম্মি করে ভোজ্য তেলের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে-এবারও সেটি করবে। সরকারও তাদের ছলচাতুরি ধরতে পারছে না, ধরতে চাইছেও না। সে রকম কোনো লক্ষণও দেখছি না। দেশের বাজারে এখন দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ বিশ্ববাজারে কমে এসেছে ভোজ্য তেলের দাম। তারপরও কেন দাম বাড়াবে তারা। আসলে ব্যবসায়ীরা কৌশল করে দাম বাড়ানোর আবদার করছে, সরকারও ব্যবসায়ীদের সে ফাঁদে পা দিচ্ছে। সরকার কোনো যাচাই-বাছাই করছে না, তাদের দাবি মেনে নিয়ে দাম বাড়াচ্ছে। এভাবে তো চলতে পারে না।’

জানা গেছে, গত বছরের অক্টোবর আর নভেম্বরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম দুই দফা বাড়ে। বুকিং রেট দাঁড়ায় ১১৪৫ ডলারে। ডিসেম্বরে সেই দাম আবারও কমে ১ হাজার ৬৪ ডলার হয়। দেশের বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ রাখতে দুই দফা শুল্ক কমায় সরকার। তারপরও ডিসেম্বরে দেশে সয়াবিন তেলের দাম না কমে, উল্টো লিটারে ৮ টাকা বাড়ানো হয়।

এরপর কিছুদিন সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। গত সপ্তাহখানেক ধরে তা আবার কমেছে। মুদি দোকানগুলোতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের চিরচেনা কার্টনের স্তূপ নেই। বরং রাইস ব্র্যান আর সানফ্লাওয়ার তেলের দেখা মিলছে। ডিলারের কাছ থেকে পণ্য আসছে অঙ্কের হিসাব কষে। যেমন-এক কোম্পানির ৫ লিটারের বোতল মিললে, আরেক প্রতিষ্ঠান দিচ্ছে শুধুই ১ থেকে ২ লিটারের প্যাকেজ।

গত ডিসেম্বরে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়েও খুশি হতে পারেননি উৎপাদকরা। আবারও দর সমন্বয় করতে চান তারা। সে জন্য নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ট্যারিফ কমিশনে। তবে সিদ্ধান্ত আসার আগেই বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেছে। সীমিত করা হয়েছে মিলগেটের কার্যক্রম।

ভোক্তারা বলছেন, দাম বাড়াতেই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী ভোজ্যতেলের সরবরাহ অনেক কম। ফলে সংকট তৈরি হয়েছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে হাহাকার ভোজ্যতেলের জন্য। দোকানে দোকানে ঘুরেও মিলছে না এক লিটার, দুই লিটার সয়াবিন তেল। পাঁচ লিটার কয়েকটি দোকানে পাওয়া গেলেও দাম নাগালের বাইরে।

গতকাল সোমবার (০৩ মার্চ) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুদি দোকানগুলো ঘুরে এমন চিত্র মিলে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কিছু দোকানে দৃশ্যমান স্থানে ভোজ্যতেল প্রদর্শন করা হচ্ছে না। তেল নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্রেতাকে। কিন্তু তল্লাশিতে দোকানের গোপনীয় স্থানে বিপুল পরিমাণে ভোজ্যতেলের পাঁচ লিটারের বোতল মজুদ পাওয়া গেছে। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ভোক্তার চাহিদা

ভোক্তা অধিদফতর বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে উৎপাদিত ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল যার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি ৮১৮ টাকা। কিন্তু তদারকিতে দেখা গেছে, কিছু ব্যবসায়ী তা বিক্রি করছেন ৮৫০ থেকে ৮৫২ টাকায়। আবার অনেকে দামের লেভেল মুছে দিয়েও বিক্রি করছেন। তাছাড়া কিছু ব্যবসায়ী তেল লুকিয়ে রেখে গোপনে বেশি দরে বিক্রি করছেন। এসব অপরাধে কাওরান বাজারের কিচেন মার্কেটের সম্প্রতি সাতটি প্রতিষ্ঠানকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এদিকে ভোক্তা অধিকার অধিদফতর বলছে, সয়াবিনের ঘাটতি রয়েছে। তবে রমজান শুরু হলেও সরকারি এই সংস্থাটি বাজারে সয়াবিন ঘাটতির কারণ নিরুপণ করতে পারেনি। অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান গণমাধ্যমকে বলেন, সয়াবিন তেলের পাইকারি বা সরবরাহ পর্যায়ে কোনো ধরনের সংকট আছে কি না সেটা জানার জন্য একটু সময় প্রয়োজন হবে। আমরা একটা তদন্ত কমিটি করব। তদন্তের পর জানাতে পারব পারব সংকট আছে কি না। সয়াবিন তেল পর্যাপ্ত থাকলে মানুষ স্বস্তিতে থাকবে।

ইউডি/আরকে

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading