বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা : নতুন নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াবে পুঁজিবাজার
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৫:৫৫
বিএসইসি’র দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন চেয়ারম্যান মাসুদ খান ও তিন কমিশনার
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক সেমিনারে জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে এবং সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিশন গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। আর ওইদিনই বিএসইসি-তে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় সরকার। পাশাপাশি তিনজন কমিশনারও নিয়োগ দেওয়া হয়। চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা মাসুদ খান। একই সঙ্গে কমিশনের কমিশনার হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্সের পরিচালক তানভীর হাবিব রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব ও ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাফিজ আল তারিকের নিয়োগের প্রজ্ঞাপনও জারি হয়। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন …
২০১১ থেকে ২০২৬ সাল নেতৃত্বে তিন দফায় বদল: এবার কী আস্থা ফিরবে?
মো. আসাদুজ্জামান : ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের মেয়াদকালে বড় ধসের পর ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিএসইসি’র চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন এম খাইরুল হোসেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর্যন্ত বিএসইসি’র চেয়ারম্যান ছিলেন শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। আর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। এই ১৬ বছরে বিএসইসির নেতৃত্বে তিন দফায় বদল হলেও বাজারে বড় কোনো বদল আসেনি। আস্থাহীনতায় বাজারবিমুখ হন বিনিয়োগকারীরা। এবার নতুন নেতৃত্বে বড় আশা বিনিয়োগকারীদের। পুঁজিবাজারকে ‘নতুনভাবে সাজানোর’ অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে হিসাববিদ ও ঝানু করপোরেট পেশাদার মাসুদ খানকে বেছে নিল বিএনপি সরকার। আর এই যাত্রায় কমিশনার হিসেবে তার সঙ্গী হচ্ছেন নাহিদ মাহতাব, তানভীর হাবিব রহমান ও নাফিজ আল তারিক। গত নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর নতুন করে ঢেলে সাজানো শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নতুন মুখ এলে বিএসইসির শীর্ষ পদেও পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যে গত ৩০ এপ্রিল সংসদে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধনী) বিল ২০২৬ পাস হয়, যার মাধ্যমে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বয়সসীমা তুলে নেওয়া হয়। তখন আলোচনা শুরু হয়, অভিজ্ঞ ও প্রবীণ পেশাজীবীদের কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই সরকার ওই বয়সসীমা তুলে দিয়েছে। সেই সময় ৭০ বছরের বেশি বয়সি এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা মাসুদ খানের নাম সবার সামনে চলে আসে। মাসুদ খান ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি ক্রাউন সিমেন্ট গ্রæপের বোর্ডে প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া নাফিজ আল তারিক এতদিন ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব ২০১০ সালে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। আর তানভীর হাবিব রহমান আশা ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক (অর্থ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান হওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদ গত বৃহস্পতিবার সকালে পদত্যাগ করেন। একইদিন চার কমিশনারও দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন। এর কয়েক ঘণ্টা বাদে মাসুদ খানকে চেয়ারম্যানের এবং তিনজনকে কমিশনারের দায়িত্ব দিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। আদেশে বলা হয়, অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে চার বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হল। চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদলের পর বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষপদে পরিবর্তনের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকার রাশেদ মাকসুদকে ২০২৪ সালের ১৮ অগাস্ট বিএসইসির নেতৃত্বে আনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গত মাসেই বলেছিলেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খানের নাম প্রস্তাব করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য ফাইল পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এর মধ্যে গেল ২ জুন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দেন, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও দুই সপ্তাহের মধ্যে পুনর্গঠন করা হবে। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে। আমরা বাজারকে নতুনভাবে সাজাচ্ছি। নিয়োগ পেতে যাওয়া একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনারের সবাই পেশাদার ব্যক্তি। তারা প্রত্যেকেই পুঁজিবাজার বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞ। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
পুঁজিবাজারকে ঢেলে সাজাতে নতুন কমিশনের যত ভাবনা
আরেফিন বাঁধন : দেশের পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ শক্তিশালীকরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কাজ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন সংস্থার নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো ব্যাপকভাবে খুচরা বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ উন্নত পুঁজিবাজারে পেনশন তহবিল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাজারে স্থিতিশীলতা, তারল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ করে। আমরা মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পকে আরও শক্তিশালী করব।
প্রভিডেন্ট ও গ্রাচুইটি তহবিলের পেশাদার ব্যবস্থাপনা উৎসাহিত করব। বীমা খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করব এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেব। আমরা এটিও স্বীকার করি যে, মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে আমরা সুশাসন জোরদার করব, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করব, ন্যায্য সম্পদ মূল্যায়ন নিশ্চিত করব এবং শিল্পজুড়ে জবাবদিহিতা বাড়াব। গত বৃহস্পতিবার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর বিএসইসি কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে মাসুদ খান বলেন, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা আমাদের নিয়ন্ত্রণ দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু থাকবে। আমরা যে প্রতিটি সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করব, তার সফলতা শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে—এটি কি বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করছে? আমরা তথ্য প্রকাশের মান উন্নত করব, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করব, বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম স¤প্রসারিত করব। আমরা এটাকে অনেক ঢেলে সাজাব—ইনভেস্টর এডুকেশন যেটা এবং নিশ্চিত করব যে বিনিয়োগকারীরা সময়োপযোগী, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে পেতে পারে। মাসুদ খান আরও বলেন, একটি ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর পুঁজিবাজার তখনই গড়ে উঠতে পারে, যখন বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করবেন যে—তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত এবং বাজারের নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, আমরা নীতিগতভাবে বিশ্বাস করি যে, দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস কখনো স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই ভবিষ্যতে কখনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে যাতে বাজার স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়ায় ফিরে যেতে পারে। নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর ডাইরেক্ট লিস্টিং কাঠামো প্রবর্তনের উদ্যোগ নেব, যার মাধ্যমে উপযুক্ত কোম্পানিগুলো নতুন মূলধন সংগ্রহ ছাড়াই শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। আমাদের লক্ষ্য হলো-দ্রুত ভালো মানের সিকিউরিটিজ সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ আরও স¤প্রসারিত করা। একইসঙ্গে আমরা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করব, যাতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ‘প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা’ নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে একটি সুযোগ হিসেবে নয়, বরং একটি বাধ্যবাধ্যকতা হিসেবে দেখেছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবেই। আমরা সরকার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে একটি সমন্বিত তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুবিধা কর্মসূচি ‘লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেব। এর আওতায় থাকতে পারে-এটা আমাদের প্রস্তাব, আমরা এটি নিয়ে কাজ করব-তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর হারের আরও বড় পার্থক্য, পৃথক কর প্রশাসন ব্যবস্থা, আলাদা ট্যাক্স সার্কেল আলাদা করা উচিত ফর লিস্টেড কোম্পানি, ঝুঁকিভিত্তিক কর মূল্যায়ন, অটোমেটিক অডিট হবে না কিন্তু, অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্ত অডিট হ্রাস, তারপরে দ্রæত বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, মূলধন সংগ্রহের সহজতর প্রক্রিয়া, দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নীতিগত সুবিধা।
মাসুদ খান আরও বলেন, এসব সুবিধার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উচ্চতর সুশাসন ও তথ্য প্রকাশের মানকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। করপোরেট বাংলাদেশের প্রতি আমাদের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট; একটি ভালো কোম্পানির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া-ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, জনসাধারণের মালিকানা ভিত্তিক কোম্পানি উপযুক্ত হওয়া সত্তে¡ও অনেক কোম্পানি এখনো ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। একটি প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য প্রয়োজনে ভালো মানের সিকিউরিটিজের পর্যাপ্ত সরবরাহ। তাই আমরা বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ স্থানীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান—আমরা বলব যে একটা ক্যাপের উপরে গেলে ইন টার্মস অফ ইকুইটি এবং লোন- ওদেরকে তালিকাভুক্ত করতে হবে। কারণ এটা পাবলিক মানি নিয়ে তারা কাজ করছে; সো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্পন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করব এবং তাদের পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করব।
নতুন কমিশনের সামনে যত চ্যালেঞ্জ ও চাওয়া
রিন্টু হাসান : পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সুশাসন, ফিন্যান্স এবং সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় চার দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মাসুদ খানের হাত ধরে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ইতিবাচক সংস্কারের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিগত সময়ে নষ্ট হওয়া আইপিও বাজার, সেকেন্ডারি বাজার ও উদ্যম হারানো নিয়ন্ত্রক সংস্থা মেরামত করাই এখন প্রধান কাজ মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশনের বলছেন তারা। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বাজারেও ফেরাতে হবে প্রাণচাঞ্চল্য। ফেরাতে হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা। এ ছাড়া ভালো কোম্পানির খরা কাটানো, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কারসাজি বন্ধ, বাজারের সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রমালিকানাধীন কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করা, মুখ থুবড়ে পড়া মিউচুয়াল ফান্ড খাত মেরামত, বাজার কেলেঙ্কারির নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনাসহ চ্যালেঞ্জের তালিকাটি অনেক দীর্ঘ। হতাশা কাটিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন কমিশনকে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে শেয়ারবাজারকে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে আনতে কাজ করতে হবে নতুন কমিশনকে। কারণ, বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার অংশীজন ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শেয়ারবাজার নিয়ে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বহু খাতের মতো পুঁজিবাজারেও নতুন প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে জর্জরিত বাজারকে পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল বলে অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন। বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, নতুন বাস্তবতায় বাজারে জবাবদিহি বাড়বে, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা আসবে, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে এবং দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতার অবসান ঘটবে। কিন্তু প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান যত বাড়তে থাকে, হতাশাও তত গভীর হতে থাকে।
প্রধান অভিযোগ ছিল, বাজারের সংকটকে কাঠামোগতভাবে বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথে এগোনোর পরিবর্তে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে খÐিত, প্রতিক্রিয়াশীল এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতির আশ্রয় নিয়েছে। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন ছিল সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, ধারাবাহিক বার্তা এবং অংশীজনদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ। কিন্তু বহু বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে করেন, এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতি ছিল। পদত্যাগী কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে, পুঁজিবাজারকে কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে পরিচালনা করা যায় না। এটি পরিচালিত হয় আস্থা দিয়ে। সেই আস্থা অর্জন করতে হয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ধারাবাহিকতা এবং ন্যায্যতার মাধ্যমে। বাজারে কারা লাভ করল আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো- তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, মানুষ কি বিশ্বাস করে যে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য? যদি সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে কোনো নীতিই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না। নতুন নেতৃত্বেও কাছে বিনিয়োগকারীদেও প্রত্যাশা এমন একটি বাজার গড়ে তুলতে পারা, যেখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নিজেকে অসহায় মনে করবেন না? যেখানে নীতিনির্ধারণ হবে পূর্বানুমানযোগ্য? যেখানে তথ্য হবে উন্মুক্ত ও সহজলভ্য? যেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য একই নিয়ম কার্যকর থাকবে।
সাবেক কমিশনের জবাবদিহি দাবি বিনিয়োগকারীদের
মহোসু : পুঁজিবাজারের মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতকে সংকটে ফেলতে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমআইএ)। সংগঠনটির দাবি, সদ্য বিদায়ী খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন খাতটির প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং এ বিধিমালা কার্যকর হলে আগামী এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শনিবার (০৬ জুন) রাজধানীতে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের নেতারা। এ সময় বিসিএমআইএর সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেনসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে নতুন বিএসইসি কমিশনের কাছে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫ বাতিল, অতীতের অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ, সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং বাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । জুন ০৭, ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা বলেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ড, মার্জিন ঋণ ও আইপিও সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালার মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, নতুন মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালার আওতায় বিদ্যমান মেয়াদি ফান্ডগুলোকে অবসায়ন বা পুনর্গঠনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বাজারে ব্যাপক বিক্রয়চাপ তৈরি হতে পারে। বিনিয়োগকারীদের মতে, নতুন বিধিমালায় দুই-তৃতীয়াংশ ইউনিটধারীর ভোটে ফান্ড রূপান্তর বা অবসায়নের সুযোগ রাখা হলেও যারা ফান্ড চালু রাখার পক্ষে মত দেবেন, তাদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা আরও বলেন, প্রায় ৩ লাখ বিনিয়োগকারী এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ মিউচ্যুয়াল ফান্ড সম্পদ অবসায়নের আওতায় এলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ সৃষ্টি হবে, যা শেয়ারমূল্যের ওপর বড় চাপ ফেলতে পারে। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, বিতর্কিত নীতিমালা স্থগিত, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্বল কোম্পানির পুনর্গঠনের দাবিও তুলে ধরেন বিনিয়োগকারীরা।
ইউডি/এজেএস

