গাদ্দাফির অর্থে ফ্রান্সে নির্বাচনী প্রচার- যে কেলেঙ্কারিতে জেলে যাচ্ছেন সারকোজি
উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, আপডেট ১৫:৩৫
ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। তাঁর বিরুদ্ধে একটি চুক্তির মাধ্যমে লিবিয়ার নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছে থেকে অর্থ নেওয়ার আভিযোগ আছে।
২০১১ সালে লিবিয়ায় গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহত হন গাদ্দাফি। আদালতের রায় নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন সারকোজি। সে সময় নির্বাচনী প্রচারের জন্য তিনি গাদ্দাফির কাছে থেকে অর্থ সহায়তা নেন। এ নিয়ে হওয়া মামলায় স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার রায় দেন প্যারিসের একটি আদালত। রায়ে কারাভোগের পাশাপাশি সারকোজিকে ১ লাখ ১৭ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছে।
নিকোলাস সারকোজি ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তিনি এটিকে একটি কেলেঙ্কারি বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। পাশাপাশি রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে আদালত বলেছেন, আপিল চলমান থাকলেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সারকোজির কারাভোগের রায় কার্যকর হবে।
আধুনিক ফ্রান্সের ইতিহাসে এর আগে কোনো সাবেক প্রেসিডেন্টের কারাভোগের ঘটনা নজিরবিহীন। বর্তমানে ৭০ বছর বয়সী সারকোজি বলেছেন, ‘তারা যদি আমাকে জেলে ঘুমাতে দেখতে চায়, তবে তাই হবে। কিন্তু আমি মাথা নোয়াবো না, মাথা উঁচু থাকবে। কারণ কেলেঙ্কারি করে এই রায় দেওয়া হয়েছে।’
রায় ঘোষণার পর আদালতে উপস্থিত ছিলেন সারকোজির স্ত্রী মডেল ও সংগীত শিল্পী কার্লা ব্রুনি। সারকোজি সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারা আমাকে ঘৃণা করে তারা ভাবছে এর মাধ্যমে আমাকে অপমান করা হচ্ছে। কিন্তু না, তারা আসলে ফ্রান্স ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।’
গাদ্দাফির সঙ্গে চুক্তি
মামলার বাদী পক্ষ জানিয়েছে, ২০০৭ সালের নির্বাচন ঘিরে লিবিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছিল। যেটি করতে মূখ্য ভূমিকা ছিল সারকোজির। ওই চুক্তির আওতায় সারকোজির নির্বাচনী প্রচারের জন্য ব্যাংক, নগদ লেনদেন ও অফশোর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ আনা হয়েছিল।
ওই চুক্তির বিনিময়ও চেয়েছিল লিবিয়া। সেটি হলো- সারকোজি প্রেসিডেন্ট হলে দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক চুক্তি ও কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া। পাশাপাশি গাদ্দাফির ভগ্নিপতি আবদুল্লাহ সেনুসির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহারেরও অনুরোধ ছিল। ১৯৮৯ সালে ফরাসি একটি এয়ারলাইনসে বোমা হামলা হয়। এতে ১৭১ জন মারা যান। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সেনুসির বিরুদ্ধে ফ্রান্স গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
ছোট শুরু থেকে বড় কেলেঙ্কারি
গাদ্দাফির কাছে থেকে সারকোজির অর্থ নেওয়া নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফরাসি গণমাধ্যম মিডিয়াপার্ট। বৃহস্পতিবার তারা মূল প্রতিবেদনের সারাংশ নিয়ে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করে।
এতে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সারকোজি। ২০০৭ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। অন্যদিকে লিবিয়া ও দেশটির নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি তখন পশ্চিমাদের কাছে থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। সারকোজির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমেই গাদ্দাফি পশ্চিমাদের কাছে থেকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন।
মিডিয়াপার্ট লিখেছে, নির্বাচনের প্রচার চালানোর জন্য সারকোজির দল ছিল খুবই ছোট। তাদের অর্থেরও প্রয়োজন ছিল। তবে এই প্রচারক দলে ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যার সঙ্গে ত্রিপলির (লিবিয়ার রাজধানী) ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাঁর নাম জিয়াদ তাকিয়েদ্দিন। পরে দলের আরও কয়েকজন সদস্য মিলে লিবিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে।
সারকোজি ২০০৭ সালের মে মাসে তুলনামূলক কম প্রতিদ্বন্দ্বীতার মাধ্যমে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর সাত মাস পরে ডিসেম্বর মাসে প্যারিসে আমন্ত্রণ জানানো হয় গাদ্দাফিকে। পাঁচ দিনের ওই সফরে অনেকটা রাজকীয় অভ্যর্থনা পান গাদ্দাফি।
সারকোজির মেয়াদের শেষ সময়ে ২০১১ সালের জুলাইয়ে গাদ্দাফির থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে মিডিয়া পার্ট। ২০১২ সালে সারকোজির মেয়াদ শেষের পর এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। ২০১৫ সালে সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ক্লোদ গেয়াঁকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুলিশ অর্থের আংশিক পরিমাণ সংক্রান্ত তথ্য পায়।
পুলিশ জানতে পারে ক্লোদ গেয়াঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২০০৮ সালে ৫ লাখ ইউরো জমা হয়েছিল। ক্লোদ গেয়াঁ দাবি করেছিলেন, এই অর্থের সঙ্গে লিবিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থটি পেয়েছিলেন ডাচ চিত্রশিল্পীদের অনেক পুরনো দুটি তৈলচিত্র বিক্রি করে। তবে ২০২২ সালের মার্চে, প্যারিসের আপিল কোর্ট নিশ্চিত করেন, গাদ্দাফি নিয়ন্ত্রিত তহবিল থেকে ৫ লাখ ইউরো একটি জটিল চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল।
প্রায় ১০ বছর ধরে অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২০২৩ সালের আগস্টে বিচারক ও প্রসিকিউটররা সারকোজির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর সিদ্ধান্ত নেন। সারকোজি ছাড়াও তাঁর সময়ের তিনজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও ওই সময় বিচার শুরু হয়।
ইউডি/রেজা

