লবণাক্ততার ছোবলে ক্ষয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের প্রতীক ষাট গম্বুজ মসজিদ
উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৫, আপডেট ১৫:০৫
বাংলার স্থাপত্য, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির অনন্য নিদর্শন বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ এখন চরম সংকটে। জলবায়ু পরিবর্তন, বেড়ে যাওয়া লবণাক্ততা ও আর্দ্রতার কারণে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে দেয়াল, মিহরাব ও গম্বুজের অলঙ্করণ। প্রাচীন চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির ইটে গড়া এই স্থাপনাটির প্রতিটি দেয়ালে এখন লবণের আস্তর, ফাটল ও স্যাঁতসেঁতে দাগ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
১৫০০ শতকে মহান সাধক খান জাহান আলী নির্মাণ করেন এই মসজিদ। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম স্থাপত্যে এর গম্বুজ বিন্যাস ও কারুকাজ এক অনন্য উদাহরণ।
মূল ভবনে রয়েছে ১১টি প্রান্তিক খিলান, ৬০টি গম্বুজ, ৭৭টি গম্বুজবেষ্টিত ঘর ও ১১৮টি স্তম্ভ। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেয়।
তবে এখন সেই ঐতিহ্য হুমকির মুখে। মসজিদের দেয়ালে সাদা লবণের আস্তর জমেছে, মিহরাবের অলঙ্করণ বিবর্ণ হয়ে পড়ছে। নিচের দিক থেকে উঠে আসা নোনা পানি শুকিয়ে ইটের ভেতরে লবণ ক্রিস্টাল তৈরি করছে, যা ধীরে ধীরে ইটের বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে।
মসজিদের ইমাম মাওলানা নাসির উদ্দিন বলেন,
প্রতিদিন নামাজ পড়াতে এসে দেখি দেয়ালের রং বদলে যাচ্ছে। মিহরাবের কারুকাজ আগের মতো উজ্জ্বল নেই, স্যাঁতসেঁতে ভাব সব জায়গায়। এটা শুধু নামাজের জায়গা নয় এটা আমাদের ইতিহাস, আমাদের গর্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল স্থানীয় সমস্যা নয় বরং জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার ডিসিপ্লিন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি ও আইকমসের এক যৌথ গবেষণায়ও দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতা ও শিল্প এলাকার দূষণ এই ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. খন্দকার মাহফুজ উদ দারাইন বলেন,
আমরা দেখেছি মসজিদের উত্তর দিক বাদে বাকি তিন দিকের দেয়ালে নতুন করে লবণের আস্তর পড়ছে। এটি প্রমাণ করে লবণাক্ততার উৎস মাটির নিচ থেকে আসছে। বর্ষা ও গ্রীষ্মের তাপমাত্রা পরিবর্তন এই ক্ষয়ের গতি আরও বাড়াচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ক্ষয়রোধে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে, যার নেতৃত্বে আছেন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন করেছি। দেয়ালের কয়েকটি অংশে লবণাক্ততার মাত্রা অত্যধিক। ইউনেস্কোর সহায়তায় সংরক্ষণ ও সংস্কার কাজ দ্রুত শুরু করার সুপারিশ করা হয়েছে। এখন ব্যবস্থা না নিলে মূল কাঠামো ঝুঁকিতে পড়বে।
অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলি ইয়াসমিন বলেন, ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। লবণাক্ততা রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ইউনেস্কোর সহায়তায় প্রতিটি দেয়াল ও গম্বুজের মানচিত্র তৈরি করা হবে।’
প্রতিদিন শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক এই বিশ্ব ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে বাগেরহাটে আসেন। কেউ বিস্ময়ে, কেউ উদ্বেগে দেখেন দেয়ালের বিবর্ণতা। ইতিহাসবিদদের মতে, ষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয় এটি বাংলাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।
তবে লবণাক্ততার ক্ষয় নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে এই অসাধারণ ঐতিহ্যের মূল রূপ।
ইউডি/রেজা

