হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জামায়াত ও এনসিপি, আদেশে স্পষ্টতা দাবি

হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জামায়াত ও এনসিপি, আদেশে স্পষ্টতা দাবি

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫, আপডেট ১০:১৫

নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবি পূরণ না হলেও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সর্বাত্মক প্রচার চালাবে জামায়াতে ইসলামী। হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে এনসিপিও। তবে দলটি সনদ অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়নের আদেশ স্পষ্ট করতে সরকারের কাছে দাবি জানাবে।

গণমাধ্যমকে এসব কথা বলেন দুই দলের নেতারা। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেছেন, পুরো দেশই সংস্কারের পক্ষে। জামায়াতও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে। তবে নির্বাচনের আগে গণভোট হওয়া উচিত বলে জামায়াত এখনও মনে করে। গণভোটের তপশিল ঘোষণার পর সর্বাত্মক প্রচার চালানো হবে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন বলেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা অনুচিত হয়েছে। তার পরও এনসিপি আদেশকে গ্রহণ করেছে। তারা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে থাকবে।

সনদ অনুযায়ী সংস্কারে জোর
গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতি সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন, যা জাতির উদ্দেশে ভাষণে তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আদেশে ৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, গণভোটে প্রশ্ন করা হবে ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবে সম্মতি দিচ্ছেন?’

জুলাই সনদে সংবিধান সংশোধন করতে হবে এমন ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। চারটি বিষয়ে এসব প্রস্তাব আগামী ফেব্রুয়ারির গণভোটে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর পদে মেয়াদ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অধিকাংশ দলের ঐকমত্য হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, এসব প্রস্তাব আগামী সংসদের সদস্যদের নিয়ে গঠিত সংবিধান পরিষদ বাধ্য থাকবে।

পিআর পদ্ধতিতে ১০০ সদস্যের সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে কমিটির মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এবং ন্যায়পালের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ-সংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাবেও বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।

কিন্তু নোট অব ডিসেন্ট উপেক্ষা করে এই আট সংস্কার প্রস্তাব এবং নির্বাচন কমিশন গঠনকে গণভোটের প্রশ্নে ক এবং খ ভাগে রাখা হয়েছে। আদেশের ৪(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।’

সরকার এবং সদ্য বিলুপ্ত ঐকমত্য কমিশন সূত্র সমকালকে বলেছে, বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে এই ৯ সংস্কার প্রস্তাবকে আলাদা করে গণভোটে দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো দলের নোট অব ডিসেন্টের কার্যকারিতা না থাকে।

প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে না থাকা, বিচারপতি নিয়োগে কমিশন গঠনসহ ৯ সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্ট আছে। তা গ্রহণ করে গণভোটের প্রশ্নের ঘ ভাগে বলা হয়েছে, এসব সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

জামায়াত এবং এনসিপির চারজন নেতা গণমাধ্যমকে বলেছেন, ক এবং খ অংশে যে ৯ সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, সেগুলো গণভোটে পৃথকভাবে রাখা হয়েছে বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতার জন্য। কিন্তু ঐকমত্য হওয়া ৩০ সংস্কার বাস্তবায়নে গ অংশে যেভাবে বাধ্য থাকার কথা বলা হয়েছে, এই দুই ক্ষেত্রে তা নেই। শব্দের এই মারপ্যাঁচ ভবিষ্যতে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না চাওয়া দলগুলোকে সুযোগ তৈরি করে দেবে। তারা নির্বাচনে জয়ী হলে অজুহাত দিতে পারবে ৯ মৌলিক সংস্কার নোট অব ডিসেন্ট হবে। শেষ পর্যন্ত আদেশের ব্যাখ্যা আদালতে গড়ালে সংকট তৈরি হবে।

অস্পষ্টতা দূর করার দাবি জামায়াত-এনসিপির
সনদ বাস্তবায়নের আদেশে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করলেও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ জানান, তাদের দল হ্যাঁ ভোটের পক্ষে থাকবে। তবে এসব অস্পষ্টতা দূর করতে এনসিপি সরকারকে বলবে।

খালেদ সাইফুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেছেন, আদেশের ৪(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।’ সংস্কার কীভাবে হবে– সনদে এ-সংক্রান্ত ভাষ্য রয়েছে। কিন্তু আদেশে বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে’ হবে। কেউ ভবিষ্যতে সনদ বাস্তবায়ন করতে না চাইলে এ অস্পষ্টতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে। তাই ‘বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে’র পরিবর্তে আদেশে সনদ অনুযায়ী ‘ভাষ্য’ শব্দটি ব্যবহৃত হওয়া উচিত।

এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ১৮০ দিনের মধ্যে সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করবে। কিন্তু কী করতে বাধ্য, তা স্পষ্ট করে আদেশে বলা নেই। ফলে পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সংস্কারবিরোধী অবস্থান থাকলে সনদ বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এনসিপির একটি সূত্রের দাবি, ঐকমত্য কমিশন বিলুপ্ত হওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয় আদেশের চূড়ান্ত ভাষ্যটি তৈরি করে। সেখানে এ ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। শব্দের মারপ্যাঁচে নোট অব ডিসেন্ট রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তারা দাবি করছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোট হলে আবার কীসের নোট অব ডিসেন্ট। একটি দলের ভিন্নমত নয়, জনগণ গণভোটে যে রায় দেবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি জনগণ না ভোট দেয়, জামায়াত তা মেনে নেবে। হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে সনদ এবং আদেশে যেভাবে রয়েছে, সেভাবেই সংস্কার করা হবে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সংস্কার থেকে একচুল সরবে না। সংস্কারবিরোধী কোনো দল ক্ষমতায় গেলেও একচুল সরতে দেবে না। তবে সরকারের উচিত, আদেশটি আরও স্পষ্ট করে নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন; যাতে আগেই সংস্কার বাস্তবায়ন করা যায়।

প্রচারে জামায়াত, এনসিপি চুপচাপ
জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা ইতোমধ্যে হ্যাঁ ভোটের প্রচার শুরু করেছেন সামাজিক মাধ্যমে। গত শুক্রবার বিএনপি নেতা জয়নাল আবদিন ফারুক নোয়াখালীতে গণসংযোগে ধানের শীষের পাশাপাশি না ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। বিএনপি সূত্রের খবর, প্রকাশ্যে না ভোট চাওয়ায় তাঁকে সতর্ক করা হয়েছে।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, জামায়াত প্রার্থীরা দাঁড়িপাল্লার পাশাপাশি হ্যাঁ ভোট চাওয়া শুরু করে দিয়েছেন। দলের নির্বাচনী প্রচার যেভাবে করা হবে, হ্যাঁ ভোটের প্রচারও একই রকম গুরুত্ব দিয়ে করবে জামায়াত।

এনসিপি নেতা এবং সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে বলছেন। তবে গণসংযোগ এবং নির্বাচনী প্রচারে গণভোটের আলোচনা তোলেনি দলটি। একাধিক নেতা বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারে নামার পর আনুষ্ঠানিকভাবে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে নামবে দলটি।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading