কাশ্মীরের মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দিল ইন্ডিয়া

কাশ্মীরের মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দিল ইন্ডিয়া

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, আপডেট ১৪:৪০

ইন্ডিয়া-শাসিত কাশ্মীরের একটি মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেডিকেল কলেজটিতে বিপুল সংখ্যক মুসলিম শিক্ষার্থীর ভর্তির বিরুদ্ধে উগ্রপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর প্রতিবাদের মুখে ইন্ডিয়া সরকার কলেজটি বন্ধ করে দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্ডিয়ার ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন (এনএমসি) গত ৬ জানুয়ারি জম্মু ও কাশ্মীরের রিয়াসি জেলায় অবস্থিত ‘শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী মেডিকেল ইনস্টিটিউট’ (এসএমভিডিএমআই)-এর অনুমোদন বাতিল করেছে।

গত নভেম্বরে এমবিবিএস প্রোগ্রামে যে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৪২ জনই ছিলেন মুসলিম। বাকিদের মধ্যে সাতজন হিন্দু এবং একজন শিখ। একটি হিন্দু ধর্মীয় ট্রাস্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এবং সরকারের আংশিক অর্থায়নে পরিচালিত এই বেসরকারি কলেজটির এটিই ছিল প্রথম ব্যাচ।

পুরো ইন্ডিয়ায় মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ নামক একটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়।

কাশ্মীরের বেসরকারি এই মেডিকেল কলেজটির প্রথম এমবিবিএস ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় হিন্দু গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, যেহেতু কলেজটি বৈষ্ণো দেবী মন্দিরের ভক্তদের দানে পরিচালিত হয়, তাই মুসলিম শিক্ষার্থীদের সেখানে পড়ার কোনো অধিকার নেই।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে এই আন্দোলন চলে। বিক্ষোভকারীরা প্রতিদিন কলেজের গেটের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকে। এমনকি ক্ষমতাসীন ইন্ডিয়ান জনতা পার্টির (বিজেপি) বিধায়করা কাশ্মীরের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কাছে চিঠি লিখে দাবি করেন যে, এই কলেজে ভর্তি শুধুমাত্র হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হোক।

বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার পর, গত ৬ জানুয়ারি এনএমসি ঘোষণা করে যে, কলেজটি সরকারের নির্ধারিত প্রয়োজনীয় ‘ন্যূনতম মানদণ্ড’ পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এর অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। তবে আল জাজিরার সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজে অবকাঠামোগত কোনো ঘাটতি ছিল না; বরং এটি অনেক সরকারি কলেজের চেয়েও উন্নত ছিল।

জম্মুর রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাফর চৌধুরী এনএমসির এই সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি অবকাঠামোগত ঘাটতি থাকতই, তাহলে এনএমসি শুরুতে কেন অনুমোদন দিয়েছিল? তিনি বলেন, ভর্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি ধর্ম-নিরপেক্ষ ও মেধার ভিত্তিতে হয়, তাই শিক্ষার্থীদের পরিচয় নিয়ে বিক্ষোভ অযৌক্তিক।

এদিকে বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, এনএমসি খতিয়ে দেখে ঘাটতি পেয়েছে বলেই অনুমোদন বাতিল হয়েছে। বিজেপির মুখপাত্র আলতাফ ঠাকুর দাবি করেন, তারা মুসলিমদের বিরোধী নন, তবে ভক্তদের ধর্মীয় আবেগকে গুরুত্ব দিতে হবে।

কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “সাধারণত মানুষ মেডিকেল কলেজ খোলার জন্য লড়াই করে, কিন্তু এখানে লড়াই হয়েছে কলেজ বন্ধ করার জন্য।”

মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, এই ৫০ জন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেওয়া হবে না এবং তাদের অন্য কলেজে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।

মেডিকেল কলেজটির শিক্ষার্থীরা বর্তমানে বাড়িতে ফিরে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সানিয়া আক্ষেপ করে আল-জাজিরাকে বলেন, “আমি ইন্ডিয়ার অন্যতম কঠিন একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে সিট পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন সবকিছু ভেঙে পড়েছে। আমাদের পরিচয়ের কারণেই আজ মেধার বদলে ধর্ম বড় হয়ে দাঁড়াল।”

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading