মূল্যস্ফীতির লাগামহীন দৌড়: কীভাবে বাঁচবে সীমিত আয়ের মানুষ!

মূল্যস্ফীতির লাগামহীন দৌড়: কীভাবে বাঁচবে সীমিত আয়ের মানুষ!

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৬:০৫

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ১৬ মাসের সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। গত এপ্রিলে এ হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এ নিয়ে টানা দুই মাস ঊর্ধ্বমুখী হল মূল্যস্ফীতি। করোনার ধাক্কার পর ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকেই মূল্যস্ফীতির হার সারা বিশ্বে বাড়তে শুরু করে। তখন থেকে বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। কিন্তু উপমহাদেশের অন্যান্য দেশ বা ইউরোপ-আমেরিকা মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো কমছে না। ইতোমধ্যে দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভারে ন্যুব্জ। সীমিত আয়ের চাকরিজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ক্রমেই জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…

২০২১ থেকে ২০২৬ সাল : নিয়ন্ত্রণের বাইরে মূল্যস্ফীতি

মো. আসাদুজ্জামান : করোনা মহামারীর প্রথম ধাক্কার পর ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই মূল্যস্ফীতির হার সারা বিশ্বে বাড়তে শুরু করে। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হয়। ইউরোপ ও আমেরিকায় মূল্যস্ফীতির হার ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। তখন থেকে বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। কিন্তু উপমহাদেশের অন্যান্য দেশ বা ইউরোপ-আমেরিকা মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো কমছে না।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছিল। ওই বাজেটের এক মাস যেতেই পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; বাজেট বাস্তবায়ন করে অন্তবর্তী সরকার। ১০ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছর। পাঁচ বছর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য দুই শতাংশে ওঠে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষ হয় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ নিয়ে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে রাখার লক্ষ্য ধরে অন্তবর্তী সরকার। এপ্রিল পর্যন্ত (২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালে এপ্রিল) হিসাবে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতির তথ্য দিয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরো।

মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ১৬ মাসের সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। গত এপ্রিলে এ হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এ নিয়ে টানা দুই মাস ঊর্ধ্বমুখী হল মূল্যস্ফীতি। এর আগে টানা চার মাস বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। মার্চ মাসে তা কমে ৯ শতাংশের নিচে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নামে। এপ্রিলে ফের তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পয়েন্ট টু পয়েন্টে ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ দিয়ে বোঝায়, গত বছর মে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরে মে মাসে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪২ পয়সা।

গত চার বছর ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপকে সঙ্গী করে নতুন অর্থবছর শুরু করতে যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণের ওপর থেকে এই বোঝা কমানোই সবচেয়ে বড় মাথাব্যাথা হবে সরকারের। ইতোমধ্যে দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভারে ন্যুব্জ। সীমিত আয়ের চাকরিজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ক্রমেই জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আয় বাড়ছে না, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়েই চলেছে। ফলে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, খাদ্য তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে, এমনকি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও পিছিয়ে দিতে হচ্ছে।

বৈশ্বিক সংকট নাকি অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার ফল?

আব্দুল্লাহ সিফাত : সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা থেকে শুরু করে বাজারে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করার মত নানা পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমেনি। কোনো মাসে একটু কমলেও পরের মাসেই ফের চড়ে যাচ্ছে। যার উদাহরণ সবশেষ চার মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র। মূল্যস্ফীতি তখন ঘটে, যখন সময়ের সঙ্গে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। অর্থাৎ, টাকার মান কমে যায়। এই মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাংলাদেশে সরকার সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করে চলেছে। পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে; কোনো কোনো পণ্যের আমদানি শুল্ক শূন্যও করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভ‚রাজনৈতিক উত্তেজনা আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। গত এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাংলাদেশে সরকার সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করে চলেছে

সম্প্রতি বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। ফলে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও সেবাখাতের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। অর্থনীতিতে জ্বালানি হচ্ছে প্রায় সব পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহনের প্রধান উপাদান। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। কৃষক সেচের জন্য বেশি খরচ করেন, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের সা¤প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব জুন ও জুলাই মাসে বাজারে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংসসহ অধিকাংশ পণ্যের দাম নতুন করে বাড়তে পারে।

মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে। অর্থাৎ শুধু খাবার নয়, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবার খরচও দ্রæত বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি। গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ হলেও শহরে তা ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। নতুন সরকারের কাছে জনগণের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং বাজার তদারকির মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু খুচরা বাজারে এখনো তার দৃশ্যমান সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, খুচরা পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করলেও বড় আমদানিকারক, পাইকারি আড়ত এবং শক্তিশালী করপোরেট গোষ্ঠীর ওপর কার্যকর নজরদারি এখনও যথেষ্ট নয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত মুনাফা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখছে।

আসন্ন নয়া বাজেটে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার

রিন্টু হাসান : দেড় বছরের বেশি সময় ধরে নীতি সুদহার (পলিসি রেট বা রেপো রেট) ১০ শতাংশ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতেই রেপো রেট বার বার বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দুই মাসে তিন দফায় ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাগে আসছে না।

এমন প্রেক্ষাপটে ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। সেই বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেশের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার নানা প্রতিশ্রুতি আসছে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ‘উচ্চাভিলাষী’ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বিবেচনায় নিলে সেই লক্ষ্য অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে নতুন বাজেটে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৩টি কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিও রয়েছে। এ খাতে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে নতুন বাজেটে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যাও বাড়ানো হতে পারে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

গত ২১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, দেশের বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বিদ্যমান ছিল এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে সরকারের পদক্ষেপের ফলে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪.১০ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চ মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৮.২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। সংসদে অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত পাঁচটি প্রধান পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন: অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০.০ শতাংশে বহাল রেখেছে। খাদ্য সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনা: খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি জোরদার করা হয়েছে। নি¤œ ও মধ্যবিত্তের চাপ কমাতে ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে সেচসহ কৃষক-সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা হয়েছে।

সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা

সাদিত কবির : বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সাধারণ মানুষ গত চার বছর ধরে টানা মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে। উচ্চ সুদের হার চালু রেখে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কমানোর ইঙ্গিত মিলেছিল, তা আবারে বেড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ পর্যন্ত সরকারের নেওয়া কোনো পদক্ষেপই যে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারেনি, তা আবার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাজার পরিস্থিতি উন্নত না হওয়ার পেছনে কিছু বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করেছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, স¤প্রতি পশ্চিম এশিয়াসহ বিশ্ব-রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা আছে। শঙ্কার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, সরকার ১১ জুন নতুন বাজেট দেবে।

তবে জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সবার ঘাড়ে একটা বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এখন যেটা করা হচ্ছে, সেটা ১ টাকা ২৫ পয়সা প্রতি কিলোওয়াট আওয়ারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আমার অনুমান, এখন যা আছে তার থেকে শুধু এই কারণে ১ শতাংশের কাছাকাছি বাড়তে পারে আগামী এক বছরের মধ্যে। এইটা তো একটা অতিরিক্ত চাপ সবার উপরেই তৈরি করছে। দেড় বছর রেপো সুদহার ১০ শতাংশ থাকায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। দেশে বিনিয়োগে যে খরা চলছে, এই উচ্চ সুদহার তার একটি কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির চাপের মধ্যে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন সামাজিক ভাতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে এর প্রাপ্তি ও বণ্টন নিয়ে সংশয় আছে।

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন

বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য শতাধিক সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প সচল আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব প্রকল্পের পারফরম্যান্স একেবারেই সন্তোষজনক নয় এবং ১ টাকা দিতে গিয়ে দেড় টাকা খরচ হওয়ার মতো সমস্যা রয়েছে। তেমনটা যেন না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে, তাহলেই কেবল এর সুফল পাওয়া যাবে।
মূল্যস্ফীতি কমাতে চাইলে চাঁদাবাজি কমানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, যে দামে উৎপাদকরা বিক্রি করছেন, আর যে দামে ভোক্তারা কিনছেন, চাঁদাবাজির কারণে তার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য তৈরি হয়। তো সেখানে যদি আমরা আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতিকে উন্নত করতে পারতাম, যার ফলে চাঁদাবাজিটা বন্ধ হতো, তাহলে ওই অতিরিক্ত মূল্যটা ভোক্তাদের দিতে হতো না। সেটাও মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হতো। এদিক বিবেচনায় সরবরাহের সংকট সমাধান না করে ওই শুধু সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে রেখে মূল্যস্ফীতি কমবে, এটা আশা করা যায় না।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান

শুধু মুদ্রানীতির বিষয় নয় সমন্বিত নীতি দরকার

আরিফ হোসেন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের জন্য এটা খুবই দুঃখজনক যে, আমরা মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমাতে আমরা সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করতে পারছি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিকে শুধু মুদ্রানীতির বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশ সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি খরচ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। তাই সমন্বিত নীতি দরকার।

খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। মজুতদারি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি দরকার। আমদানি সিদ্ধান্তও সময়মতো নিতে হবে, যেন বাজারে ঘাটতি তৈরি না হয়। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পাইকারি বাজার ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। নি¤œ আয়ের মানুষের সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, স্থির আয়ের মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীরা মূল্যস্ফীতির প্রধান ভুক্তভোগী। তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর পরিস্থিতি কেমন?

মহোসু : শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া প্রতিবেদন বলছে, গত মে মাসে দেশটিতে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। আগের মাস এপ্রিলে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি উঠেছিল প্রায় ৭০ শতাংশে। ওই সময় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২৪ সালের শেষের চার মাস শ্রীলঙ্কায় কোনও মূল্যস্ফীতি হয়নি; বরং মূল্য সংকোচন হয়। অর্থাৎ নেগেটিভ (-) মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ওই চার মাসে। পাশের দেশ ইন্ডিয়ায়ও মূল্যস্ফীতিও কম। সবশেষ গত এপ্রিলে ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে দেশটিতে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৯ জুন, ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা

তবে বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি এখন বেশি। এপ্রিলে ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে দেশটিতে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ২০২৩ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশে উঠেছিল। অন্য অনেক দেশ পারলেও বাংলাদেশ কেন মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছে না, সেই প্রশ্নে অর্থনীতিবীদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে যাওয়া থেকে হয়ত ঠেকিয়ে রেখেছে। তবে এটিই মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ বর্তমান সংকটটি মূলত সরবরাহভিত্তিক।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading