হিমালয়ে কমেছে শীতকালীন তুষারপাত, বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকি

হিমালয়ে কমেছে শীতকালীন তুষারপাত, বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকি

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, আপডেট ১৫:৫৫

শীতকাল হলেও হিমালয়ের অনেক অংশে এখন আর তুষারের চাদর দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ের গা খালি ও পাথুরে হয়ে উঠছে যদিও এ সময়ে এসব অঞ্চল বরফে ঢাকা থাকার কথা।

আবহাওয়াবিদ ও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, গত কয়েক বছরে হিমালয় অঞ্চলে শীতকালীন তুষারপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তাঁদের মতে, গত পাঁচ বছরের অধিকাংশ শীতেই তুষারপাতের পরিমাণ ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের গড়ের তুলনায় কম ছিল। একই সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়ায় অল্প যে তুষার পড়ছে, সেটিও দ্রুত গলে যাচ্ছে। নিচু উচ্চতার এলাকাগুলোতে তুষারের বদলে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে, যা আংশিকভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফল।

বিভিন্ন গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, হিমালয়ের বহু অংশে এখন শীতকালে ‘স্নো ড্রাউট’ বা তুষার-খরা দেখা দিচ্ছে—অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় তুষারপাত মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইন্ডিয়ার পার্বত্য রাজ্যগুলোসহ পুরো অঞ্চলের জন্য একটি বড় সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে তুষারপাত কমে যাওয়ায় সেই সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

তাঁরা বলেন, বরফ ও তুষার কমে যাওয়া শুধু হিমালয়ের প্রাকৃতিক রূপ বদলে দেবে না, বরং এই অঞ্চলের কয়েকশো মিলিয়ন মানুষের জীবনযাপন ও অসংখ্য বাস্তুতন্ত্রের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। শীতকালে জমে থাকা তুষার বসন্তে গলে নদী ও ঝরনায় পানির যোগান দেয়। এই তুষারগলা পানিই অঞ্চলটির নদ-নদী ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা পানীয় জল, কৃষি সেচ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তুষারপাত কমে যাওয়ায় এই পানি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, শুধু পানি সংকটই নয়—শীতকালীন বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত কমে যাওয়ায় শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা বনভূমিতে আগুন লাগার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁদের মতে, হিমবাহ ও তুষার পাহাড়কে একত্রে ধরে রাখার জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘সিমেন্ট’-এর কাজ করে। এগুলো কমে গেলে পাহাড় অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এর ফল হিসেবে পাথরধস, ভূমিধস, হিমবাহ-হ্রদ ফেটে যাওয়া এবং বিধ্বংসী কাদামাটির স্রোতের মতো দুর্যোগ আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন ঘটছে।

কতটা ভয়াবহ এই তুষারপাতের ঘাটতি: ইন্ডিয়ার আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে উত্তর ইন্ডিয়ার প্রায় সব এলাকাতেই কোনো ধরনের বৃষ্টি বা তুষারপাত রেকর্ড করা হয়নি। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম ইন্ডিয়ার বহু অংশে—বিশেষ করে উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর ও লাদাখে—দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ কম বৃষ্টি ও তুষারপাত হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি গড় বা এলপিএ (লং পিরিয়ড অ্যাভারেজ) বলতে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ বছরের বৃষ্টি ও তুষারপাতের গড় হিসাবকে বোঝানো হয়। এর ভিত্তিতেই বর্তমান আবহাওয়াকে স্বাভাবিক, অতিরিক্ত বা ঘাটতিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। উত্তর ভারতের ক্ষেত্রে ১৯৭১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১৮৪.৩ মিলিমিটার।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই তীব্র ঘাটতি কোনো এককালীন ঘটনা নয়। ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজির প্রধান গবেষক কিয়েরান হান্ট বলেন, “বিভিন্ন তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে আমরা এখন শক্ত প্রমাণ পাচ্ছি যে হিমালয়ে শীতকালীন বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত সত্যিই কমে যাচ্ছে।”

২০২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর সহলেখকত্বে করা এক গবেষণায় ১৯৮০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চারটি ভিন্ন তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, পশ্চিম হিমালয় ও মধ্য হিমালয়ের কিছু অংশে তুষারপাত ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপীয় আবহাওয়া সংস্থার ইআরএ–৫ ডেটাসেট ব্যবহার করে জম্মুর আইআইটির গবেষক হেমন্ত সিং জানান, উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ে গত পাঁচ বছরে তুষারপাত ১৯৮০–২০২০ সালের দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে।

নেপালেও একই রকম পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় হিমালয় অবস্থিত এই দেশটিতে শীতকালীন বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয় অঞ্চলে বিশেষ করে ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ মিটার উচ্চতায় তুষার-খরা ক্রমেই বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিমোডের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, হিমালয়ের ১২টি প্রধান নদী অববাহিকায় মোট বার্ষিক পানিপ্রবাহের গড়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে তুষারগলা পানি থেকে। ফলে মৌসুমি তুষারের স্থায়িত্বে ব্যাঘাত ঘটলে প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের পানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ গলে যাওয়া পানি সংকট তৈরি করবে, আর স্বল্পমেয়াদে কম তুষারপাত ও দ্রুত তুষারগলা পানির যোগান কমিয়ে দেবে।

কেন কমছে তুষারপাত: বেশিরভাগ আবহাওয়াবিদ মনে করেন, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা শীতকালীন পশ্চিমা লঘুচাপ বা ‘ওয়েস্টারলি ডিস্টার্ব্যান্স’ দুর্বল হয়ে পড়াই এর প্রধান কারণ। অতীতে এই লঘুচাপগুলো উত্তর ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও নেপালে শীতকালে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি ও তুষার নিয়ে আসত, যা ফসল ও পাহাড়ি তুষারভাণ্ডার পুনরুদ্ধারে সহায়ক ছিল।

তবে গবেষণাগুলোতে ভিন্নমতও রয়েছে। কিছু গবেষণায় পশ্চিমা লঘুচাপের ধরনে পরিবর্তনের কথা বলা হলেও, অন্যগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিয়েরান হান্ট বলেন, ‘শীতকালীন বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন যে পশ্চিমা লঘুচাপের সঙ্গেই যুক্ত, এতে সন্দেহ নেই। আমরা মনে করি, এগুলো এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে আরও উত্তরের দিকে সরে যাচ্ছে। ফলে আরব সাগর থেকে যথেষ্ট আর্দ্রতা সংগ্রহ করতে পারছে না।’

ইন্ডিয়ার আবহাওয়া অধিদপ্তর চলতি শীতে উত্তর ভারতে যে পশ্চিমা লঘুচাপ দেখা গেছে, তাকে ‘দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, কারণ এগুলো খুব সামান্য বৃষ্টি ও তুষারপাত ঘটাতে পেরেছে।

দ্বিমুখী সংকটে হিমালয়; বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে হয়তো শীতকালীন তুষারপাত কমে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি বুঝতে পারবেন। তবে এখনই যা স্পষ্ট, তা হলো—হিমালয় একযোগে দুটি বড় সংকটে পড়েছে।

একদিকে দ্রুত হারে হারিয়ে যাচ্ছে হিমবাহ ও বরফক্ষেত্র, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে শীতকালীন তুষারপাত। এই দুয়ের মিলিত প্রভাব হিমালয় অঞ্চল ও তার নিম্নভূমির দেশগুলোর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিণতি ডেকে আনবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ বিনোদ পোখরেল বলেন, ‘গত অক্টোবর থেকে নেপালে এক ফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। গত পাঁচ বছর ধরেই শীতকাল প্রায় একই রকম শুষ্ক যাচ্ছে।’

তবে আবহাওয়াবিদরা এটাও জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু শীতে ভারী তুষারপাত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ও চরম ঘটনা—আগের মতো সমানভাবে বিস্তৃত শীতকালীন বৃষ্টিপাত আর দেখা যাচ্ছে না।

সূত্রঃ বিবিসি

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading