বাঘ বাঁচাতে সাইকেলে চড়ে ডাচ রাষ্ট্রদূতের সুন্দরবন যাত্রা

বাঘ বাঁচাতে সাইকেলে চড়ে ডাচ রাষ্ট্রদূতের সুন্দরবন যাত্রা

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার (২ এপ্রিল), ২০২৫, আপডেট ১৫:০০

সুন্দরবনকে বাঁচানোর উপায় বরাবরই কেবল কথা নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছুর দাবি রাখে। এর জন্য প্রয়োজন হয় ঘর্মাক্ত শরীর, ফোসকা পড়া পা ও এমন একগুঁয়েমি, যাতে সূর্যের প্রখর রোদে শরীর পুড়লেও যাত্রা ব্যাহত হবে না; কঠিন পরিস্থিতিতেও চলবে অগ্রযাত্রা।

গত ২৮ থেকে ৩০ মার্চ এমন কিছুই করে দেখিয়ে দিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত আন্দ্রে কারসটেন্স। কূটনীতির করিডোর ছেড়ে সাইকেলে চেপে তিনি বেরিয়ে পড়েন ধুলি ওড়া, কঠিন পথে। বরিশাল থেকে বাঘের ডেরা সুন্দরবনের জয়মণিতে অবস্থিত ওয়াইল্ডটিমের কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টার ‘টাইগারহাউস’ পর্যন্ত ১৬৩ কিলোমিটার পথ সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন এই কূটনীতিক।

ছেলে কারস্টেন্স ইয়াকোবাস হেরমানাস ও দুই বন্ধু নিলস ফন ডেন বের্গে (নেদারল্যান্ডস পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য) ও ইয়ংমান কারিনকে সঙ্গে নিয়ে এই যাত্রা করেন তিনি। এ সময় আড়ম্বর করে প্রতিনিধি দল কিংবা গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে নেননি এই কূটনীতিক; এটি ছিল নীরব-নিভৃতে সচেতন এক অভিযাত্রা।তার এই কর্মকাণ্ড এক যুগ আগের এমনই আরেকটি যাত্রার কথা মনে করিয়ে দেয়।

তখন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ, কূটনীতিক ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের একটি দল দেশজুড়ে রিকশা চালিয়েছিলেন। সেই সময়ের লক্ষ্য ছিল বাঘের অস্তিত্ব সংকটকে জনসমক্ষে তুলে ধরা। আর এবারের মিশন ছিল সুন্দরবনের হৃদস্পন্দন—এর উত্তাপ, কানাকানি ও নাজুক অস্তিত্বের ভার সরেজমিনে অনুভব করা।

গত ১০ ও ১১ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধি দলের উপপ্রধান ড. বেয়ার্ন্ড স্পানিয়েরের সঙ্গে প্রথমবার ওয়াইল্ডটিমস কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টার পরিদর্শন করেন কারসটেন্স। এরপর ৮০ দিনেরও কম সময়ের ব্যবধানে তিনি সেখানে ফিরে যান। তবে এবার শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, তাদের আবাসস্থল ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো নিজে অনুভব করে এসব বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সচেতনতা বৃদ্ধিই ছিল তার লক্ষ্য।

আন্দ্রের মতে, ‘মানুষ ভাবে সুন্দরবন শুধুই একটি বন, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এটি বাংলাদেশের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া জীবন্ত রক্ষাকবচ। আপনি যখন এর ভেতর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাবেন, তখন বুঝতে পারবেন—এটি আমাদের কত কিছু দিচ্ছে এবং ঠিক কতটা হারাচ্ছে।’

নিলস ফন ডেন বের্গে নেদারল্যান্ডসের সংসদ সদস্যই শুধু ছিলেন না, ডাচ ওয়াখেনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পরিবেশবিদ হিসেবে স্নাতকও সম্পন্ন করেছেন। বিশ্বব্যাপী বিলুপ্তপ্রায় এই বাঘের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের আবাসস্থল বাংলাদেশের সুন্দরবন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বের্গে বলেন, ‘ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি যেভাবে এই বনটিকে আগলে রেখেছে, তা দেখে আমি অভিভূত। ওয়াইল্ডটিমের মতো সংস্থা ও কমিউনিটি—যারা এটি সম্ভব করেছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

‘আমার প্রিয় লেখক অমিতাভ ঘোষের ‘হাংরি টাইডের’ এই ভূখণ্ডে এটি আমার তৃতীয় ভ্রমণ। অর্থাৎ তৃতীয়বারের মতো আমি সুন্দরবন এসেছি। কিন্তু সাইকেল চালিয়ে এটিই আমার প্রথম সুন্দরবন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। অসাধারণ এক যাত্রা ছিল এটি। যেখানেই গিয়েছি, সেখান থেকেই সহযোগিতা পেয়েছি। গ্রামের ছেলেরা সরু অস্থায়ী সেতুর ওপর দিয়ে সাইকেল নিয়ে যেতে আমাদের সহযোগিতা করেছে। এর সঙ্গে ছিল রেস্তোরাঁয় বিনামূল্যের চা ও চমৎকার সব আড্ডা,’ বলেন তিনি।

‘দ্য হাংরি টাইড’ ভারতীয় লেখক অমিতাভ ঘোষের চতুর্থ উপন্যাস। সুন্দরবনের প্রেক্ষাপটে এটি লেখেন তিনি। কথা সাহিত্যের জন্য ২০০৪ সালে ‘হাচ ক্রসওয়ার্ড বুক অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত হয় বইটি।

টাইগারহাউসে সাইক্লিস্টরা পৌঁছানোর পর পুরোনো বন্ধুদের মতো সম্ভাষণ জানান টাইগারস্কাউটরা—স্থানীয় তরুণ সংরক্ষণবাদী, যারা সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে থাকেন। এছাড়া ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমও (ভিটিআরটি) তাদের স্বাগত জানায়। মানুষ ও বাঘের সংঘাত নিরসনে কাজ করতে এই টিমকে প্রশিক্ষণ দেয় ওয়াইল্ডটিম।

এই কেন্দ্রটি আইইউসিএনের সমন্বিত বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণ কর্মসূচির (আইটিএইচসিপি) অধীনে ওয়াইল্ডটিমের কাজের প্রাণকেন্দ্র। জার্মানি ও কেএফডব্লিউ উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগিতায় এটি পরিচালিত হয়। এটি এমন একটি কেন্দ্রস্থল যেখানে বিজ্ঞানের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়ের মিলন ঘটে।

ওয়াইল্টটিমের চেয়ারম্যান ইনাম আল হক বলেন, ‘হারবাড়িয়া ও আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম অঞ্চলে তাদের নৌকাভ্রমণ এক দ্বৈত বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছে—কাদায় বাঘের পায়ের টাটকা ছাপ, আর ঠিক তার পাশেই জোয়ারে ভেসে আসা প্লাস্টিকের বর্জ্য।’

‘এদিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ওয়াইল্ডটিমের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, যাতে সহায়তা করছে আন্তর্জাতিক সিকিপারস সোসাইটি।’ তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বর্জ্য আসার গতি বেড়ে যায়। বাঘেরা (এর সঙ্গে) মানিয়ে নিচ্ছে, আমাদেরও নিতে হবে।’

আন্দ্রে ও তার সহযাত্রীদের এই সাইকেল অভিযাত্রা ২০১৩ সালের রিকশা কর্মসূচির এক নীরব প্রতিচ্ছবি বহন করে। সেই সময়ের ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাটি দেশের সর্বদক্ষিণের টেকনাফ থেকে শুরু হয়ে ঠিক এই জায়গাতে এসেই শেষ হয়। তখনকার কর্মসূচিতে অভিযাত্রীরা বাঙালিদের এক এমন জাতি হিসেবে আবিষ্কার করেছিলেন, যারা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সুন্দরবনের বাঘদের নিয়ে ভাবেন।

ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আন্দ্রের এই সাইকেল অভিযানও সেই একই আলোকবর্তিকা বহন করেছে। নায়ক হওয়ার বিষয় নয় এটি, অংশ নেওয়াটাই আসল। সুন্দরবনের ত্রাতার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন জেদি মিত্র।’

যাত্রা শেষে সাইক্লিস্টরা যখন ফিরে গেলেন, তাদের সাইকেলগুলো স্মৃতির চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে গেল। আর তারা সবার জন্য রেখে গেলেন একটি চ্যালেঞ্জ—বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তহবিল সংগ্রহ। সামনের পথ বরিশাল থেকে জয়মণির চেয়েও দীর্ঘ। তবে কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ—তা যদি একজন সাইকেল-আরোহী কূটনীতিক দেখিয়ে দিতে পারেন, তাহলে হয়তো সুন্দরবনের গর্জন সহসাই ম্লান হবে না।

ইউডি/সিফাত

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading