সুপেয় পানির সংকটে সুবর্ণচরে হাহাকার, খাল-বিল-পুকুরে নেই পানি

সুপেয় পানির সংকটে সুবর্ণচরে হাহাকার, খাল-বিল-পুকুরে নেই পানি

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৫, আপডেট ১৭:৫০

নোয়াখালীর শস্যের ভান্ডার নামে পরিচিত সুবর্ণচর উপজেলায় টিউবওয়েলে, পুকুর ও খাল-বিলে মিলছে না সুপেয় পানি। পানি সংগ্রহ করেত যেতে হয় দূর-দূরান্তে। এদিকে খাল-বিল পুকুরেও নেই পানি। ফলে এ জনপদে দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট।

জানা গেছে, গত এক দশক থেকে এ জনপদে বদলে গেছে কৃষির চিত্র। এক সময় রবি মৌসুমে পানি সেচ ছাড়াই কৃষক উৎপাদন করতো মূল্যবান রবিশস্য। আমনের মৌসুম শেষ হতেই রবি মৌসুমে এসব ফসল উৎপাদনে চলতো মহা কর্মযজ্ঞ। এ অঞ্চলে উৎপাদিত এসব রবিশস্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হতো সারাদেশে। কালের বিবর্তনে কৃষিতে যুক্ত হলো উচ্চ পানি শোষণ ক্ষমতা সম্পন্ন উফশি ধানের বীজ। যা উৎপাদনে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। উপকূলীয় এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক পানির আধার সৃষ্টি না করায় কৃষক সেচের ৮০ ভাগ পানি ভূগর্ভ হতে অপরিকল্পিতভাবে উত্তোলন করে ইরি-বরো ধানের পানির চাহিদা মেটাচ্ছে। এতে করে ভূ-গর্ভের সুপেয় পানির স্তর গাণিতিক হারে নেমে যাচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির চরম হাহাকার চলছে এ জনপদে। শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষই এখন সুবর্ণচরের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বড় ধরনের অভিশাপে পরিণত হচ্ছে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা মৌসুমি ফসল চাষ না করে ৭০ ভাগ ভূমিতেই ইরি-বোরো ধানের চাষ করছেন। যে দিকে চোখ যায় সেদিকেই শুধু ধান আর ধানের সবুজ জমি। মৌসুমি ফসলের চাষ তেমন চোখেই পড়ে না। যত্রতত্র ফসলি মাঠের পাশে, পুকুর পাড়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো গভীর নলকূপ স্থাপন করে অপরিকল্পিতভাবে তুলছে ভূগর্ভের সুপেয় পানি। ধান চাষে ভূগর্ভের পানি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বাড়িঘরের (৭০০-১২০০ ফুট) গভীর নলকূপে এখন আর পানি ওঠে না। এক কলসি সুপেয় পানির জন্য এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ছুটছে মানুষ। এ যেন এক কলসি পানির জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ। এতে গৃহস্থালির কাজেও দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। বিশুদ্ধ পানির অভাবে সুবর্ণচরের লাখ লাখ মানুষ দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সুবর্ণচরে ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর আবাদি ভূমির মধ্যে ২০০০ সালে খালবিল ও পুকুরের পানি ব্যবহার করে মাত্র ২০০ হেক্টর ভূমিতে বোরো চাষ হতো। বাকি ভূমিতে কৃষক রবি ফসলের আবাদ করতো। ২০০০ সাল থেকে ক্রমাগত হারে সুবর্ণচরে চলতি মৌসুমে শুধু ১৮ হাজার হেক্টর ভূমিতে বোরো ধানের চাষ করেছে কৃষক এবং ২ হাজার ৭৫০ হেক্টর ভূমিতে খেসারিসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ করা হয়েছে। এই বোরো ধান চাষে ৫০ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার ২৮০ কিউসেক পানি খরচ হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ পানি ব্যবহার হয় উপরিভাগ থেকে। ৪ লাখ ১৪০ কিউসেক পানি খরচ হচ্ছে প্রতি হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষে।

কোনো গবেষণা ও ভূগর্ভের পানির পরিমাণ সমীক্ষা না করে গভীর নলকূপ অনুমোদন দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভূগর্ভে কি পরিমাণ পানির মজুদ রয়েছে কিংবা গভীর নলকূপ স্থাপনে পরিবেশ প্রকৃতি ও ভূগর্ভের ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে সর্বোচ্চ পানি শোষণকারী উফশী জাতের বীজ কৃষকের হাতে সরবরাহ করেছে কৃষি বিভাগ।

সুবর্ণচর উপজেলার চর আমানউল্যাহ ইউনিয়নের বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, কখনও ভাবিনি সুপেয় পানির জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হবে আমাদেরকে। পুকুর ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। কোথাও পানি নাই। বাড়িতে গভীর নলকূপ থাকলেও পানি উঠছে না নলকূপে। অন্য গ্রাম থেকে অনেক কষ্টে সুপেয় পানি সংগ্রহ করছি।

উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন বাংলাদেশ সুবর্ণচর শাখার আহ্বায়ক আবদুল বারী বাবলু বলেন, এখন ১৫ শত থেকে ২ হাজার ফুট নিচেও পানি মিলছে না। পানিতে লবণের পরিমাণ হঠাৎ বেড়েছে। গভীর বা অগভীর নলকূপ বসানো হয় দেড় থেকে তিন ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ দিয়ে। কিন্তু সেচকাজে ব্যবহারের নলকূপে পাইপ দেওয়া হয় ৪ থেকে ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ। এতে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অঞ্চলের মানুষের পানি সংকট সমাধানে অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে ভূগর্ভের পানির মজুতের পরিমাণ জরিপ করতে হবে। অন্যথায় পানির পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে উপকূলীয় এজনপদে। তিনি বলেন, সুবর্ণচরে বড় বড় খাল ও লেক সেচের আওতায় আনলে দু’লাখ হেক্টর জমি চাষ করা যাবে। ২০ কোটি কিউসেক পানি পাওয়া যাবে শুধু মেঘনা লেক কাজে লাগিয়ে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ভূগর্ভের পানি রক্ষায় ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের লক্ষ্যে আমরা কৃষককে রবি মৌসুমে অন্যান্য লাভজনক ফসল চাষের পরামর্শ দিচ্ছি। বিএডিসির গভীর নলকূপ অনুমোদন বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা আছে। ফলে কত পরিমাণ জমিতে কেমন পানি লাগবে, সেই তথ্য নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। চাষ অনুযায়ী গভীর নলকূপ বসানো হলে অবৈধ নলকূপ স্থাপন কমে আসত। এছাড়াও প্রাকৃতিকভাবে পানি সংরক্ষণ করা গেলে কৃষিতে পানি কম লাগবে। মেঘনা নদীর শাখা গুলোকে যদি কার্যকর করে পানি সংরক্ষণ করা যায় তাহলে কৃষক উপকৃত হবে। প্রাকৃতিক সোর্সের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুরাইয়া আক্তার লাকী বলেন, অবৈধ গভীর নলকূপের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এছাড়া সুপেয় পানির সংকটে আপদকালীন চাহিদা পূরণে জেলা জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সুপেয় পানি ও প্লাস্টিকের কনটেইনার বিতরণ করা হচ্ছে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading