ইরানে হামলা নিয়ে আমেরিকা-ইসরায়েলের নতুন নীল নকশা : ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মাথায়’ কী আছে?
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, আপডেট ১৭:২০
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন
গত মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ইরানে আবারও নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর জন্য সবচেয়ে জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে আমেরিকা ও ইসরায়েল। আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকেই এই হামলা শুরু হতে পারে বলে মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। তবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর সামরিক হামলা পুনরায় শুরু করবেন কিনা, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেননি, তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আইনপ্রণেতাদের বলেছেন যে, পেন্টাগনের কাছে ‘প্রয়োজনে পরিস্থিতি আরও গুরুতর করার পরিকল্পনা রয়েছে।’ প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, শান্তি আলোচনার অচলাবস্থা কাটাতে ট্রাম্প যদি আবারও বোমা হামলার পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেই প্রেক্ষিতে তার শীর্ষ উপদেষ্টারা সামরিক হামলা শুরু করার জন্য একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অবলম্বনে বিশ্লেষণ…
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা, খসড়া পরিকল্পনা প্রস্তুত
আরাফাত রহমান : ইরানে আবারও সামরিক হামলা চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন যে, পেন্টাগনের কাছে ‘প্রয়োজনে পরিস্থিতি আরও বাড়িয়ে তোলার পরিকল্পনা’ রয়েছে। সামরিক অভিযানের বিষয়ে কথা বলতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের ওপর পুনরায় হামলা শুরু করার জন্য আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে-যা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি।
গত শুক্রবার চীন সফর থেকে আমেরিকায় ফিরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশে ফিরেই তাকে ইরানের বিষয়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শান্তি আলোচনার অচলাবস্থা কাটাতে ট্রাম্প যদি আবারও বোমা হামলার পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেই প্রেক্ষিতে তার শীর্ষ উপদেষ্টারা সামরিক হামলা শুরু করার জন্য একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছেন। উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প তার পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকর্তারা একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যার ফলে ইরান ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দিতে বাধ্য হবে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প নিজের বিজয় ঘোষণা করতে পারবেন এবং সংশয়ী মার্কিন ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে, ইরানে এই ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান সফল হয়েছে।
এই যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পকে দ্বিমুখী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদিও এটি তার জন্য রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে বিষয়টি পার করে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্গ্রীব বলে মনে হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখনো সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। তিনি প্রায়ই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বলেছিলেন, ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। গত মাসে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। পেন্টাগন এখন পরিকল্পনা করছে যে, আগামী দিনগুলোতে নতুন কোনো নামে হলেও এই অভিযান আবারও শুরু হতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আইনপ্রণেতাদের বলেন, প্রয়োজন হলে যুদ্ধ আরও তীব্র করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। হেগসেথ আরও বলেন, সবকিছু গুটিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মোতায়েন অতিরিক্ত ৫০ হাজারের বেশি সেনাকে আবার স্বাভাবিক দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প আবার সামরিক হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নিলে ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আরও জোরালো বোমা হামলা চালানো হবে। কর্মকর্তারা বলেন, অন্য একটি বিকল্প হতে পারে, মাটির গভীরে লুকিয়ে রাখা পারমাণবিক উপাদানগুলো ধ্বংস করতে স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সক (বিশেষ অভিযান চালাতে দক্ষ বাহিনী) মাটিতে নামানো। কর্মকর্তারা বলেন, ট্রাম্পকে এই বিকল্প দেওয়ার উদ্দেশ্যেই গত মার্চে বিশেষ অভিযানে দক্ষ বাহিনীর কয়েক শ সদস্য মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছান।
শান্তির প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয়, জয় আমাদেরই হবে: ট্রাম্প
সাদিত কবির : গত শুক্রবার বেইজিং ছাড়ার পরপরই এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ইরানের সর্বশেষ শান্তির প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, আমি এটি দেখেছি, আর প্রথম বাক্যটিই যদি আমার পছন্দ না হয়, তবে আমি তা সরাসরি ফেলে দিই। ট্রাম্প জানান, তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরানের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। উল্লেখ্য, চীন তেহরানের একটি কৌশলগত অংশীদার এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে ট্রাম্প বলেন যে, তিনি শি জিনপিংকে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বলেননি। তাদের আলোচনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনও জানা যায়নি। চীন সফরের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেছিলেন, তারা হয় একটি চুক্তিতে আসবে, না হয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং, যেভাবেই হোক, জয় আমাদেরই হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
তবে সামরিক কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে জয়লাভ বেশ কঠিন হতে পারে। তারে বলছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র, আইআরজিসির গোলাবারুদ ডিপো, অন্যান্য সামরিক অবকাঠামোসহ নির্ধারিত অন্যান্য নিশানায় সফলভাবে আঘাত হানতে পেরেছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরান তাদের বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্রকেন্দ্র, উৎক্ষেপণ যন্ত্র ও ভ‚গর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। চীন সফর শেষে ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, তিনি ও শি দীর্ঘ সময় ধরে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি আবার সচল করার প্রতি তাদের উভয়েরই অভিন্ন আগ্রহ রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা বেইজিংকে তেহরানের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনার অচলাবস্থা কাটাতে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। ট্রাম্প চীন ছাড়ার পর হোয়াইট হাউস থেকে বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে খুব সামান্য তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, ইরান বিষয়ে তিনি কোনো ধরনের ‘অনুগ্রহ’ চাইছেন না। ট্রাম্প চীনে অবস্থান করার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-ও ইরান যুদ্ধ বিষয়ে চীনের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেননি। ওয়াং ই বলেন, চীন পারমাণবিক ইস্যুসহ আমেরিকা ও ইরানকে তাদের মতপার্থক্য ও বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করে এবং যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার ভিত্তিতে দ্রæত হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার পক্ষে সমর্থন জানায়।
কী হতে পারে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ?
রিন্টু হাসান : মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প যদি আবারও সামরিক হামলা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আরও জোরালো ও আগ্রাসী বোমা হামলা চালানো। কর্মকর্তারা আরও জানান, অপর একটি বিকল্প হলো-ভ‚গর্ভের গভীরে লুকিয়ে রাখা পারমাণবিক উপাদান ধ্বংস করতে মাটিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী দল (স্পেশাল অপারেশনস ট্রæপস) নামানো। ট্রাম্পকে এই বিকল্প সুবিধা দেওয়ার জন্যই গত মার্চ মাসে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকশ স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স পাঠানো হয়েছিল। বিশেষায়িত পদাতিক সেনা হিসেবে ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযানের জন্য হাজার হাজার সহায়ক সেনার প্রয়োজন হবে, যারা সম্ভবত একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করবে এবং ইরানি সেনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন,
এই বিকল্পে বিপুল পরিমাণ প্রাণহানির বড় ঝুঁকি রয়েছে। ইরানের ওপর নতুন করে যেকোনো হামলা সম্ভবত ঠিক সেখান থেকেই শুরু হবে, যেখানে গত ৭ এপ্রিল ইরান ও আমেরিকার মধ্যে শেষ মুহূর্তের যুদ্ধবিরতির আগে লড়াই থেমেছিল। সেই চুক্তির আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে না দিলে তিনি ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। ইরান সরকার তেল ট্যাংকারের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে দেশটির প্রতিটি সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র সুশৃঙ্খলভাবে ধ্বংস করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক দিন ধরে নির্দেশ দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, যেসব নিশানা ঠিক করা হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অভিযানের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। তবে যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারকে বাধ্য করার উপায় হিসেবে বেসামরিক অবকাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা বেআইনি। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক নেতারা বলছেন, আমেরিকা এই মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতির সময়ে এ অঞ্চলে তাদের যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানগুলোকে আবার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করার কাজ করেছে।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই সপ্তাহে সিনেটের প্রতিরক্ষা উপকমিটিকে বলেছেন, সামরিক কর্মকর্তারা আমাদের বেসামরিক নেতাদের জন্য বেশ কিছু বিকল্প প্রস্তুত করে রেখেছেন। তবে ট্রাম্প কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন, তা প্রকাশ করতে ড্যান কেইন অস্বীকৃতি জানান। গত ৫ মে পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে জেনারেল কেইন বলেন, নির্দেশ পাওয়ামাত্রই ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে ৫০ হাজারের বেশি সেনা, ২টি বিমানবাহী রণতরি, নৌবাহিনীর এক ডজনের বেশি ডেস্ট্রয়ার ও বহু যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রয়েছে। কোনো শত্রæরই আমাদের বর্তমান সংযমকে দুর্বলতা ভাবা ঠিক হবে না। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে জয়লাভ বেশ কঠিন হতে পারে। তারা বলছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র, আইআরজিসির গোলাবারুদ ডিপো, অন্যান্য সামরিক অবকাঠামোসহ নির্ধারিত অন্যান্য নিশানায় সফলভাবে আঘাত হানতে পেরেছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরান তাদের বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্রকেন্দ্র, উৎক্ষেপণ যন্ত্র ও ভ‚গর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে প্রস্তুত ইরান: গালিবাফ
আশিকুর রহমান : ইরানের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই বলেছেন, তারাও যুদ্ধাবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্ট লিখেছেন, যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত। ভুল কৌশল ও ভুল সিদ্ধান্ত সব সময় ভুল ফলাফল বয়ে আনে। পুরো বিশ্ব ইতিমধ্যেই তা বুঝতে পেরেছে। আমরা সব ধরনের বিকল্পের জন্য প্রস্তুত; তারা বিস্মিত হবে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ
এদিকে, আমেরিকার ওপর তেহরানের ‘কোনো আস্থা নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন চুক্তির বিষয়ে আন্তরিক হলে তবেই কেবল তেহরান তাদের সঙ্গে বসতে আগ্রহী। ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিতে ইন্ডিয়া সফর করছেন আরাগচি। নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। আরাগচি বলেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ‘যুদ্ধে লিপ্ত’ নয়, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে এ জন্য ইরানের নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের পরিস্থিতি এখন ‘খুবই জটিল’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি লিখেছেন, তিনি ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার রক্ষক হিসেবে ইরান সব সময় তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করবে।
গত ফেব্রæয়ারিতে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়। এরপর ইরান হরমুজ প্রণালিতে প্রায় সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি তেল-গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়। ওয়াশিংটন ও তেহরান গত মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে দুই দেশ হিমশিম খাচ্ছে। গত সপ্তাহে উভয় পক্ষই একে অপরের সর্বশেষ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। এর পর থেকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা এই আলোচনা স্থগিত রয়েছে। আরাগচি বলেন, আমেরিকার ‘সাংঘর্ষিক বার্তার’ কারণে মার্কিনদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রক্রিয়াটি ব্যর্থ হয়নি, তবে তা নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ক‚টনৈতিক সমাধানের সুযোগ দিতে ইরান বর্তমান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে প্রয়োজনে আবারও যুদ্ধে ফিরতে তেহরান প্রস্তুত বলে জানান আরাগচি। দুই পক্ষের আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ। বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার বিষয়ে তেহরানের অবস্থান জানতে চাইলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সহায়তা করতে সক্ষম যেকোনো দেশের উদ্যোগকেই মূল্যায়ন করে ইরান। আরাগচি বলেন, চীনের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। আমরা কৌশলগত অংশীদার। আমরা জানি, চীনাদের উদ্দেশ্য ভালো। তাই ক‚টনীতিতে সহায়তা করতে তারা যা করবে, সেটিকেই আমরা স্বাগত জানাব। আরাগচি আরও বলেন, আমরা আশা করি, আলোচনার অগ্রগতির মাধ্যমে একটি ভালো সমাধানে পৌঁছাতে পারব। এতে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি নিরাপদ হবে এবং আমরা সেখানে দ্রæত নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করতে পারব।
হরমুজ প্রণালিতে ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্রকেন্দ্র আবার সচল করেছে ইরান
মহোসু : নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি বরাবর তাদের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিরই কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে, যা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেল ট্যাংকার চলাচলের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রায় ৫ হাজার মেরিন সেনা ও সেনাবাহিনীর অভিজাত ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রæপার (ছত্রীসেনা) নির্দেশনার অপেক্ষায় এই অঞ্চলে রয়েছেন। সেনা কর্মকর্তারা বলছেন, এই অভিযান অনুমোদন পেলে ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে ইরানের পারমাণবিক উপাদানের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টায় এবং সেখানে নিয়োজিত বিশেষ বাহিনীর সুরক্ষায় একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করতে এই সেনাদের ব্যবহার করা যেতে পারে। কর্মকর্তারা আরও বলেন, ইরানি তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ দখলের চেষ্টায়ও এই সেনাদের ব্যবহার করা যেতে পারে। অবশ্য সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভ‚মিতে আরও বেশি সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হবে।
ইরানে যৌথ সামরিক পদক্ষেপের চেষ্টা করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত!
আরিফ হোসেন : উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার জবাবে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সৌদি আরব ও কাতারকে রাজি করাতে চেষ্টা করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। তবে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রæয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ আগ্রাসন চালানোর পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার ফোনে কথা বলেন। আমেরিকা ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৭ মে ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য নেতা ইরানের ওপর সমন্বিতভাবে হামলা চালানোর বিষয়ে মোহাম্মদ বিন জায়েদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কীভাবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দুই প্রতিদ্ব›দ্বী দেশের এক হওয়ার কথা ছিল। এখন জানা যাচ্ছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয় দেশই ইরানের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছিল। তবে তারা তা করেছিল যার যার মতো আলাদাভাবে। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের হামলাগুলো ছিল নিয়ন্ত্রিত এবং দেশটি দ্রুতই মিত্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার দিকে মনোযোগ দেয়।
ইউডি/এজেএস

