বিশ্বকাপের আকাশে শুকতারা এমবাপ্পে
উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, আপডেট ১২:২০
ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে যিনি পৌঁছে গেলেন অমরত্বের আরও কাছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী গানের সঙ্গে মিল রেখে তুলনা করা যেতে পারে– ‘বিশ্বকাপের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা, ফুটবলপ্রেমীকুলকে করেছ একি চঞ্চল, বিহ্বল, দিশাহারা।’ ২০১৮-এর বিশ্বকাপে গেয়েছেন ঊনিশের জয়গান। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও শিরোপা হারানোয় সুর মেলাতে হয় হৃদয় ভাঙার গানে। ২০২৬-এ অভিযান শিরোপা পুনরুদ্ধারে। এমবাপ্পের আকাঙ্ক্ষা, মেসির সঙ্গে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে দেখা হোক। এই চাওয়া প্রতিশোধের নেশা থেকে, নাকি বিশ্বসেরা হওয়ার ম্যাচে গ্রহের সেরা দলটিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে, এর উত্তর জানা কেবল এমবাপ্পের।
মেসি-রোনালদোরা জনপ্রিয়তায় বটবৃক্ষ হলে পাকুড়গাছের শীতল ছায়া এমবাপ্পে। যিনি নীরবে-নিভৃতে নিজের কাজটাই করে যান। এই তো নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকেই মেতেছেন গোল উৎসবে। এই যে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছুঁয়েছেন গতকাল মঙ্গলবার ইরাকের বিপক্ষে খেলা ভোরের ম্যাচে। কিংবদন্তি লিওনেল মেসির পিছু পিছু ছুটছেন উসাইন বোল্টের গতিতে।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ১৬টি ম্যাচ খেলার রেকর্ডে গোলও ১৬টি। হ্যাঁ, তিনি সব ম্যাচে গোল করেননি ঠিক, তবে কোনো বিশ্বকাপে গোল করা বাদ যায়নি। এত অল্প সময়ে এত সাফল্যের মুখ দেখেও নিরহংকার। কয়েক দিন আগেই এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল– মেসি, রোনালদো না তিনি এই গ্রহের সেরা ফুটবলার? উত্তরে বলেছেন, মেসিই হলেন বিশ্বের সেরা ফুটবলার। তবে বিশ্বকাপে মেসি-এমবাপ্পের দ্বৈরথ চলছেই। দুইবার করে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন দুজনেই, একটি চ্যাম্পিয়ন, একটি রানার্সআপ। তাই মেসি ফুটবলের আকাশের ধ্রুবতারা হলে এমবাপ্পে শুকতারা।
সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ শুরু হয় ১৬ জুন নিউইয়র্কে। ওই ম্যাচে ৩-১ গোলে জিতেছিল ফ্রান্স; এমবাপ্পে করেন জোড়া গোল। গতকাল ভোরে বৃষ্টিস্নাত ম্যাচেও পেলেন জোড়া গোল। গতকাল ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচের ১৪ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ধনুক বাঁকা শটে দূরবর্তী পোস্টে জড়ান বল। নিখুঁত স্কিলের প্রদর্শনী ছিল শটে। দুই ডিফেন্ডারের মাঝের যে সরু পথ দিয়ে গোলপোস্ট বল পাঠিয়েছেন ফরাসি সুপারস্টার, ওই শটের ছবিতে ডট এঁকে ফেসবুকে পোস্ট করেছে ফিফা। প্রথমার্ধের শেষদিকে বৃষ্টি হানা দেয় ম্যাচে। বিদ্যুতের গর্জনে খেলা বন্ধ রাখা হয় দুই ঘণ্টা। এই লম্বা বিরতি থেকে ফিরেও সেই শুরুর এমবাপ্পেকে পেয়েছে ফ্রান্স। ৫৪ মিনিটে উসমান দেম্বেলের বাড়ানো বলে আলতো টোকায় গোল করে ক্লোসার রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি। একটি গোল করেন দেম্বেলেও।
ফ্রান্সের পক্ষে শততম ম্যাচ খেলেন এমবাপ্পে। ২০১৭ সালের ২৫ জুন লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে ফ্রান্সের সিনিয়র দলে অভিষেক তাঁর। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আরেক জুনে শততম ম্যাচ খেলার মাইলফলক ছোঁয়া। ৬০টি গোল করেছেন জাতীয় দলের জার্সিতে। জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান সতীর্থদের গড়া প্রায় সব রেকর্ডই নিজের করে নিচ্ছেন এমবাপ্পে। রেকর্ডের বরপুত্র হয়ে ওঠা ফরাসি এই ফুটবল-নক্ষত্র বিশ্বকাপে গোলের একক রেকর্ড হিমালয়ের উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। কোচ দিদিয়ের দেশমের অন্তত তাই মনে হয়, ‘সে খুব কার্যকর একজন ফুটবলার। রেকর্ড ভাঙার জন্যই তৈরি হয়। সে ১০০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে; আরও অনেক গোল করতে থাকবে সে। আমি নিশ্চিত নই মেসি-রোনালদোর মতো বয়স পর্যন্ত কিলিয়ান খেলতে পারবে কিনা। তবে যতদিন সে মাঠে থাকবে, সব সময়ই অনেক গোল করবে। রেকর্ডটিকে আরও উঁচুতে নেওয়ার ক্ষমতা আছে তার।’
ফ্রান্সের অন্যতম সর্বকালের সেরাদের তালিকায় এরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন এমবাপ্পে। তাঁর মতো একজন খেলোয়াড়কে দলে পাওয়া কোচের জন্য স্বস্তির। শিষ্য এমবাপ্পেকে প্রশংসায়ও ভাষালেন দেশম, ‘এমবাপ্পেকে আমি চিনি। নিজের কাছে তার অনেক প্রত্যাশা। তাকে নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। সে এখানে গোল করার জন্যই এসেছে এবং তা করছেও। মাঠের ভেতরে ও বাইরে অধিনায়কের ভূমিকাও পালন করে সে। তার একটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি রয়েছে। সমালোচকরা তাকে স্বার্থপর বললেও সে মোটেও তেমন নয়। অধিনায়ক হিসেবে দলের জন্য দৃষ্টান্ত সে।’
রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করেই জাতীয় দলের সাবেক সতীর্থ অলিভিয়ের জিরুদের রেকর্ড ভাঙেন। সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের ম্যাচের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সময় বিবিসি ওয়ানে প্রতিক্রিয়া দেন জিরুদ, ‘অভিনন্দন কিলিয়ান। আমি তার জন্য (রেকর্ড ভাঙা) খুশি। এটা স্বাভাবিক, এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। সে প্রতিটি রেকর্ড ভাঙবে– আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এবং গোলের সংখ্যায়।’ জিরুদের বিশ্বাস ছিল, ইরাকের বিরুদ্ধেই ক্লোসার রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলবেন তাঁর এই উত্তরসূরি। সে প্রত্যাশা পূরণও করেছেন এমবাপ্পে।
ফরাসি ফুটবল বিশ্লেষক জুলিয়েন লরেন্সের বিশ্বাস, এমবাপ্পে দেশটির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন। ‘তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু পাওয়ার আছে। যদি এখনই বিচার করতে হয়, তবে জিনেদিন জিদান ও মিশেল প্লাতিনি নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা দুই ফরাসি খেলোয়াড়। এর পরে আছেন এমবাপ্পে, থিয়েরি অঁরি, আন্তোনিও গ্রিজম্যান, অলিভিয়ের জিরুদ। এমনকি রেমন্ড কোপার মতো পুরোনো প্রজন্মের খেলোয়াড়রাও।’ কেন এমবাপ্পেকে ওই উচ্চতায় দেখেন– তার ব্যাখ্যা দেন এভাবে, ‘এটি শুধু তাঁর গোলের জন্য নয়, বরং মাঠে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব, ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয়, ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার জন্যও। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে ক্যারিয়ারের শেষে তিনিই হবেন এক নম্বর। এরপর তাঁর আরও অন্তত একটি বিশ্বকাপ এবং ইউরো খেলার বাকি আছে। তাই সম্ভবত তিনিই হবেন আমাদের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়।’
ক্লাবের থেকেও জাতীয় দলে বেশি ভালো খেলেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তিনি দুর্বার। আর্জেন্টাইন মহাতারকা মেসির বিশ্বকাপের বেশির ভাগ গোল যেখানে ছোট দলের বিপক্ষে, এমবাপ্পে সেখানে শিকার বড় দল। এই যেমন ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে সাতটি ম্যাচ খেলে চারটি গোল করেছেন, যার একটি ছিল ফাইনাল ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। সেবার গ্রুপ পর্বে পেরুর বিপক্ষে পাওয়া গোলটি ছিল তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ গোল। সেরা ষোলোতে মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে করেছিলেন জোড়া গোল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে সাতটি ম্যাচ খেলে আটটি গোল করেন। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে করেন হ্যাটট্রিক। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি, ডেনমার্কের বিপক্ষে দুটি, রাউন্ড অব ষোলোতে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ছিল দুটি গোল। এবারের দুই ম্যাচের স্মৃতি তো সবার কাছেই টাটকা। চারটি গোল করে ফেলেছেন রেকর্ডের এই বরপুত্র।
ইউডি/কেএস

