অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষয়ে গেছে ইরান, তার জেরেই এই বিক্ষোভ

অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষয়ে গেছে ইরান, তার জেরেই এই বিক্ষোভ

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ১২ জানুয়ারি , ২০২৬, আপডেট ১৩:৫৫

ইরান বলতেই একধরনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রসঙ্গ মাথায় আসে। দেশটির বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের এন্তার অভিযোগ—সে দেশে মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়। দেশটির ওপর নানা ধরনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও আছে। তারপরও দেশটি টিকে আছে।

নিষেধাজ্ঞার মুখে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নজর দিয়েছে ইরান। তার ঝলক গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক দিনের যুদ্ধে দেখাও গেছে। কিন্তু দেশটি ভেতর থেকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষয়ে গেছে। দেশটিতে চলমান আন্দোলন তার জেরেই। বাস্তবতা হলো, ভয়াবহ মূল্যস্ফীতিতে ইরান জেরবার। মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে ইরান এখন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেখা যাক, বিপ্লবের আগে-পরে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল। আজকের এ অবস্থায় তারা কীভাবে উপনীত হলো।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের অর্থনীতি ছিল দ্রুত সম্প্রসারণশীল। এখনকার মতো তখনো দেশটি ছিল তেলনির্ভর। ১৯৬০–৭০-এর দশকে শাহের শাসনামলে তেল বিক্রির অর্থে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগরায়ণ হয়েছে। ওই সময় ইরানের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বিস্তৃত হয় শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তখন ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আধুনিক অর্থনীতি হয়ে ওঠে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত যা হয়, ইরানেও তা–ই হয়েছে। সেটা হলো, এই প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছায়নি। গ্রাম-শহরের বৈষম্য, তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুঁজির উত্থান ও সামাজিক অসন্তোষ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক অগ্রগতির আড়ালে গভীর সংকট তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে শেষমেশ রাজনৈতিক বিস্ফোরণের পথ প্রশস্ত হয়।

বিপ্লবের আগে প্রবৃদ্ধি: বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, ১৯৬১ সালে ইরানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৭৫ সালে সংকোচন ছাড়া এই ১৪ বছরে দেশটির গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। ১৯৭৬ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি হয় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বিপ্লবের বছর ১৯৭৯ সালে দেশটির জিডিপি সংকোচন হয় ১২ শতাংশ। ১৯৮০ সালে সংকোচন হয় ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৯৮১ সালেও সংকোচন হয় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর ১৯৮২ সালে একধাপে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর ইরান ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে দুই অঙ্কের ঘরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। কিন্তু এরপর ইরানের প্রবৃদ্ধি আর কখনো দুই অঙ্কের ঘরে যায়নি। ২০১০ সালের পর বেশ কয়েক বছর দেশটির অর্থনৈতিক সংকোচন হয়েছে।

অর্থনীতির কাঠামো: ইরানের অর্থনীতি মূলত মিশ্র ও হাইড্রোকার্বননির্ভর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ তেল ও গ্যাস মজুত এই দেশে। তবে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক সংকট ও ২০২৫ সালের ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতি চাপের মুখে আছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (তেলসহ) জিডিপি শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

দেশটির জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৫০ শতাংশের বেশি। চীনে ছাড় দিয়ে রপ্তানি করলেও তেল থেকে বার্ষিক আয় প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। রিয়ালের রেকর্ড দরপতন হয়। বেকারত্বের হার ৯-১০ শতাংশের মধ্যে। ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে ইরানের অর্থনীতির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ বিপ্লবী বাহিনী আইআরজিসির হাতে। ভর্তুকিজনিত ঘাটতি ও সীমিত বৈচিত্র্যের কারণে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে, যদিও তেলবহির্ভূত খাতে কিছুটা সহনশীলতা দেখা যাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, ইরানের অর্থনীতি এখন একধরনের ধৈর্যের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাপের মুখে এটি বাঁকতে পারে, কিন্তু ভেঙে পড়ে না। ইরানের অর্থনীতি সম্পর্কে একবাক্যে এ কথাই বলা যায়। দেশটির প্রবৃদ্ধির হার কমছেই। মানুষের জীবনমানের স্থায়ী উন্নতি হয়নি। মুদ্রা দুর্বল-বিনিয়োগ কমে গেছে। এই সংকট যে আকাশ থেকে ভেঙে পড়েছে, বিষয়টি মোটেও তা নয়। বরং গত কয়েক দশকে নেওয়া বিভিন্ন কাঠামোগত সিদ্ধান্তের সঞ্চিত ফল।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরানের আজকের স্থবিরতার মূল কারণ কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং পারমাণবিক সংকট শুরুর আগেই তার সূত্রপাত। ১৯৭৯ সালের পর ইরানের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো যেভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে, এই সংকটের গোড়া সেখানেই। ইরানের অর্থনৈতিক সংস্কার কখনোই শেষ হয়নি।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading