বীভৎস, বিকৃত, রোমহর্ষক ঘটনা বাড়ছেই

বীভৎস, বিকৃত, রোমহর্ষক ঘটনা বাড়ছেই

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, আপডেট ১৬:৫৫

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেড়েছে বীভৎস, বিকৃত, রোমহর্ষক খুনের ঘটনা। নিষ্ঠুরভাবে খুনের পাশাপাশি মানুষের প্রতি নির্মম অপরাধপ্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। বেড়েছে পারিবারিক কলহের জেরে খুনের সংখ্যাও। যেমন, শনিবার (০৯ মে) গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বসতঘর থেকে পাঁচজনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গৃহকর্তা পলাতক রয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে মাকে খুন করছে সন্তান, স্ত্রী খুন করছে স্বামীকে, আবার স্বামীর হাতে স্ত্রী, নিষ্পাপ শিশু খুন। স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, সিঁধ কেটে ঘরে প্রবেশ করে মা-মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। এছাড়া চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনাতো ঘটছেই। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা আতঙ্ক, উদ্বেগ। এসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…

সারা দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে খুন

সাদিত কবির : রাজধানীসহ সারা দেশে খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়েছে। এক অদৃশ্য আতঙ্কের ভেতর দিয়ে সময় পার করছে সাধারণ মানুষ। ধর্ষণ, যৌন হেনস্তা, শিশু নির্যাতন, কোথাও মাদ্রাসাছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, কোথাও শিশুর সামনে মাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীকে স্ত্রী কিংবা স্ত্রীকে স্বামী খুন করছে। একের পর এক এসব ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতাই নয়, সমাজের গভীরে জমে থাকা ভয়াবহ অসুস্থতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ের বেশক’টি ঘটনা গোটা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যার মধ্যে সবশেষ গাজীপুরের কাপাসিয়ার ঘটনা সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বসতঘর থেকে পাঁচজনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া পলাতক রয়েছে। শনিবার (০৯ মে) সকালে উপজেলার রাউৎকোনা গ্রাম থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ শাহিনুর আলম। তিনি বলেন, পারিবারিক কলহের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহতরা হলেন-ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন (৩০), মেয়ে মীম (১৫) ও মারিয়া (৮), ছেলে ফরিদ (২) ও শ্যালক রসুল মিয়া (২২)। কাপাসিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) যুবাইর হোসেন জানান, ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালক ফোরকানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের সদর উপজেলায়। তিনি পরিবার নিয়ে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে বছর খানেক ধরে ভাড়া থাকতেন। ওসি শাহিনুর বলেন, শুক্রবার রাতের কোনো একসময় পাঁচজনকে হত্যা করা হয়। শনিবার ভোরে পলাতক স্বামী নিহতের স্বজনদের মোবাইল ফোনে খুনের ঘটনা জানিয়েছেন। এছাড়াও, নারায়ণগঞ্জে শিশু হোসাইন হত্যা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো সমাজ ব্যবস্থাকেই।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় ১১ বছর বয়সী শিশু হোসাইনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারই সমবয়সী ও কিশোরদের একটি দল। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাÐের পেছনে উঠে এসেছে অবিশ্বাস্য এক কারণ-‘জেল খাটতে কেমন লাগে’, সেই কৌতূহল থেকেই তারা পরিকল্পিতভাবে এই নৃশংস অপরাধ সংঘটিত করে। এছাড়াও গত ৩০ এপ্রিল ইতালির লেইজ শহরে পারিবারিক দ্বন্দ্বে বড় ভাইয়ের হাতে খুন হয় নয়ন শেখ নামে এক যুবক। পরবাসে ছোট ভাইকে খুন করে পরিবারের সদস্যদের ভিডিও কলে দেখান হুমায়ুন। এতে তাদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী পশ্চিম সোনারং গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে।

গত ২০ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে লৌহজং নদীর পারে পুঁতে রাখা বস্তাবন্দি এক নারী ও নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনা নিয়ে সমাজমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও ঘৃণা দেখা গেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলার এমন অবনতিতে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, যা অব্যাহত থাকলে জনরোষে রূপ নিতে পারে। তারা বলছেন, সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার কার্যকর কৌশল থাকা জরুরি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মনে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে, যা সামাজিকভাবে অপরাধ প্রবণতাও উসকে দিতে পারে।

গাজীপুরে একই পরিবারের ৫ খুন, নেপথ্যে কী

মহোসু : গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় একই পরিবারের পাঁচজনের গলা কাটা লাশ উদ্ধারের ঘটনাস্থল থেকে গৃহকর্তার খসড়া অভিযোগ ও একটি বটি উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন আলামত ও স্বজনদের ভাষ্য থেকে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, ‘পারিবারিক কলহের’ জেরে গৃহকর্তা ফোরকান এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারেন। শনিবার সকালে উপজেলার রাউৎকোনা গ্রাম থেকে ৫ জনের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দেখা গেছে, তিন সন্তানের মরদেহ ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে ছিল। শারমিনের ভাই রসুলের মরদেহ ছিল বিছানার উপর। আর গহনা-শাড়ি পরিহিত শারমিনের হাত-মুখ বাঁধা লাশ জানালার গ্রিলের সঙ্গে বাঁধা ছিল।

কাপাসিয়া থানার ওসি শাহীনুর আলম বলেন, শুক্রবার রাতের কোনো এক সময়ে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। ‘হত্যাকাণ্ডের পর’ পালিয়ে যাওয়া ফোরকান চাচাতো ভাই আবু মুসা ও শারমিনের ভাই জব্বার আলীকে ফোন করে ঘটনা জানান। স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ দেখতে পান এবং পুলিশকে জানান। তবে তাদের সাথে সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে ফোরকানের নামে একটি খসড়া অভিযোগ পাওয়া গেছে। গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি বরাবর লেখা এ অভিযোগে ফোরকান তার স্ত্রী শারমিন খানম, শশুর, শাশুড়ি, শ্যালকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মারধরের কথা বলেছেন।

স্বজনের আহাজারি

আবেদনে বলা হয়েছে, ফোরকানের স্ত্রীর মাধ্যমে তার শশুর বিভিন্ন সময়ে ১০ লাখ টাকা নিয়ে জমি কেনেন। তাছাড়া স্ত্রীর বিরুদ্ধে এক স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও করা হয়েছে ফোরকানের নামে। এ নিয়ে কথা বলায় গত ৩ মে প্রস্তাবিত আসামিরা বাসায় আটকিয়ে ফোরকানকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে এবং ভয়ভীতি দেখায় বলে খসড়া অভিযোগে বলা হয়েছে। শারমিনের ভাই শামীম বলেন, চাকরি দেওয়ার কথা বলে রসুল মিয়াকে শুক্রবার ফোন করে বাসায় ডেকে নেন ফোরকান। তিনি আরও বলেন, সে মাদকাসক্ত ছিল বলে শুনেছি। তার বাসা থেকে মদের বোতল এবং ইয়াবা সেবনের উপকরণ পাওয়া গেছে। কাপাসিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) যোবায়ের হোসেন বলেন, মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। সন্দেহভাজন ফোরকানকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান শুরু করেছে। কাপাসিয়া থানার ওসি শাহীনুর আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহ বা অন্য যেকোনো ঘটনার জেরে ফোরকান হত্যাকাÐ ঘটিয়ে পালিয়েছেন। তিনি শনিবার ভোরে ফোনে স্বজনদের কাছে ওই হত্যাকাণ্ডের কথা জানান। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি স্বাক্ষরবিহীন অভিযোগ এবং ‘খুনে ব্যবহৃত’ বঁটি উদ্ধার করেছে। কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, কী কারণে এসব হত্যা ঘটেছে তা উদ্ঘাটনে পুলিশ, পিবিআই, ডিবি, সিআইডি একযোগে কাজ শুরু করেছে।

বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, দৌরাত্ম্য থামাবে কে

রিন্টু হাসান : রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম সর্বত্রই কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সীমা অতিক্রম করেছে। বহুমুখী আয়ের উৎসে ভর করে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ কার্যক্রম দিন দিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ছিনতাই, চুরি, খুনসহ যেকোনো অপরাধ ঘটলেই এখন সবার আগে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। রাজধানীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১১৮ কিশোর গ্যাং। এসব গ্রæপ নিয়ন্ত্রণ করে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালীরা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নতুন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে এমন ভয়াবহ তথ্য।

সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ বছরে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে দু’শতাধিক খুন হয়েছে। এ সময়ে অন্য অপরাধ কী পরিমাণে হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। রাজনৈতিক উদ্যোগ, প্রভাব, প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো অপরাধী চক্র গড়ে উঠতে ও টিকে থাকতে পারে না। কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। সম্প্রতি রাজধানীর কিশোর গ্যাংয়ের এলাকাভিত্তিক একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ওই খবরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বয়স সম্পর্ক বলা হয়েছে, তারা কিশোর নয়, তাদের বয়স ১৯-২০ বছরের মধ্যে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সূত্র মতে, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জড়িত। তারাই কিশোর গ্যাংয়ের লালন-পালন ও সুরক্ষা দিচ্ছে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্রও কিশোর গ্যাং গঠনে স্থানীয় প্রভাশালীদের প্রত্যক্ষ ভ‚মিকা রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অধিকাংশই এসেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। অভাব, অনটন, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ইত্যাদি কিশোরদের গ্যাং কালচারে প্রলুব্ধ করছে। সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে তাদের নেটওয়ার্ক। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ইভেন্ট নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন প্রতারণা, এমনকি ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবেও আবির্ভূত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

এদিকে, সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা ও স্বস্তি ফেরাতে কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে রাজধানীতে নজরদারি বাড়িয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এর অংশ হিসেবে মহানগরীতে আরও ১১ হাজার সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ডিএমপি জানিয়েছে, এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে ব্লক রেইড অভিযান, পুলিশি টহল, বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধমূলক উৎস থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা আসায় এই গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে বিপথগামী কিশোর-যুবকরা। তথ্য মতে, কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান আয়ের উৎস চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্য। ফুটপাথের দোকান, কাঁচাবাজার, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পুস্ট্যান্ড, ট্রাক টার্মিনাল, এমনকি নির্মাণাধীন ভবন, সবখানেই তারা ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত টাকা আদায় করছে। অনেক এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপ নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নিয়ে এই অর্থ আদায় করে থাকে। যখনই অন্য কোনো গ্রুপ সেখানে ভাগ বসাতে চেষ্টা করে, তখনই শুরু হয় দ্ব›দ্ব, সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয়ী হামলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, আধিপত্য বিস্তার বা রাজনৈতিক স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তরুণদের গঠনমূলক কাজে উৎসাহিত করতে হবে এবং অপরাধের বলয় থেকে বের করে আনতে হবে। কিশোর অপরাধ দমনে রাজনৈতিক মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।

‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কী ‘জিরো’-তেই আটকে!

আব্দুল্লাহ সিফাত : দেশের মহানগর ও আশপাশের এলাকাগুলোয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মহানগর এবং রেঞ্জের আওতাধীন এলাকাগুলোয় নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা ও এর প্রতিকার চেয়ে করা মামলার সংখ্যা বাড়ছে। প্রকাশ্যে খুন, গুলি, চাপাতি দিয়ে কোপানো এবং ভয় দেখিয়ে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা যেন বেড়েই চলেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের মানুষ। এসব ঘটনায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সরকার বারবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলে আসছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন হচ্ছে না।

বিশ্লেষকগণ বলছেন, দেশে স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধরে রাখতে হলে সবার আগে অপরাধের মূল উৎসগুলো খুঁজে বের করা জরুরি। অপরাধ বৃদ্ধির কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে এর ভিত্তিতে নিতে হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীকে উৎসাহিত করে। অপরাধ দমনে সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত কয়েকদিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা সরকারের সমালোচনা করেও দিচ্ছেন পোস্ট। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কঠোর হচ্ছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকাসহ সারাদেশে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গত কয়েকদিনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও ভাইরাল হওয়া ভিডিওর ফুটেজগুলো দেখে যাদের নাম আসছে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এমনকি কারাগার থেকে জামিনে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীরাদেরও নজরদারিতে আনা হয়েছে। ক্রমাগত হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের কারণে দেশজুড়ে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম না হলে রাষ্ট্র ও সরকারের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকের নিরাপত্তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক সংরক্ষিত এবং নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারের রক্ষাকবচ। অন্য মানুষকে নিরাপদ রাখা ও বাঁচতে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু স¤প্রতি নাগরিকরা যে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্রæত এর সুরহা দরকার এবং যারা এসব করছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার। যদিও মব, সন্ত্রাস, দখল, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাÐ বন্ধের মাধ্যমে সমাজে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অপরাধ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণসহ নানা অপরাধের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে জনরোষের সৃষ্টি হবে। কেননা অর্থনীতি বা অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাদের মতে, সরকারের অগ্রধিকারের তালিকায় শীর্ষে রাখতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। না হলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে সরকারকে।

রহস্যজনক মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে

আশিকুর রহমান : বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুসারে, শুধু গত এপ্রিলে ৫৭ নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন ১৯ জন নারী। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এক বছরে মোট ৬৩২ জন নারী ও কন্যা হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ২১ জনকে এবং রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে আরও ২৩০ জনের। এ বছরের শুরু থেকে এই ধারা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জানুয়ারিতে ৫৫ জন নারী ও কন্যাকে হত্যা করা হয় এবং ২০ জনের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল ৩ জনকে।

ফেব্রুয়ারি মাসে হত্যার শিকার হন ৩২ জন, হত্যার চেষ্টা করা হয় ২ জনকে এবং একই মাসে রহস্যজনক মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭ জন। মার্চ মাসে এই সংখ্যা ছিল ৪৭ জন হত্যা এবং ১৭ জনের রহস্যজনক মৃত্যু। এপ্রিল মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক মাসেই ৫৭ জন নারী ও কন্যা হত্যার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪১ জনের বয়স ১৮ বছরের ওপরে। একই সময়ে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের এবং ২ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এ বছরের প্রথম চার মাসে হত্যার শিকার হয়েছেন ২৬৪ জন নারী। তাদের মধ্যে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ৭৩ জনের। এ ধরনের ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। দেশজুড়ে নারী ও কন্যাদের ওপর এই ধরনের হত্যা এবং রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা

রিন্টু হাসান: পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে সারা দেশে হত্যা মামলার সংখ্যা ছিল তিন হাজার ২৩টি। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৪৪২টিতে। আর ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা পৌঁছে যায় তিন হাজার ৭৮৬টিতে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১০ মে, ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিসংখ্যান দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজধানী ঢাকাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে ৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি এবং মার্চে ২৪টি খুনের ঘটনা ঘটে। এপ্রিল মাসের প্রথম ২৮ দিনেই অন্তত ১৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার বড় অংশই সংঘটিত হয়েছে প্রকাশ্যে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নেপালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading