বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমছে কেন?

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমছে কেন?

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬, আপডেট ১২:০০

বিশ্বজুড়ে সংকটের সময় সাধারণত বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কারণ এটিকে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখা হয়। তবে এবার সেই স্বাভাবিক প্রবণতার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১.১ গ্রাম) স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে পৌঁছালেও গত শুক্রবার (১২ জুন) তা কমে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কমে যাওয়া। বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার আরও বাড়তে পারে; এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এর বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালির সংকটকে।

যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে, যা তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ। এতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়ে তেলের দাম বেড়ে গেছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিতে।

আমেরিকার বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪.২ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শক্তিশালী কর্মসংস্থান বাজারের কারণে সুদের হার দ্রুত কমানোর সম্ভাবনাও প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণ সাধারণত বিনিয়োগকারীদের জন্য মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে কাজ করলেও উচ্চ সুদের হার এই ধাতুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বিশ্ববাজারে স্বর্ণকে সাধারণত ‘অ-ফলনশীল’ বা নন-ইয়েল্ডিং সম্পদ হিসেবে ধরা হয়। কারণ এটি নিজে থেকে কোনো সুদ বা আয় তৈরি করে না। ফলে স্বর্ণ থেকে লাভ পেতে হলে মূলত এর দামের ঊর্ধ্বগতির ওপরই নির্ভর করতে হয়।

আর্থিক ওয়েবসাইট অপশনস্প্রেডারস ডট কমের প্রধান অপশনস বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল আল জাজিরাকে বলেন, স্বর্ণকে এমন একটি সম্পদ হিসেবে দেখা হয় যা প্রকৃত অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি। এটি কোনো লভ্যাংশ দেয় না এবং দাম না বাড়লে কোনো রিটার্নও আসে না। তাই বিনিয়োগকারীরা মূলত দাম বাড়ার প্রত্যাশাতেই স্বর্ণ কেনেন।

তার মতে, এ কারণেই সুদের হার সরাসরি স্বর্ণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চলে আসে। যখন সুদের হার বেশি থাকে এবং বিনিয়োগকারীরা ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যায়।

এদিকে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ডলারের শক্তি বেড়েছে বলে মনে করেন নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের সিইও কলিন প্লুম। তিনি বলেন, যেহেতু স্বর্ণের দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়, আর ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বাড়ে। এই দুই সম্পদের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত। সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতির ভারসাম্য আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের বাজারকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে।

তিনি আরও বলেন, আগে সুদের হার কম থাকায় স্বর্ণসহ বিভিন্ন সম্পদের দাম বাড়ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে এবং সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

এদিকে সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে; এমন সম্ভাবনা এখন ৫০ শতাংশের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্লুমের মতে, সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতি যেন একটি দোলনার দুই পাশের মতো, আর স্বর্ণ ঠিক এর মাঝখানে অবস্থান করে। বর্তমানে সুদের হারের প্রভাবই বেশি শক্তিশালী হওয়ায় স্বর্ণ চাপের মুখে রয়েছে।

তবে তিনি মনে করেন, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির খবর স্বর্ণের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, কারণ এতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা কমার সম্ভাবনা থাকে। তবে এই প্রভাব পুরোপুরি কার্যকর হতে সময় লাগবে।

অন্যদিকে জাস্টিন কার্ডওয়েল বলেন, স্বর্ণের বর্তমান দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট লেভেলে রয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলেও সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি এবং বাজার পরিস্থিতির মতো নানা বিষয় স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ করবে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading