এবারের ঈদযাত্রার পরিসংখ্যানেও পরিবর্তন নেই : সড়ক দুর্ঘটনা আর কত?

এবারের ঈদযাত্রার পরিসংখ্যানেও পরিবর্তন নেই : সড়ক দুর্ঘটনা আর কত?

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৫, আপডেট ১৬:১০

ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো স্থান থেকে সড়ক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এসব দুর্ঘটনায় কেউ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ আবার গুরুতর আহত হয়েছেন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের একটি সড়ক দুর্ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকার ওই সড়ক দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মাঝে পাঁচ জনই একই পরিবারের। লোহাগাড়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই বাবা, মা, ছোট দুই বোনের মৃত্যুর পর দুইদিন চট্টগ্রাম মেডিকেলের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন কলেজ পড়ুয়া তাসনিম ইসলাম প্রেমা। কিন্তু গতকাল শুক্রবার শেষ পর্যন্ত তারও মৃত্যু হয়। যে মহাসড়কে দুর্ঘটনায়-এত প্রাণহানি হয়, সেই এলাকার অর্থ্যাৎ দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি শুভ রঞ্জন চাকমা গণমাধ্যমকে জানান, হাসপাতালে এই মুহূর্তে আরও দুইজন গুরুতর আহত অবস্থায় ভর্তি আছেন। ঈদের ছুটি কাটাতে পরিবারের সবাই মিলে কক্সবাজারে যেতে চেয়েছিলো বরিশালের পিরোজপুর জেলার ওই পরিবারটি। কিন্তু ফেরার পথে একটি দুর্ঘটনায় সবাই প্রাণ হারান। ঘটনাটি গণমাধ্যমে এলে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে দুঃখপ্রকাশ কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেকেই বাংলাদেশের সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

২৪ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল: যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ওই দুর্ঘটনা এবার ঈদের কোনো একক ঘটনা নয়। ঈদের আগের সাতদিন, ঈদের দিন ও ঈদের পরের ৭ দিন-এই মোট ১৫ দিনকে ঈদযাত্রা হিসাবে ধরা হয়। ওই হিসাবে গত ৩১শে মার্চ ঈদ হওয়ায় এবারের ঈদ যাত্রা এখনও শেষ হয়নি। ফলে, এবারের ঈদ যাত্রায় মোট কতগুলো সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে, তার কোনও পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও কোনো মাধ্যম থেকে পাওয়া যায়নি। তবে সড়কে অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা রোধ ও যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবারের ঈদের সড়ক দুর্ঘটনা একটি প্রাথমিক তথ্য গণমাধ্যমকে দিয়েছে। তাদের প্রাথমিক হিসাবে ঈদের আগে-পরে মিলিয়ে, গত ২৪শে মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে মোট ২১৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ২৩৯ জন এবং আহতের সংখ্যা ৫১৬ জন। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক গণমাধ্যমকে জানান, এখনও ঈদযাত্রা শেষ হয়নি এবং অনেক তথ্য আসেনি। ফলে দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা তাদের প্রাথমিক পরিসংখ্যান থেকে বেড়ে যেতে পারে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি’র হিসাবে, ২০২৪ সালের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে মিলিয়ে ১৫ দিনে সড়কে ৩৯৯টি দুর্ঘটনা ঘটে, যাতে ৪০৭ জন নিহত এবং এক হাজার ৩৯৮ জন আহত হয়। ২০২৩ সালের রোজার ঈদের ১৫ দিনে সড়কে ৩০৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছিলো ৩২৮ জনের। আর, সে সময় আহত হয়েছিলেন ৫৬৫ জন। এছাড়া, বিগত নয় বছরে শুধুমাত্র ঈদুল ফিতরে সারাদেশে দুই হাজার ৩৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই হাজার ৭১৪ জন নিহত এবং সাত হাজার ৪২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানায় সংগঠনটি।

দুর্ঘটনা কোনও একক কারণে হয় না

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দুর্ঘটনা’র কিছু কারণ চিহ্নিত করেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দুর্ঘটনা কোনও একক কারণে হয় না। দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে অনেকসময় দ্রæতিগতির কথা বলা হলেও বাস্তবতা হলো,দুর্ঘটনায় অনেকগুলো বিষয় নিহিত থাকে। গুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো-সড়কের গঠনে ত্রæটি থাকতে পারে, চালক অদক্ষ ও ক্লান্ত হতে পারে, যানবাহনের ফিটনেসে ঝামেলা থাকতে পারে ইত্যাদি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সেক্রেটারি মো. সাইফুল আলম মনে করেন, দুর্ঘটনার মূল কারণ অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি দেওয়া হয়, বিশেষ করে ঈদের সময় এমনটা বেশি হয়। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, সচারাচর মহাসড়কে যে গাড়িগুলো দেখি আমরা, সারাবছর যারা চলে, তারা ওই রুটে এক্সপার্ট। প্রতিবছর ঈদের সময় দুর্ঘটনা হয়, তাই আমরা এবার ঈদে সিটি সার্ভিসের বাসগুলোকে যাত্রী নিয়ে কোথাও যেতে দেইনি। পাহারা বসাইছিলাম টার্মিনালে।কিন্তু,ফেরার পথে অনেক লোকাল বাস রিজার্ভ যাত্রী নিয়ে রওনা দেয়। রেগুলার ড্রাইভারদের আইডিয়া আছে যে পথের কোথায় বাজার, কোথায় অটো ঝামেলা করে। লোকালদের তা নাই। তিনি বলেন, কক্সবাজারের ওই বাসের চালকও ওই রুটের চালক ছিল না।

দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি শুভ রঞ্জন চাকমাও বলেন, তারা এখন পর্যন্ত যা জানতে পেরেছেন, ঈদ উপলক্ষেই মাইক্রোবাসে ধাক্কা দেওয়া বাসটি মহাসড়কে নেমেছিলো।এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বাসটির চালকের বাড়ি বরিশাল এবং মাইক্রোবাসের চালকের বাড়ি সিলেটে। যখন এই ধরনের বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন সাধারণত এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কিছুদিন পরে আবার আলোচনা থেমেও যায় বলে জানা খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর যে হারে দুর্ঘটনা ঘটে, সেই তুলনায় বিচারের হার খুবই কম। দুর্ঘটনা ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তোলেন বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। তার মতে, দুর্ঘটনা ঘটলে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন করা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে তা করা হয় না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে “ধার করা লোকজন এনে” তদন্ত কমিটি করা হয়। এই বিষয়টা ত্রুটিযুক্ত। কারণ যারা সড়ক নির্মাণ করছে, যারা যানবাহনের ফিটনেস দিচ্ছে, তারাই তদন্ত কমিটিতে থাকলে তদন্ত করে দুর্ঘটনার মূল কারণ বের করা অসম্ভব, বলেন তিনি।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading