ইন্ডিগোর ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল, ঝুঁকির মুখে ইন্ডিয়ার বেসামরিক বিমান পরিবহণ খাত

ইন্ডিগোর ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল, ঝুঁকির মুখে ইন্ডিয়ার বেসামরিক বিমান পরিবহণ খাত

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০২৫, আপডেট ১৭:৪৮

ইন্ডিয়ার সবচেয়ে বড় এয়ারলাইন ইন্ডিগোর ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল দেশজুড়ে তৈরি করেছে। বিপাকে পড়েছে হাজার হাজার যাত্রী। এই ঘটনাকে ইন্ডিয়ার দ্রুত-বর্ধনশীল বেসরকারি বিমান পরিবহণ খাতে ‘দ্বৈত-প্রধানতা’ ধরনের পরিস্থিতির অন্তর্নিহিত ঝুঁকির স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

৬৫ শতাংশ ঘরোয়া মার্কেট শেয়ার নিয়ে ইন্ডিগো বছর ধরে লাখো ইন্ডিয়াকে সাশ্রয়ী মূল্যে বিমানে ভ্রমণের সুযোগ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত বলেছিলেন, “চটি-পায়ে থাকা মানুষেরও বিমানে থাকা উচিত।” এয়ারলাইনটি সময়নিষ্ঠতা ও কম ভাড়ার প্রতিশ্রুতিতে ইন্ডিয়ার বিমানযাত্রার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু গত সপ্তাহে সবকিছু বদলে যায়। পাইলটের ঘাটতি—নতুন কাজের সময়সীমা সংক্রান্ত নিয়ম মানতে পরিকল্পনার ব্যর্থতা—এ কারণে অন্তত ২ হাজার ফ্লাইট বাতিল করে ইন্ডিগো। এতে ছুটির পরিকল্পনা, বিয়ের অনুষ্ঠানসহ নানা যাত্রা ব্যাহত হয়; টার্মিনালে লাগেজের স্তূপ দেখা যায়—ইন্ডিয়ার বিমান চলাচল ইতিহাসে যা নজিরবিহীন।

ইন্ডিগোর এই বিপর্যয় এমন সময়ে ঘটছে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ার ইন্ডিয়া—২৭ শতাংশ মার্কেট শেয়ারসহ—পুরনো বহর, দুর্বল সেবা ও সাম্প্রতিক বিমান দুর্ঘটনায় ২৬০ জনের মৃত্যুর পর কঠোর তদন্তের মুখে।

ইন্ডিগো জানিয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তবে রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন—এককভাবে এত বড় এয়ারলাইনের ওপর নির্ভরতা পুরো শিল্প ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি করছে; প্রশ্ন উঠছে, ইন্ডিগো কি আসলেই ‘টু বিগ টু ফেইল’?

সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পাইলট ফ্যাটিগ ম্যানেজমেন্টের বিধি শিথিল করেছে। ইন্ডিগো দুঃখ প্রকাশ করলেও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করেনি।

স্টারএয়ার কনসালটিংয়ের চেয়ারম্যান হর্ষ বর্ধন বলেন, “ইন্ডিগোর আকার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এর অপারেশনাল ব্যর্থতা পুরো ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো কিছু দেশে এয়ারলাইন ডুয়োপলি দেখা গেলেও, বিশ্বের জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ চীনে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইনসহ আরও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

ইন্ডিয়ার ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া—এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসসহ—মিলে ৯২ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, যা কার্যত ডুয়োপলি সদৃশ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ছোট শহরগুলোর অনেক রুটে ইন্ডিগো একচেটিয়া কর্তৃত্ব রাখে।

এয়ার ডেকানের প্রতিষ্ঠাতা জি.আর. গোপীনাথ লিখেছেন, “কোনও দেশই ডুয়োপলি বা কার্যকর একচেটিয়া পরিস্থিতিতে শক্তিশালীভাবে উন্নতি করতে পারে না।”

গত এক দশকে কিংফিশার, জেট এয়ারওয়েজ, গো ফার্স্ট দেউলিয়া হলেও নতুন এয়ারলাইন টিকে থাকতে পারছে না। উচ্চ কর, প্রতিযোগিতা ও সাপ্লাই চেইন সংকট এ খাতকে নড়বড়ে করে রাখছে।

২০০৬ সালে রাকেশ গাঙ্গওয়াল ও রাহুল ভাটিয়ার প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিগো এখন ৪০০টির বেশি এয়ারক্রাফট পরিচালনা করে—মূলত এয়ারবাস এথ্রিটুজিরো এবং দৈনিক ২ হাজার ফ্লাইটে প্রায় ৩.৮ লাখ যাত্রী বহন করে। সিইও পিটার এলবার্স (সাবেক কেএলএম প্রধান) এই সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

কোম্পানির এক নির্বাহী বলেন, “এটি কোম্পানির ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ সময়। এই বিঘ্ন ব্র্যান্ড ইমেজকে গভীরভাবে আঘাত করছে।”

গত অর্থবছরে ৯ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ও ৮০৭ মিলিয়ন ডলার মুনাফা করে ইন্ডিগো। তবে এবার ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে—রিফান্ডই ইতোমধ্যে ৬৮ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বড় ক্ষতি হতে পারে সময়নিষ্ঠতার ভাবমূর্তিতে। জুলাই পর্যন্ত ইন্ডিগোর অন-টাইম পারফর্ম্যান্স ছিল ৯১.৪ শতাংশে সেরা অবস্থান। কিন্তু শুক্রবার তা নেমে আসে মাত্র ৩.৭% শতাংশে।

অনেকেই বলছেন, এটি ২০২২ সালে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের বড়দিনের সময়কার ভরাডুবির মতো—যেখানে ১৬ হাজার ৯০০ ফ্লাইট বাতিল হয়েছিল এবং ২ মিলিয়নের বেশি যাত্রী পথে আটকে পড়েছিল, আর কোম্পানির ক্ষতি হয়েছিল অন্তত ৪০০ মিলিয়ন ডলার।

ইন্ডিগোর সংকট তাই শুধু একটি এয়ারলাইনের সমস্যা নয়—এটি ভারতের ভঙ্গুর বেসামরিক বিমান পরিবহণ খাত কাঠামোর গভীর অসুস্থতার লক্ষণ।

সূত্র: রয়টার্স

ইউডি/এআর

ashiqurrahman7863

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading