হুশিয়ারিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিবেশ গিলছে ইটভাটা
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ০৯ মার্চ, ২০২৫, আপডেট ১২:৫০
ছাড়পত্র বা অনুমতি নেই। তবু চলছে ইটভাটা। শেরপুর জেলার সবক’টি ভাটাই চলছে অনুমোদনহীনভাবে। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফসলি জমি ও বসতবাড়ির আশপাশে গড়ে উঠেছে এসব ইটভাটা। আর ভাটাগুলোতে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠখড়ি। বাড়ছে পরিবেশের দূষণ, উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষি জমি। তবু রহস্যজনক কারণে বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ভাটা। আর এদিকে আদালত ও পরিবেশ উপদেষ্টার কঠোর হুঁশিয়ারির পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে, যা থানায় মামলায় গড়িয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলায় প্রায় ৫০টি ইটভাটা রয়েছে। ভাটাগুলো ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইনের তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত হচ্ছে। বেশিরভাগ ইটভাটা গড়ে উঠেছে ফসলি জমিতে। আশপাশে রয়েছে বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার। আবার নিয়মনীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কয়লা ও কাঠখড়ি। শেরপুর পৌর শহরের মোবারকপুর ও কালিগঞ্জ দমদমা এলাকাতেই ১০টির মতো ভাটা রয়েছে। আবার শ্রীবরদী উপজেলার কাকিলাকুড়া ইউনিয়নে একেবারে নিভৃত পল্লিতে তিনটি ইটভাটা।
ভাটার পার্শ্ববর্তী বাসিন্দারা জানায়, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজারের পাশেই গড়ে উঠা এসব ভাটায় ইট প্রস্তুতে এলাকার কৃষকের জমির টপসয়েল (উপরিভাগের মাটি) কিনে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমি। বিশেষ করে দমদমা কালিগঞ্জ, মোবারকপুর, চিথলিয়া, ঝিনিয়া, মাদারপুর, খড়িয়া, যোগিনীমুড়া গ্রামে অর্ধেকের বেশি জমির মাটি গিলে ফেলেছে ভাটাগুলো। প্রতিনিয়ত ভাটার ধোঁয়া ও কয়লা-ধুলাবালির দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে স্থানীয়রা। পাশাপাশি ফলফলাদি, গাছগাছালির ক্ষতি হচ্ছে এবং পরিবেশ হারাচ্ছে বৈচিত্র্য।
কৃষিবিদ ড. সুকল্প দাস জানান, ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপনের ফলে মাটির ওপরের স্তরের জৈবপদার্থ নষ্ট হয়ে যায়। এতে আস্তে আস্তে উর্বরতা হারায় মাটি। ভাটা বন্ধ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন থাকে প্রভাব।
বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে ইটভাটা পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। ইটভাটার দূষণ বায়ু, মাটি, পানি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। দূষিত বাতাসে দীর্ঘসময় শ্বাস নেওয়ার ফলে অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া ও সিওপিডি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আর ইটভাটার কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সালফারের যৌগসমূহ ও সূ² ধূলিকণার কারণে চোখে জ্বালা, ত্বকের সমস্যা এবং ফুসফুসের সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে দূষণের ফলে অকাল জন্ম ও শিশুর কম ওজন নিয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ভাটা থেকে নির্গত বায়ুদূষণ এখনকার সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এসব ভাটা থেকে বিপুল পরিমাণ সূ² বস্তুকণা নির্গত হয়, যা ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা অ্যাসিড বৃষ্টির সৃষ্টি করতে পারে এবং শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। অনেক ইটভাটায় নিম্নমানের কয়লা ও কাঠ ব্যবহার করা হয়, যা ব্লাক কার্বন উৎপন্ন করে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে ইটভাটার দূষণ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। ইট প্রস্তুতে ব্যবহৃত কয়লা ও কাঠ দহন থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং ব্লাক কার্বন নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভ‚মিকা রাখে। প্রতি বছর বাংলাদেশে ইটভাটা থেকে প্রায় ১৫ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ইটভাটা অধ্যুষিত এলাকায় তাপমাত্রা সাধারণত ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে, যা স্থানীয় জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
ইটের বিকল্প কি হতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে টানেল কিলন, হাইব্রিড হফম্যান কিলন এবং ভার্টিকাল শ্যাফট ব্রিক কিলন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এসব আধুনিক ইটভাটায় তাপ পুনর্ব্যবহার করা হয়, যা কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে। বিশেষত, টানেল কিলন প্রযুক্তিতে ইট পোড়ানোর সময় ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়ানো হয়, যা জ্বালানির অপচয় রোধ করে এবং ইটের গুণগত মান উন্নত করে। পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদনে বিকল্প নির্মাণ উপকরণ ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোয় কংক্রিট বøক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা সাধারণ পোড়ানো ইটের তুলনায় কম কার্বন নিঃসরণ করে এবং শক্তি সাশ্রয় করে। এছাড়া, পুনর্ব্যবহার উপকরণ দিয়ে রিক্লেমড ব্রিক তৈরি করা হয়, যা নতুন কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনে এবং পরিবেশগত ক্ষতি হ্রাস করে। ইট উৎপাদনের সময় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। উন্নত দেশগুলোর অনেক কারখানায় সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি ব্যবহার করে ইট পোড়ানো হয়, যা কয়লা ও কাঠের ব্যবহার কমিয়ে আনে। এছাড়া, ইলেকট্রিক কিলন ব্যবহারের ফলে ইট পোড়ানোর সময় বায়ুদূষণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। কঠোর পরিবেশ আইন এবং সরকারি নীতিমালার কারণে উন্নত দেশগুলোয় ইটভাটাগুলোর ওপর কড়া নজরদারি রাখা হয়। কারখানাগুলোর ধোঁয়া শোধন করার জন্য এয়ার ফিলটার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, যা ক্ষতিকর গ্যাস শোষণ করে এবং পরিশোধিত বাতাস নির্গত করে।
শেরপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ অধিদফতরের সরকারি কাজে বাধা দেন এর ঘটনায় পরিবেশ অধিদফতরের দেওয়া অভিযোগ পেয়েই আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, মোবাইল কোর্টের ওপর হামলা খুবই নেক্কার জন্য বিষয়। মামলার গতিতে মামলা চলবে। সেই সঙ্গে হাইকোর্টের নির্দেশনা পালন করতে অবৈধ ইটভাটার ওপর অভিযানের চলমান থাকবে।
ইউডি/আরকে

