অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মূল্যায়ন জরুরি

অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মূল্যায়ন জরুরি

শিলা আক্তার। রবিবার, ১১ জানুযারি, ২০২৬, আপডেট ১১:০০

আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। তারা দেশের সীমান্ত পেরিয়ে অজানা ভূমিতে, অচেনা ভাষা ও সংস্কৃতির মাঝে, কঠোর পরিশ্রম করে বিদেশি মুদ্রা দেশে পাঠান। তাদের এই ঘাম, ত্যাগ আর ভালোবাসায় আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল। সরকার, অর্থনীতি ও সমাজ- সবক্ষেত্রেই তাদের অবদান অনন্য ও অবিস্মরণীয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রবাসী শ্রমিকদের ভূমিকা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ষাট ও সত্তরের দশকের শেষ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ বাঙালি গিয়ে কাজ শুরু করেন। কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ গৃহকর্মী, কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যবসায়ী-তারা সবাই একসঙ্গে এক নামে পরিচিত- রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো অর্থবছরে এত প্রবাসী আয় আসেনি। এই অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকে, ব্যাংকিং খাত সমৃদ্ধ হয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল থাকে। গ্রামে নতুন বাড়ি তৈরি হয়, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ হয়, কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ে। এই প্রবাসী আয় দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) একটি বড় অংশ দখল করে আছে। অনেক অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘রেমিট্যান্স হচ্ছে বাংলাদেশের জীবনরস।’ যখন দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরগতি আসে, তখন এই প্রবাসীদের পাঠানো টাকাই অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখে।

যে মানুষ নিজের পরিবারকে সুখ দিতে গিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন, সেই মানুষকেই অনেক সময় দেশে ফেরার পর ভুলে যায় সমাজ। রেমিটেন্সের টাকাটা যদি সঠিক পথে আসে, অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আসে, তাহলে রাষ্ট্রের জন্য তা আশীর্বাদ। কারণ বৈধ চ্যানেলে পাঠানো অর্থে সরকার বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে পারে, যার মাধ্যমে বাজেট স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডি বা অবৈধ পথে দেশে আসে। এই অবৈধ লেনদেন শুধু রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, প্রবাসীর কষ্টার্জিত অর্থকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। অনেক সময় হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো টাকা প্রাপকের কাছে না পৌঁছে যায় অন্যের হাতে। অতএব, প্রবাসীদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও দ্রুত ব্যাংকিং চ্যানেল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে বহু বেদনার ইতিহাস, পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের অবহেলায় ভেঙে পড়ে তাদের শেষ বয়স। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখছেন বিদেশে কর্মরত প্রবাসীরা। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমজীবীরা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে সবচেয়ে বড় অংশ যোগান দেন। কিন্তু বেদনাদায়ক বিষয় হলো, দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এসে অনেকেই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবর্তে পান অবহেলা, নিঃসঙ্গতা আর অসহায়ত্ব। প্রশ্ন জাগে, কেন দেশের অর্থনীতির এ নায়কেরা শেষ বয়সে এতটা অবহেলিত?

বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে জীবন কাটান অগণিত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণকাজ, গৃহপরিচারনা কিংবা নিম্ন আয়ের চাকরিতে নিয়োজিত শ্রমিকরা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রমে নিয়োজিত থাকেন। প্রচ- গরম, ধুলাবালি আর শ্রমঘন কাজের মধ্যেও তাদের জীবন চলে সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও স্বল্প আয়ের উপর নির্ভর করে। অনেক সময় একবেলা খেয়ে বা আধপেটা খেয়ে দিন পার করতে হয়, তবুও তারা প্রিয় পরিবারকে দেশে অর্থ পাঠানোর জন্য সব কষ্ট সহ্য করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে ফেরার পর এই অমানুষিক পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন জীবনের শেষভাগে, কেউ আবার শূন্য হাতে ফিরে আসেন হতাশা আর অবহেলার বোঝা নিয়ে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু এই অঞ্চলে কর্মরত প্রবাসীদের জীবনযাত্রা অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি কষ্টকর। তারা বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করলেও নাগরিকত্ব লাভের কোনো সুযোগ পান না।

দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনের পর দেশে ফেরা অনেকটা একই রকম দৃশ্যপট তৈরি করে। সুন্দর ঘরবাড়ি তৈরি হয়, জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই পরিবারেই তাদের জন্য জায়গা ক্রমেই ছোট হয়ে আসে। সন্তানরা বিদেশে পড়াশোনা বা চাকরিতে চলে যায়, ফলে তারা বাবা-মাকে আর আগের মতো সময় দিতে পারে না। অন্যদিকে স্ত্রী সামাজিক ও পারিবারিক কর্মকা-ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, নিজের একটি আলাদা জগৎ গড়ে তোলেন। ফলে প্রবাসী পিতা, যিনি একসময় পরিবারের মূল ভরসা ছিলেন, দেশে ফিরে হয়ে যান নিঃসঙ্গ ও একাকী। জীবনের সোনালি সময় অন্যের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য উৎসর্গ করার পর বার্ধক্যে এসে তিনি পান না মানসিক আশ্রয় বা পারিবারিক উষ্ণতা। রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতা প্রবাসীদের জীবনে প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয়। বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে তারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও, নিজেদের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন পরিকল্পনা দেখতে পান না। অবসরের পর তাদের জন্য নেই কোনো পেনশনভিত্তিক আর্থিক নিরাপত্তা, নেই উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা। কর্মক্ষম বয়স শেষ হলে তারা পরিবার ও সমাজ থেকে অবহেলিত হয়ে পড়েন।

পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অনেক প্রবাসীর জীবনে বড় বিপদ বয়ে আনে। বিদেশে বছরের পর বছর কষ্টের উপার্জন দেশে পাঠালেও বেশিরভাগ সময় তারা নিজেরাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অনেকেই আত্মীয়-স্বজন বা পরিবারের সদস্যদের উপর ভরসা করে জমি কেনা বা ব্যবসায় অর্থ খাটান। কিন্তু এই ভরসাই অনেক সময় তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, অসাধু আত্মীয় বা বিশ্বস্তজনেরা সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করে বসে। ফলে সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে যায়, জমি হাতছাড়া হয় বা ব্যবসা ভেস্তে যায়। দেশে ফেরার পর প্রবাসীরা তখন এক ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে যান। প্রবাস জীবনের আরেকটি বড় নেতিবাচক দিক হলো, শারীরিক ক্ষয় ও স্বাস্থ্যের অবনতি। বছরের পর বছর কঠিন পরিশ্রমে যুক্ত থেকে অনেক শ্রমিকই নানান রোগ-ব্যাধিতে ভোগেন। বিশেষ করে নির্মাণশ্রমিকদের কোমর ও হাঁটুর ব্যথা, ড্রাইভারদের হাড় ও স্নায়ুজনিত সমস্যা, আর গৃহপরিচারিকাদের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ প্রায়ই তাদের স্থায়ী দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব শারীরিক ক্ষতি অনেক সময় কর্মক্ষম জীবন শেষ হওয়ার আগেই অসুস্থ করে তোলে, আর অবসরের পর পুরোপুরি ভোগায়। ফলে দেশে ফেরার পর সুস্থভাবে জীবনযাপন করার বদলে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন, যার ব্যয়ভারই হয়ে ওঠে প্রধান বোঝা।

ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রবাসীদের জীবনযাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো ও স্থিতিশীল। এসব দেশে কাজের পাশাপাশি তারা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ পান, দীর্ঘদিন অবস্থানের পর নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারেন এবং অবসরের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে সামাজিক নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করেন। ফলে প্রবাস জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের হাতে থাকে একটি স্থায়ী আশ্রয়, অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ। কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেও তারা নাগরিকত্ব পান না, পরিবারকে সঙ্গে রাখতে পারেন না এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হলে তাদের দেশে ফিরতে হয়। অবসরের পর কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় সহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা না থাকায় এই অঞ্চলের প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ থেকে যায় অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রবাস জীবন শুরু করার ক্ষেত্রে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২২ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে প্রবাস জীবনের যাত্রা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। কারণ, এই সময়ে শরীর থাকে শক্তিশালী এবং কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতাও সর্বোচ্চ থাকে। পাশাপাশি এই বয়সে উপার্জিত অর্থকে ভবিষ্যতের জন্য সঠিকভাবে বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা করার সুযোগও থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। প্রবাস জীবনের সমাপ্তি কখন টানা উচিত, তা অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অভিজ্ঞরা মনে করেন, ৪০ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে দেশে ফিরে আসাই সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ, এই বয়সের পর কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করা কঠিন হয়ে যায় এবং বিদেশে কাজ করার সম্ভাবনাও অনেকাংশে কমে যায়। বরং দেশের মাটিতে ফিরে এসে ব্যবসা, কৃষিকাজ বা বিনিয়োগের দিকে মনোযোগ দিলে বাকি জীবনটি স্বাচ্ছন্দ্যে, নিরাপদে এবং পরিকল্পিতভাবে কাটানো সম্ভব। এতে প্রবাস জীবনের পরিশ্রমের অর্থও সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় এবং পরবর্তী জীবনের জন্য স্থিতিশীল ভিত্তি তৈরি হয়।

প্রবাস জীবনের লাভ-ক্ষতির তুলনা করলে এই জীবনধারার বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। একদিকে এর লাভের মধ্যে রয়েছে পরিবারের আর্থিক উন্নতি, যা গৃহস্থালির জীবনযাত্রাকে সহজ করে তোলে, সন্তানদের উন্নত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে এবং সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধি করে। প্রবাসে উপার্জিত অর্থ অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তবে অন্যদিকে এর ক্ষতিও কম নয়। দীর্ঘ দিন বিদেশে থাকার ফলে শারীরিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। এমনকি অবসরে দেশে ফিরে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না থাকায় জীবনযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, যা প্রবাস জীবনের সুখকে আংশিকভাবে ক্ষুন্ন করে। তবে সব গল্প কেবল হতাশার নয়। অনেকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রবাস জীবন সফল করেছেন। দেশে ফেরার আগে সঞ্চয় থেকে ছোট ব্যবসা শুরু করেছেন, কৃষি বা শিল্পে বিনিয়োগ করেছেন। ফলে দেশে ফেরার পর তারা নির্ভরশীল না হয়ে হয়েছেন স্বাবলম্বী। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকলে এই ইতিবাচক গল্প আরও বাড়তে পারে। যেমন, প্রবাসীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবিমা, দেশে বিনিয়োগে কর ছাড়, বা পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি। এসব থাকলে প্রবাসীরা দেশে ফেরার পর নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করতে পারবেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading