মুক্তিপণ দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরলেন ১৩ মৌয়াল

মুক্তিপণ দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরলেন ১৩ মৌয়াল

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, আপডেট ১৮:২৫

সুন্দরবনে অপহরণের দুইদিনের মাথায় মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩ মৌয়াল। শনিবার বিকেলে তারা খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে ফিরেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে তারা সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের বানিয়াখালি ফরেস্ট স্টেশন থেকে অনুমতি নিয়ে দুটি নৌকায় করে মধু আহরণে যান। এদিন বিকেলে শিবসা নদী সংলগ্ন কুমড়াখালি খাল থেকে অপহরণের শিকার হন তারা।

মৌয়াল দলটির সরদার আব্দুল গফুর গাজীর দেওয়া তথ্যমতে, সুন্দরবনে ঢোকার পরই ওঁৎ পেতে থাকা বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র সদস্যরা তাদের অপহরণ করে গহীন বনের খালে আটকে রাখে। সেখানে তাদের মারধর করে নগদ ৪২ হাজার টাকা, জামাকাপড় ও মধু আহরণের সরঞ্জামাদি কেড়ে নেয়। এরপর লোকালয়ে থাকা তাদের লোক দিয়ে সবার বাড়িতে খবর পাঠানো হয়– দেড় লাখ টাকা না দিলে কাউকে ছাড়া হবে না। পরে দেনদরবার করে বিকাশের মাধ্যমে ৩৬ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পায় তারা।

আব্দুল গফুর গাজী বলেন, ‘এলাকার মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মধু কাটতি গিয়া এখন খালি হাতে ফিরতি হয়েছে। ডাকাতরা সব কাইড়ে নেছে। এখন নিজেরা খাবো কি, আর মহাজনের দাদন শোধ করবো কি দিয়া?’

মৌয়াল দলের বাকি সদস্যদেরও একই অবস্থা। একদিকে মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের চিন্তা, অন্যদিকে ধারদেনা করে দিতে হয়েছে মুক্তিপণের টাকা। এর ওপর তারা ফিরেছেন খালি হাতে। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। মৌয়ালদের অভিযোগ, দস্যুদলের সবাই আশপাশের এলাকার। লোকালয়ে যারা দস্যুদের হয়ে কাজ করে তারাও পরিচিত মুখ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

মৌয়াল হারুন গাজী বলেন, বনদস্যুরা তাদের আটকে বেধড়ক পিটিয়েছে। এ সময় তারা বলতে থাকে, হাসান মেম্বরের কাছে টাকা না দিয়ে কেন তারা বনে ঢুকেছে? হাসান মেম্বর বনদস্যু দুলাভাই বাহিনীর অস্ত্র, গুলি ও খাবার সরবরাহ করে বলে জানিয়েছেন এ মৌয়াল।

একই তথ্য উল্লেখ করে মৌয়াল খোকন মণ্ডল বলেন, ‘আমরা জানতাম না হাসান মেম্বর দস্যুদলের সঙ্গে জড়িত। এবার ধরা খাওয়ার পরই জানতি পারলাম, দস্যুরা অস্ত্র কেনার জন্যি হাসান মেম্বরের সঙ্গে ৭ লাখ টাকায় চুক্তি করিছে। সেই টাকা তোলার জন্যি আমাগের মতোন বনজীবীকে নির্যাতন করতেছে তারা।’

অপর মৌয়াল পরিমল সরকার বলেন, ‘মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মধু কাটতি বাদায় গেছি। যাবার সময় ডাকাতি ধরলি নির্যাতনের থেইকে রেহাই পাতি নগদ টাকাও নিয়া গেছি সবাই। সেই টাকাও নিছে, আবার নির্যাতন কইরে বাড়ি থেইকেও টাকা নিছে। এখন পরিবার নিয়া খাবো কি, আর ঋণ শোধ করবো কি কইরে? হাসান মেম্বর আমাগের এলাকার লোক হইয়ে এমন কাজ করতি পারলো-এটা ভাবতি কষ্ট লাগে।’

মৌয়ালেরা অভিযোগ করেন, বনদস্যু দুলাভাই বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন আমাদি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল হাসান ওরফে হাসান মেম্বর। তাঁর কাছে টাকা জমা দিয়ে টোকেন নিতে হয়। সেই টোকেন দুলাভাই বাহিনীকে দেখালে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে প্রবেশের অনুমতি মেলে। হাসান মেম্বরের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বানিয়াখালি গ্রামের বাসিন্দা বিপুল মণ্ডল। তিনি দস্যুদলের খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি দস্যুদের লুট করা মধু হাসান মেম্বরের কাছে নিয়ে আসেন। হাসান মেম্বর এই মধু বিক্রির টাকা দস্যুদের বাড়িতে পৌঁছে দেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল হাসান বলেন, ‘এলাকার শাহাদাত কবিরাজ নামের এক ব্যক্তির মেয়ের জামাই আফজাল বনদস্যু দুলাভাই বাহিনীর সদস্য। শাহাদাত কবিরাজের সঙ্গে আমার বিরোধ। এ জন্য সুনাম ক্ষুণ্ন করতে মৌয়ালদের কাছে আমার নাম ব্যবহার করছে আফজাল।’

সুন্দরবনের বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, শনিবার দুটি নৌকায় করে ১৩ জন মৌয়াল সুন্দরবন থেকে ফিরে এসেছেন। তারা বনদস্যুদের কবলে পড়েছিলেন বলে জানতে পেরেছেন। এ ব্যাপারে লিখিত কোনো পাননি।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading