‘সবকিছু বদলে যাচ্ছে’: মাদুরো ইস্যুতে যে কারণে উদ্বেগে কানাডা

‘সবকিছু বদলে যাচ্ছে’: মাদুরো ইস্যুতে যে কারণে উদ্বেগে কানাডা

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০৬ জানুয়ারী, ২০২৬, আপডেট ১৪:১৫

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আমেরিকায় বিশেষ অভিযানে আটক করার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন ভেনিজুয়েলায় থাকা প্রবাসীরা উল্লাস করছেন, অন্যদিকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ একে সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। তবে এই ঝড়ের ঝাপটা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে আমেরিকার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ঘটনা কেবল ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং এটি কানাডার জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

১. মানবিক দিক: স্বজন ফেরার আকুতি

কানাডায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার ভেনিজুয়েলান বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করেন। তাঁরা রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে কানাডায় অবস্থান করছেন দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে। যাঁরা মাদুরো সরকারের দমন-পীড়নের কারণে নিজ দেশে ফিরতে পারেননি, তাঁরা এখন আশার আলো দেখছেন। কানাডার ওকভিলের বাসিন্দা ইগর মারিন জানান, তাঁর ভাই ইগবার্ট মারিন চ্যাপারো অনেক বছর ধরে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে নির্যাতিত হচ্ছেন। মাদুরোর পতন তাঁর ভাইয়ের মুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। প্রবাসী ভেনিজুয়েলানদের জন্য এটি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের এক নতুন সম্ভাবনা।

২. জ্বালানি বাজার ও তেলের রাজনীতি

ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল মজুতের দেশ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ভেনিজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নেবে। যদি আমেরিকা সরাসরি ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন পরিচালনা শুরু করে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে। পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হ্যানের মতে, এর ফলে তেলের দাম কমে যেতে পারে, যা কানাডার নিজস্ব তেল ও গ্যাসশিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কানাডার অর্থনীতি অনেকাংশেই জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, তাই ভেনেজুয়েলার তেলের বাজারে আমেরিকার একাধিপত্য কানাডার রাজস্বে বড় আঘাত হানতে পারে। উল্লেখ্য, সারা পৃথিবীর যে তেল আছে, তার ১০.৯ শতাংশ মজুত আছে কানাডায়।

৩. সার্বভৌমত্বের হুমকি: কানাডা কি পরবর্তী লক্ষ্য

মাদুরোকে আটকের এই ‘একতরফা’ অভিযান কানাডার থিঙ্ক-ট্যাংক এবং সাবেক কূটনীতিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লয়েড অ্যাক্সওয়ার্থি এ ঘটনাকে ‘নব্য সাম্রাজ্যবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

কানাডার সার্বভৌমত্ব কি ঝুঁকিতে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে ট্রাম্প ইতিপূর্বে গ্রিনল্যান্ড এমনকি কানাডার কিছু অংশ নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে আসার এই নজির প্রমাণ করে যে আমেরিকা তার প্রতিবেশীদের সার্বভৌমত্বের তোয়াক্কা করছে না।

এখানে উল্লেখ‍্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জয়লাভ করার পর কানাডাকে ৫১তম প্রদেশ হওয়ার আহ্বান জানায়।

৪. অর্থনৈতিক বিরোধ ও তিক্ততা

আমেরিকা ও কানাডার মধ্যে বর্তমানে শুল্ক (ট্যারিফ) এবং বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে গভীর বিরোধ চলছে। অটোয়ার ওপর ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপ দিন দিন বাড়ছে। এই পটভূমিতে ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপ কানাডীয়দের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে অর্থনৈতিক স্বার্থে আমেরিকা যেকোনো সময় কানাডার অভ্যন্তরীণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতে পারে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য জোটে (ইউএসএমসিএ) আমেরিকা নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে যে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, তা কানাডার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই অভিযানকে ‘বিপজ্জনক নজির’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সোমবার নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ভেনিজুয়েলার এই পরিবর্তন কানাডার জন্য একদিকে যেমন মানবিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কানাডাকে এক কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading