হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে বিপুল অর্থ : অনলাইন জুয়ার ভয়ংকর ফাঁদ

হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে বিপুল অর্থ : অনলাইন জুয়ার ভয়ংকর ফাঁদ

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার । ১৮ মে, ২০২৬ । আপডেট ১৬:২০

অনলাইনে জুয়ার মহামারি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ব্যাধি নয়, এটি ধীরে ধীরে একটি নীরব জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন অ্যাপ তৈরি করে লোভনীয় অফার দিয়ে তরুণদের জুয়ায় আকৃষ্ট করছে। হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। সরকারের তরফে যখন বিগত আমলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার ও অর্থ পাচার বন্ধে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে, তখন পুলিশ বলছে-খুব সহজেই দেশ থেকে টাকা পাচার করতে পারছে অনলাইনে জুয়া ও প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসা দেশি-বিদেশি চক্রগুলো। বাংলাদেশের মতো দেশে অনলাইন জুয়া আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে সামাজিক বাস্তবতার কারণে। বেকারত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, দ্রুত বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন; সব মিলিয়ে তরুণ সমাজ মানসিকভাবে দুর্বল এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। অনলাইন জুয়ার ভয়ংকর ফাঁদ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…

সদস্য টানতে অবলম্বন করা হচ্ছে নানা কৌশল

মো. আসাদুজ্জামান : বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষত কোভিড-পরবর্তী সময়ে যখন অনেক তরুণ বেকার হয়ে পড়ে, তখন বিনোদনের ছলে শুরু হয় এই অনলাইন বাজি খেলা। শুরুটা হয় ছোট পরিসরে ‘মজা করে দেখি’, ‘শুধু একশ টাকায় শুরু’-এরকম ভাবনায়। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি পরিণত হয় এক গভীর আসক্তিতে, যা থেকে বেরিয়ে আসা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় মধ্যবয়সী হতে শুরু করে যুবসমাজ অবধি এমনকি স্কুলশিক্ষার্থীরাও অনলাইন জুয়ার ভয়ানক ফাঁদে পা দিয়াছে।

ভয়াল এ থাবা থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মসহ সব-বয়সীদের রক্ষা করতে বারবার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা। বন্ধ করে দেওয়ার পরও কোনো না কোনো না কোনো ভাবে ফের বিভিন্ন জুয়া ও বাজির অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম উন্মুক্ত হচ্ছে অনলাইনে। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোভনীয় অফারের নানা ভিডিও এবং বুস্ট করা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অধিকাংশ জুয়া বা বেটিং সাইটগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। এসব সাইটে বুঝে না বুঝে একটি মাত্র ক্লিকে অ্যাপস কিংবা ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে শুরুতে সদস্য টানতে অবলম্বন করা হচ্ছে নানা কৌশল।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে

অল্প টাকায় লাখপতি হওয়া বা দ্বিগুণ মুনাফার লোভে অন্ধকার এ জগতে পা বাড়াচ্ছে মানুষ। একসময় লোভে পড়ে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করেন তারা। তখনই বেরিয়ে আসে আসল রূপ। মোটা অঙ্কের টাকা মুহূর্তেই হারিয়ে যায় জুয়ার বোর্ডে। লোভ আর নেশায় বুঁদ হওয়ার পরপরই হঠাৎ লাপাত্তা হয়ে যায় এসব নামসর্বস্ব ওয়েবসাইট। শুরু হয় আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি। ফুটবল বা ক্রিকেটের ম্যাচে বাজি ধরা, র‌্যান্ডম নাম্বার গেম, অনলাইন কুইজ সবই এখন টাকার খেলা। ‘এক ক্লিকে আয়’ বা ‘১০০ টাকা বিনিয়োগে ১,০০০ টাকা লাভ’ এই মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে অসংখ্য তরুণ আর্থিক ও মানসিকভাবে নিঃস্ব হচ্ছে। বিশ্লেষকগণ বলছেন, অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় ভয়াবহতা হলো এটি অদৃশ্য আসক্তি। মাদক বা সিগারেটের মতো শারীরিকভাবে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু মানসিকভাবে এটি আরও ভয়ংকর। শুরুতে মনে হয় ‘চেষ্টা করলে ছাড়তে পারব’, কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, প্রতিবার হারের পর পরবর্তী খেলায় জেতার আশায় টাকা ঢালা চলতেই থাকে।

এতে শিক্ষাজীবন ভেঙে যায়, পরিবারে অশান্তি দেখা দেয়, এমনকি আত্মহননের ঘটনাও ঘটছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনলাইন জুয়ার বিস্তারে একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। দেশি-বিদেশি সার্ভার, ভুয়া ওয়েবসাইট, বেনামী লেনদেন; সবকিছু মিলিয়ে এটি এখন একটি সংগঠিত অপরাধে পরিণত হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে খুব সহজেই টাকা আদান-প্রদান হচ্ছে। অনেক সময় সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারে না, তারা যে অ্যাপে টাকা দিচ্ছে, সেটি আসলে কোন দেশের, কারা চালাচ্ছে, বা সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে এই চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এক চক্রের ৮ জন গ্রেপ্তার, বেরিয়ে এলো ভয়ঙ্কর তথ্য

আশিকুর রহমান : অনলাইন জুয়ার সাইট পরিচালনার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পুলিশের এ ইউনিট বলছে, গত ছয় মাস ধরে এই চক্রটি অনলাইনে জুয়ার সাইট চালিয়ে দিনপ্রতি প্রায় ২ কোটি টাকা আয় করত; যার বড় অংশ হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হত। গ্রেপ্তাররা হলেন-আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ, সজীব চক্রবর্তী, আশরাফুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, তৈয়ব খান, সৌমিক সাহা, মো. কামরুজ্জামান ও আব্দুর রহমান।

মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

রবিবার (১৭ মে) বিকেলে ঢাকার মালীবাগে সিআইডি সদরদপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, জুয়ার সাইটগুলোতে অংশ নেওয়া লোকজন মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশ, রকেট, নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেট ব্যবহার করে লেনদেন করে আসছিল। পরে সেসব অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হত। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার নিয়মিত নজরদারির সময় অনলাইন জুয়ার সাইট পরিচালনা করতে দেখে পল্টন থানায় একটি মামলা করে। এর প্রেক্ষিতে গত ৬ মে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জে অভিযান চালিয়ে প্রথমে চক্রের আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ, সঞ্জীব চক্রবর্তী, আশরাফুল ইসলাম ও জসীম উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত শনিবার নরসিংদীর পলাশ এবং ঢাকার ধানমন্ডি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় তৈয়ব খান, সৌমিক সাহা, কামরুজ্জামান ও আব্দুর রহমানকে। অভিযানের সময় গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করার তথ্যও তুলে ধরেন সিআইডি প্রধান। তিনি বলেন, গ্রেপ্তাররা জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডি কার্যক্রমের সঙ্গে ‘সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা’ স্বীকার করেছেন। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সিআইডি ও বিএফআইইউ আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো ওয়ালেট শনাক্তের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে এই চক্রের কার্যক্রমের সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও সিআইডির ভাষ্য।

দেশি-বিদেশি চক্রগুলো কীভাবে ‘থাবা’ দিচ্ছে?

মহোসু : সরকারের তরফে যখন বিগত আমলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার ও অর্থ পাচার বন্ধে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে, তখন পুলিশ বলছে-খুব সহজেই দেশ থেকে টাকা পাচার করতে পারছে অনলাইনে জুয়া ও প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসা দেশি-বিদেশি চক্রগুলো। সম্প্রতি অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা ও অবৈধ ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন চক্রের সঙ্গে যুক্ততার অভিযোগে ছয় চীনা নাগরিকসহ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তারের পর এ ভাষ্য এসেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তরফে। গত বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশিদের প্রলুদ্ধ করা ‘সহজ হওয়ায়’ এ ধরনের চক্রগুলো এখানে বেশি সংখ্যায় ফাঁদ পাতছে। আর বিকাশ ও নগদের মত মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া টাকা তারা তাৎক্ষণিকভাবেই বিদেশে পাচার করে ফেলতে পারছে। এসব প্রতিরোধে ডিবির তরফে আইন প্রণেতাদের সঙ্গে কথা বলা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বুধবার রাজধানীর উত্তরা ও তুরাগ এলাকা থেকে ছয় চীনা নাগরিকসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নিয়মিত সাইবার নজরদারিতে ফেইসবুক, ইউটিউব, টেলিগ্রাম গ্রæপে এবং বিভিন্ন ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন, ডিপোজিট বোনাসের প্রলোভন এবং বিকাশ বা নগদ ব্যবহার করে অবৈধ লেনদেনের তথ্য শনাক্ত হয়। এসব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বল্প সময়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছিল। এমন তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর ও তুরাগ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে তিনটি ৬৪-পোর্ট বিশিষ্ট, একটি ২৫৬ পোর্ট বিশিষ্ট এবং একটি ৮ পোর্ট বিশিষ্ট জিএসএম সিম মডিউল বা জিএসএম গেটওয়ে (ভিওআইপি গেটওয়ে), বিভিন্ন অপারেটরের প্রায় ২৮০টি সিম কার্ড, একাধিক ল্যাপটপ এবং স্মার্টফোন জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গ্রেপ্তাররা সংঘবদ্ধভাবে অনলাইন জুয়া, প্রতারণা, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন এবং অর্থপাচার চক্রের সদস্য। তারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্যের নামে নিবন্ধিত এমএফএস এজেন্ট সিম সংগ্রহ করে সেগুলো জিএসএম গেটওয়ে ডিভাইসে ব্যবহার করে একসঙ্গে শতাধিক সিম সক্রিয় রাখত। ডিবি বলছে, এসব সিম ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ার অর্থ, প্রতারণার টাকা এবং অবৈধ লেনদেন পরিচালনা করা হতো। চক্রটি নিজস্ব জুয়ার পোর্টাল পরিচালনার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা বিদেশে বিশেষ করে চীনে পাচার করছিল।

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল বলেন, বিকাশ বা নগদ এর মাধ্যমে টাকাটা তাদের কাছে আসছে এবং তাৎক্ষণিকভাবেই সেটা তারা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। এটা আমাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার ‘সহজ হয়ে গেছে’ মন্তব্য করে ডিবির প্রধান বলেন, আমাদের এখান থেকে যে এই টাকাটা ট্রান্সফার…এই বিভিন্ন ওয়েতে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকাটা ট্রান্সফার… এটা মনে হয় একটু ইজি হয়ে গেছে। আমরা এগুলো নিয়ে যারা আইনপ্রণেতা আছে, তাদের সঙ্গে কথা বলব। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত চীনারা খুব সহজেই বাংলাদেশিদের তাদের ফাঁদে ফেলতে পারছে এবং এই কারণেই এ ধরনের একাধিক চক্র এখানে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রযুক্তি দিক দিয়ে চীনারা অনেক উন্নত। আর আমাদের বাঙালিরা…আমি যেটা বলব যে বিভিন্ন অ্যাডের মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রলুব্ধ করতেছে।

প্রতারণার অভিযোগ বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ

রিন্টু হাসান : বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে অনলাইন জুয়া, বেটিং ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগ বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। ২০২৪ সালে দেশের সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি, যার ৬৫ শতাংশ তরুণ (১৮-৩০ বছর বয়সি)। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিয়মিতভাবে বিদেশি বেটিং সাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করছে। বিটিআরসির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ৬০০টির বেশি অনলাইন জুয়া ও বেটিং ওয়েবসাইট বন্ধ করা হলেও প্রতিদিন নতুন সাইট চালু হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা এসব প্ল্যাটফর্মে যাচ্ছে, যা মূলত তরুণ ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট থেকে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন তরুণের মধ্যে ৩ জন অন্তত একবার অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক স্বীকার করেছে, এটি তাদের পড়াশোনা ও পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবণতা এভাবে চলতে থাকলে আগামী পাঁচ বছরে তরুণ জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা ১৫-২০ শতাংশ কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্বব্যাপী অনলাইন জুয়ার বাজার এখন প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। মোবাইল ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এই খাত দ্রæত স¤প্রসারিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ ইতিমধ্যে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে, যেখানে অবৈধ বেটিংয়ের জন্য জরিমানা ও কারাদÐের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও সুনির্দিষ্ট আইন নেই, ফলে তরুণরা সহজেই বিদেশি ওয়েবসাইট ও অ্যাপের ফাঁদে আটকা পড়ছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়তই জুয়ার সাইটগুলো বন্ধ করি। এক্ষেত্রে আমরা নিরাপত্তা বাহিনী ও সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তারা আমাদের কাছে যে তালিকাগুলো পাঠায় সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হয়। আমরা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও বৈঠক করেছি। আমরা চেষ্টা করছি, টাকার ফ্লো বন্ধ করার জন্য। এক্ষেত্রে একটা সমস্যা হচ্ছে, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলো এনআইডির সঙ্গে মোবাইল নম্বরের মিল আছে কি না সেটা দেখতে পারে না। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসিকে যুক্ত করার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা হলে টাকার ফ্লোটা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কেউ চাইলেই অনলাইন জুয়ায় বিনিয়োগ করতে পারবে না। স¤প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে মাদক ও অনলাইন জুয়া থেকে যুবসমাজকে রক্ষার আহŸান জানিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো অনলাইন জুয়া প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়।

সাইবার মনিটরিং জোরদার, ১১৬ ওয়েবসাইট শনাক্ত

কিফায়েত সুস্মিত : অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ১১৬টি ওয়েবসাইট শনাক্ত করে সেগুলো বন্ধে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) তালিকা পাঠিছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডি’র অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে নিয়মিত সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তিনি বলেন, গত ১ মে থেকে ১৭ মে পর্যন্ত পরিচালিত সাইবার পেট্রোলিংয়ে জুয়ার সঙ্গে জড়িত ওয়েবসাইট শনাক্ত করে সেগুলো ডাউন করার জন্য বিটিআরসিতে ১১৬টি ওয়েবসাইটের তথ্য দিয়েছে সিআইডি। অনলাইন জুয়া ও সংশ্লিষ্ট অবৈধ আর্থিক কার্যক্রম প্রতিরোধে সিআইডির এ ধরনের সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম নিয়মিত পরিচারিত হচ্ছে। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটন, অজ্ঞাত অপর সদস্যদের শনাক্তকরণ ও অন্যান্য আইনানুগ প্রক্রিয়ার স্বার্থে সিআইডির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

কী ধরণের শাস্তির বিধান রয়েছে আইনে

আরিফ হোসেন : অনলাইন জুয়া, জালিয়াতি ও প্রতারণার ক্ষেত্রে অপরাধী ব্যক্তির দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সদ্য জারি হওয়া ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’-এ এ ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী যদি কোনও ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা অন্য কোনও সংস্থা সাইবার স্পেসে জুয়া খেলার নিমিত্ত কোনও পোর্টাল বা অ্যাপস বা ডিভাইস তৈরি করেন বা পরিচালনা করেন বা জুয়া খেলায় অংশগ্রহণ করেন বা খেলায় সহায়তা বা উৎসাহ প্রদান করেন বা উৎসাহ প্রদানের জন্য বিজ্ঞাপনে, অনলাইনে, ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অংশগ্রহণ এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রচার বা বিজ্ঞাপিত করেন তাহলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’-এর ২০ ধারা অনুযায়ী বর্ণিত অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৮ মে, ২০২৬ । প্রথ পৃষ্ঠা

এছাড়া অনলাইন জুয়া বন্ধে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া জুয়া খেলায় সহায়তা বা উৎসাহ প্রদান বা উৎসাহ প্রদানের জন্য বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রচার বা বিজ্ঞাপিত করা থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। অপরাধ দমন ও সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অনলাইন জুয়ার সকল গেটওয়ে, অ্যাপ্লিকেশন, লিংক, ওয়েবসাইট এবং বিজ্ঞাপন জনস্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ, ব্লক বা অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অবহিত করা হচ্ছে।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading