জনস্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ১৬:১৫
দেশের স্বাস্থ্য খাত এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে বিশে^ অন্যতম সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ফলে জনবল সংকট, চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি ও সেবার মানহীনতা থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতের এ বেহাল পরিস্থতির কথা স¤প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া বক্তব্য থেকে আরও স্পষ্ট হয়। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ না পাওয়া, স্বচ্ছতার অভাব, দুর্নীতি এবং দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সমস্যা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে এই খাতে সাধারণ মানুষ সঠিক সেবা পাচ্ছে না। এসব একযোগে সমাধান না হলে স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জিত হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…
স্বাস্থ্যসেবায় মাথাপিছু সরকারি খরচ মাত্র ১০৭০ টাকা
আসাদ এফ রহমান : স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। স্বাস্থ্যসেবায় মাথাপিছু সরকারি খরচ মাত্র ১০৭০ টাকা। সম্প্রতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা বৃদ্ধি; মান নিয়ন্ত্রণের কৌশল’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য উঠে আসে। গত ১০ বছরে বিশ্বের ৫১টি নি¤œমধ্যম আয়ের দেশে বাজেটের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম। ভুটান তাদের মোট জাতীয় বাজেটের ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়। তবে বাংলাদেশে এই আনুপাতিক বরাদ্দ ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। সেখানেও অদক্ষতা, কর্মহীনতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। ফলে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ১৯ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। যদিও ব্যয় হয় ১৩ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ১৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। যদিও ১৫ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত হেলথ ইকোনমিক্স ইউনিট (এইচইউ) ২০২৩ সালের জুলাইয়ে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘রিভিউ অব বাংলাদেশ হেলথ কেয়ার ফাইন্যান্স স্ট্র্যাটেজি ২০১২-৩২’ শীর্ষক স্বাস্থ্য খাতের সুদীর্ঘ অর্থনৈতিক হালচিত্র নিয়ে প্রকাশিত ওই পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থায়নের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বনিম্ন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার মোট ব্যয়ে সরকারি অংশগ্রহণ বাংলাদেশে মাত্র ৩ শতাংশ। এ হার এতটাই কম যে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের চেয়েও নিচে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্য খাতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মালদ্বীপ। দেশটির স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি হিস্যা ১৯ দশমিক ১৫ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ভুটান, যেখানে এ হার ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর তৃতীয় স্থানে শ্রীলংকা, যেখানে সরকারি অর্থায়নের হিস্যা ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবায় দুর্বল ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সা¤প্রতিক প্রতিবেদনেও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলগুলো ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ব্যয়ের কত শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করেছে তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয় তাতে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরো বিশ্বের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, কেবল ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় গড়ে মোট ব্যয়ের ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশই (২০২২ সালে) স্বাস্থ্য খাতে খরচ করে। আর স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় তা গড়ে ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ (২০২০ সালে)। ঋণের দায়ে জর্জরিত গরিব দেশগুলোয় মোট সরকারি ব্যয়ের ৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখে স্বাস্থ্য খাতে।
বর্তমান সরকারের লক্ষ্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
আরিফ হোসেন : স্বাস্থ্য খাতে বিগত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং অনেক জায়গায় ভেঙে পড়েছে। ফলে স্বাস্থ্য খাত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। গত ৩১ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসানের ৭১ বিধিতে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের ওপর আলোচনার সময় তিনি এ কথা বলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সবার জন্য স্বাস্থ্যনীতির আলোকে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রত্যেক নাগরিককে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া।
দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিগত ১৭ বছরে স্বাস্থ্য খাতে কোনো উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম নেওয়া হয়নি। বিগত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অবকাঠামো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মক ব্যাহত হয়েছে। অনেক জায়গায় অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। সংসদ সদস্য কামরুল হাসানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সমস্যার মধ্যে রয়েছে অ্যাম্বুলেন্সের অভাব, সন্ধ্যার পরে ডাক্তারদের নিরাপত্তার অভাব, ডাক্তারদের বসার জায়গার অভাব, রোগীর সংকুলান না হওয়া এবং শয্যার সংখ্যা ১০০ থেকে ২০০ বৃদ্ধি প্রয়োজন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এসব সমস্যা শুধু ওইখানে নয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার পরিসর বৃদ্ধি হওয়া দরকার। কিন্তু বিগত ১৭ বছরে এ দিকে কোনো মনোযোগ দেওয়া হয়নি। জনগণের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে হাসপাতালের স¤প্রসারণ বা লজিস্টিকস বাড়ানো হয়নি। তিনি আরও বলেন, আগামী বাজেটের পর লজিস্টিকস বৃদ্ধি, ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা বৃদ্ধি, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পরিসর বৃদ্ধি করার কাজ শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ নতুন নিয়োগের জন্য কর্মপরিকল্পনা নিয়েছেন। সরকার পর্যায়ক্রমে এসব সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করবে।
এদিকে, সম্প্রতি স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, জিডিপির ৫ শতাংশ টাকা স্বাস্থ্য খাতে খরচ করা হবে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে গণতান্ত্রিক এ সরকার কাজ করবে। সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা হবে। স্বাস্থ্য সচিব বলেন, ‘দুর্গম চরাঞ্চলসহ স্বাস্থ্য সেবার আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথা অঞ্চল ভেদে সবাইকে সুস্বাস্থ্য নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে।
বড় ধরনের অসংগতি আর স্ববিরোধিতার মধ্যে পড়ে আছে স্বাস্থ্য খাত
সাদিত কবির : বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত স্বাস্থ্য অবকাঠামো আছে, কিন্তু মানসম্পন্ন সেবা দিতে অক্ষম। এ রকম অসংগতি আর স্ববিরোধিতার মধ্যে পড়ে আছে স্বাস্থ্য খাত।

হোসেন জিল্লুর রহমান
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বড় ধরনের পাঁচটি অসংগতি আর স্ববিরোধ আছে। এগুলো হচ্ছে-দেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত স্বাস্থ্য অবকাঠামো আছে, তবে তার উৎপাদনশীলতা কম; স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন কম পাশাপাশি অর্থ ব্যয় করার দক্ষতাও নি¤œ পর্যায়ের; স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে অস্পষ্টতা আছে; সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া মারাত্মভাবে কেন্দ্রীভ‚ত এবং জনবলের নিশ্চয়তা ছাড়াই অবকাঠামো তৈরি হয়। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোর অনেক মিল আছে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ গণমাধ্যমকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দরকার, তার তিন ভাগের এক ভাগ দেয়া হয়। আবার যে পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করা হয়, সেটার পুরো অংশই ব্যয় হয় না। তবে শুধু বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই যে এ খাতের উন্নয়ন হবে, বিষয়টি কিন্তু এমনও নয়। সঠিক পরিকল্পনাটা খুব জরুরি এখানে। পরিকল্পনা না হলে বাজেটের সঠিক ব্যবহার সম্ভব হবে না। সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, গত অর্থবছরে স্বাস্থ্যের বাজেট ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর এক-তৃতীয়াংশ টাকা কেটে নেওয়া হয়। অন্যদিকে এক-তৃতীয়াংশ টাকা মন্ত্রণালয় খরচই করতে পারেনি। বাকি এক-তৃতীয়াংশের অনেক টাকাই অপচয় হয়। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের কাজের দ্বৈততা আছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেনিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি। পরিকল্পনার অভাবে বাজেট বরাদ্দ করা হয় না। বাজেটে যে পরিমাণ বরাদ্দ করা হয় তা কাজে লাগানোর মতো কাঠামোও আমাদের নেই। দেশে বিগত এক বছর জিডিপির ১ শতাংশের কম অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে। পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতার অভাবে এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। এ অর্থটিকে কাজে লাগানোর জন্য পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সামর্থ্য তৈরি করা। বাংলাদেশের সব মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য পরিপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি এবং সেটিকে ধাপে ধাপে বিন্যস্ত করা হোক। স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন, রোগীর পর্যাপ্ত সেবা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনাকাটাসহ নানা ধরনের সংকট থেকেই যাচ্ছে। যেখানে এ খাতের সংস্কার ও উন্নয়নে সামগ্রিকভাবে বাজেট বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা।
কেন আস্থার সংকটে সাধারণ মানুষ?
রিন্টু হাসান : বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সূচকে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি বিস্তার- আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসাও পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী টাইফয়েড টিকাদানে প্রায় ৯৭ শতাংশ শিশু কভারেজ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। তবে এ সাফল্যগুলো অবকাঠামো ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংযুক্ত না হলে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সাম্প্রতিক সময়ে হাম আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো প্রমাণ করে- সাফল্য কেবল সংখ্যা ও প্রতিবেদনে সীমিত থাকলে তা বাস্তব জীবনে প্রাণ বাঁচাতে ব্যর্থ হয়। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো থাকলেও চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধের ঘাটতি প্রকট। আছে অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা। সরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত স¤প্রসারিত হচ্ছে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় বহু মানুষ চিকিৎসা নিলেও সেবা সন্তোষজনক নয়। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বাদে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রতিই ঝুঁকছে মানুষ। কিন্তু সেখানেও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নানা ভোগান্তি, সঠিক রোগ নির্ণয় করতে না পারা, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ভুল রিপোর্টের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। সেই সঙ্গে চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীকে যথেষ্ট সময় দিয়ে না দেখা, দায়িত্বে অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু, স্বাস্থ্যসেবায় অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক মনোভাব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কম। সামর্থ্যবানরা তাই সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশে চিকিৎসা নিতে চলে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতের মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো জবাবদিহির অভাব। চিকিৎসা অবহেলা, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাণিজ্যিক প্রভাব, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব- সব মিলিয়ে মানুষ মনে করে হাসপাতাল মানেই নিরাপত্তা নয়। স¤প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে আমরা যেসব অর্জন করেছি, তা সত্তে¡ও সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের (২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৯। বাংলাদেশের জনসংখ্যা (১৭ কোটি ১০ লাখ) বিবেচনায় প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন দশমিক ৮৩ জন। বাংলাদেশে জনসংখ্যা ও চিকিৎসকের এ অনুপাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। অপরদিকে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার বিপরীতে ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ নার্স থাকা জরুরি, তবে আছে মাত্র ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে ২৮ শতাংশ নার্স কর্মরত রয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে কর্মী সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে হাসপাতালগুলোয় প্রায় অর্ধেক কর্মীই থাকে অনুপস্থিত। দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসক, নার্স এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতির সমস্যা কাটাতে সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলোর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে তারা ঠিকমতো তদারকি করতে পারছে না।
অসংক্রামক রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক,মোকাবেলায় টেকসই অর্থায়নের ঘাটতি
মহোসু : বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও তা মোকাবেলায় টেকসই অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে অসংক্রামক রোগ মোকাবেলা, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সবার জন্য ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস, ২০২৬ উপলক্ষে সোমবার (০৬ এপ্রিল) গেøাবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) এর সহযোগিতায়, গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত “উচ্চ রক্তচাপ মোকাবেলায় টেকসই অর্থায়ন: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত” শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

ওয়েবিনারে জানানো হয়, উচ্চ রক্তচাপের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে। তবে, এ খাতে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ খুবই অপ্রতুল, মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪.২ শতাংশ। ওয়েবিনারে আরও জানানো হয়, সরকার দেশের সকল কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাবে ওষুধের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মোঃ এনামুল হক বলেন, সকল কমিউনিটি ক্লিনিকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রয়োজন। একইসঙ্গে পরিকল্পিত ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশব্যাপী উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বিদেশে চিকিৎসায় বছরে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে
আরিফ হোসেন: স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে চিকিৎসায় প্রতিবছর প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসা নিতে সবচেয়ে বেশি রোগী ইন্ডিয়ায় যান। ইন্ডিয়ার চিকিৎসা ভিসার প্রায় ৫২ শতাংশ বাংলাদেশিদের। ২০২৪ সালে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার বাংলাদেশি রোগী ইন্ডিয়ায় চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ার পরে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অবস্থান। দেশের চিকিৎসায় বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। রোগ নির্ণয় ঠিক হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকে। হঠাৎ বিল বেড়ে যায় ও লুকানো খরচের ভয় থাকে। নকল ওষুধ ও নি¤œমানের সামগ্রীর আশঙ্কা থাকে। দেশের ৩৬টি স্পেশালাইজড হাসপাতালের মধ্যে ঢাকায় ১৯টির অবস্থান ও ঢাকার বাইরে ১৭টি। ঢাকা বিভাগে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ১ হাজার ৮১০টি। আর ৭ বিভাগে রয়েছে ৩ হাজার ৬৫১টি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ, এপ্রিল ০৭, ২০২৬, প্রথম পৃষ্ঠা
চিকিৎসাসেবায় জনগণের আস্থা বাড়াতে এ খাতে দক্ষ জনবলের দরকার। পাশাপাশি গবেষণার দিকেও সরকারি নজর দিতে হবে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নও করতে হবে। এ সবকিছুর ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও অর্থ বরাদ্দ দেয়া জরুরি। দেশে স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সংকট এ খাতের প্রয়োজনীয় জনবল। বিশেষ করে ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান। এসব পদে সরকারের বিপুলসংখ্যক পদ খালি রয়েছে। এসব সংকটের কারণে পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউডি/এজেএস

