যেভাবে ভবিষ্যত যুদ্ধের রূপরেখাই বদলে দিয়েছে ইরান

যেভাবে ভবিষ্যত যুদ্ধের রূপরেখাই বদলে দিয়েছে ইরান

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, আপডেট ০৯:২০

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন আর কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রূপ নিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার নতুন কৌশলে। হরমুজ প্রণালি তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফাইবার-অপটিক কেবিলের ওপর ইরানের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত আধুনিক যুদ্ধকৌশলের এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০,০০০ গিগাবাইট ডেটা আদান-প্রদান করা এই সাবমেরিন কেবিলগুলো বৈশ্বিক ইন্টারনেট যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ধমনী।

আন্তর্জাতিক মহলে এখন বড় প্রশ্ন, ইরান আইনিভাবে এই শুল্ক আদায় করতে পারে কি না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনি অধিকারের চেয়ে এখানে মূল বিষয় হলো ক্ষমতা এবং সদিচ্ছা। ঠিক যেভাবে ৪৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে থার্মোপিলির যুদ্ধে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে গ্রীক বীর লিওনিডাস মাত্র ৩০০ সৈন্য নিয়ে ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়েছিলেন, ইরানও আজ ঠিক একইভাবে তার ভৌগোলিক অবস্থানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রবাহ জ্বালানি এবং ডিজিটাল ডেটা একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে তেহরান। একদিকে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ সংকুচিত করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি করা, অন্যদিকে বৈশ্বিক ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত করে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া। এই দুইয়ের সমন্বয়ে ইরান ‘স্ট্রাকচারাল লেভারেজ ওয়ারফেয়ার’ বা কাঠামোগত প্রভাব বিস্তারের যুদ্ধের এক নতুন ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছে।

এই বহুমাত্রিক কৌশল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট কেবল কেটে দেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত করার অর্থ হলো বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আর্থিক লেনদেনে ধস নামা, যা মুহূর্তের মধ্যে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। সামরিকভাবে শক্তিশালী কোনো দেশকে কীভাবে একটি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশ কাবু করতে পারে, ইরান যেন তারই এক নতুন ব্যাকরণ লিখে চলেছে। আর এই মডেল উত্তর কোরিয়া বা চীনের মতো দেশগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

যুদ্ধের শুরুতে আলোচনা ছিল ইরানের সস্তা ও গণহারে উৎপাদিত ‘শাহেদ’ আত্মঘাতী ড্রোন নিয়ে। বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, তেহরান হয়তো আমেরিকার দামি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ শেষ করার জন্য এই কৌশল নিয়েছে। কিন্তু যখনই ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করল, তখনই যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে গেল। ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়, হঠাৎ করেই পুরো যুদ্ধটি তেল এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল।

মাইন, ড্রোন এবং দ্রুতগামী নৌকার সমন্বয়ে গঠিত ত্রিমাত্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান কোনো বড় সামরিক সংঘাত ছাড়াই হরমুজ প্রণালীর নৌপথ প্রায় অচল করে দিয়েছে। একটি জাহাজও না ডুবিয়ে কেবল বিমা খরচ এবং চার্টার রেট বাড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়িয়ে দিয়েছে তারা। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজের বিমা প্রিমিয়াম ৩০০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে এবং ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

ভৌগোলিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালী মাত্র ২১ কিলোমিটার প্রশস্ত, যা দুটি শিপিং লেনের জন্য কোনোমতে যথেষ্ট। এই সংকীর্ণ পথের পাশে ইরানের কুশম (Qeshm) দ্বীপে মোতায়েন করা অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তেহরানকে এই অঞ্চলের ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছে। বিশ্বের ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ গ্যাস এই পথেই পরিবাহিত হয়। ফলে এই চোকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ নৌপথটি ইরানের জন্য আমেরিকার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

অথচ যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে নেমেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। ইরানের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করাই ছিল ওয়াশিংটনের লক্ষ্য। মার্কিন প্রশাসন ভেবেছিল এটি হবে একটি দ্রুত ও সফল সামরিক অভিযান। কিন্তু বাস্তবতার মারপ্যাঁচে ওয়াশিংটন আজ এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মুখোমুখি। তেলের দাম বাড়ার কারণে আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদেরই অতিরিক্ত ২৮ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি বিল গুনতে হচ্ছে।

আমেরিকা হয়তো সামরিক দিক থেকে নিজেদের জয়ী দাবি করতে পারে, কিন্তু ইরানকে পারমাণবিক বোমা থেকে দূরে রাখতে গিয়ে তারা তেহরানকে আরও এক মারাত্মক অস্ত্রের সন্ধান দিয়ে দিল। আর সেটি হলো ইরানের নিজস্ব ‘ভূগোল’। বিশ্ব হয়তো এখন হরমুজের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করবে কিন্তু নতুন পাইপলাইন তৈরি বা সাবমেরিন কেবিলের পথ পরিবর্তন করতে বছরের পর বছর সময় এবং কোটি কোটি ডলারের প্রয়োজন। আর ততদিন পর্যন্ত এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বকে চাপে রাখার পূর্ণ ক্ষমতা তেহরানের হাতেই থাকছে।

সূত্র: এনডিটিভি

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading