পে স্কেলের টাকা গেল ভর্তুকি ও ঋণ মওকুফে
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, আপডেট ১০:০০
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতিক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কমিশন বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে সংরক্ষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই অন্য খাতে সরিয়ে নিয়েছে সরকার। যার বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে জ্বালানি খাতের ভর্তুকি এবং নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে। ফলে চলতি অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
শনিবার (১৪ মার্চ) অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কমিশন বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে সংরক্ষিত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই ইতোমধ্যে অন্য খাতে সরিয়ে নিয়েছে সরকার। এর বড় অংশ ব্যয় হয়েছে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি এবং নির্বাচনি ইশতেহারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পূরণে। ফলে চলতি অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতের জন্য সংরক্ষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে আলাদাভাবে এই অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার বদলে যায়।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও দাম বৃদ্ধির কারণে সরকারকে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকদের ঋণ সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যও নতুন বরাদ্দের প্রয়োজন দেখা দেয়।
অর্থ বিভাগ জানায়, সংরক্ষিত অর্থ থেকে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে ভর্তুকি হিসেবে ২৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে সহায়তার জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দিতে পরিবারের একজন নারী সদস্যকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে এ কর্মসূচির জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এসব খাতে অর্থ বরাদ্দের ফলে বেতন কমিশনের জন্য সংরক্ষিত অর্থের প্রায় পুরোটা ব্যয় হয়ে গেছে। হিসাব অনুযায়ী, ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৯৬১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়নের মতো বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কারণ কমিশন কার্যকর করতে গেলে বিপুল অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান বাজেট কাঠামোর মধ্যে জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারের আর্থিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ফলে আপাতত বেতন কমিশন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এদিকে বেতন বৃদ্ধির জন্য সংরক্ষিত অর্থ অন্য খাতে ব্যয় হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ হতাশা প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চাপে রয়েছে— বিষয়টি তারা বুঝতে পারছেন। তবুও তারা আশা করছেন, সরকার চাইলে পুরো কমিশন বাস্তবায়ন না হলেও অন্তত আংশিক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সামান্য বেতন বৃদ্ধি হলেও তা সরকারি কর্মচারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তাই সরকার পরিস্থিতি বিবেচনায় অন্তত আংশিক সমন্বয়ের উদ্যোগ নেবে এমন প্রত্যাশাই করছেন তারা।
ইউডি/কেএস

