অনলাইন জুয়া দমনে নতুন আইনের গেজেট প্রকাশ

অনলাইন জুয়া দমনে নতুন আইনের গেজেট প্রকাশ

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১৩:২০

দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো এবং ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে সরকার নতুন আইন কার্যকর করেছে। প্রায় ১৫৯ বছর আগে প্রণীত প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭ বাতিল করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ নামে নতুন আইন জারি করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বুধবার (১ জুলাই) আইনটি গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়।

নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, অনলাইন ও স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ও ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংসহ বিভিন্ন ডিজিটাল অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামো কিংবা ভিপিএন ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, বেটিং পরিচালনা, অ্যাকাউন্ট খোলা বা ব্যবহার এবং জুয়ার অর্থ জমা, উত্তোলন বা স্থানান্তর করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিদেশি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি বা এজেন্ট হিসেবেও কাজ করা যাবে না।

সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে।

এছাড়া অনলাইন বেটিং পরিচালনা, বুকমেকার হিসেবে কাজ করা, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকেও নিষিদ্ধ করতে পারবেন।

জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল কার্যক্রমে অংশ নেওয়া গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় বা অন্য কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে, সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

আইনে জুয়ার অর্থ ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ডিজিটাল ওয়ালেট, হুন্ডি, হাওলা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর বা বৈধ করার চেষ্টাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে এ ধরনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট আইনেও বিচার করা যাবে।

আদালত অপরাধে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, মোবাইল ফোন, কম্পিউটারসহ সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিতে পারবেন। জুয়ার কাজে ব্যবহৃত ভবন, অফিস, কল সেন্টার বা সার্ভার অবকাঠামোও বাজেয়াপ্ত করা যাবে।

কোনো কোম্পানি, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং প্রোভাইডার বা পেমেন্ট গেটওয়ে এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকলে তাদের পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়ী করা হবে। আদালত প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত কিংবা বাতিলের নির্দেশও দিতে পারবেন।

আইনে বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়া ও সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। এসব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব অপরাধ তদন্ত করবেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে জব্দ করতে পারবেন।

অনলাইন জুয়া শনাক্ত ও প্রতিরোধে সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (ডিপিআই), ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেম ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ, এনআইডি-সিম-এমএফএস সংযুক্তি ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক যাচাই ও ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইন বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, নির্বাচন কমিশন, সিআইডি ও জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার বিধানও রাখা হয়েছে।

নতুন আইন কার্যকরের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক আমলের প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হলো। তবে, পুরোনো আইনের অধীনে চলমান মামলাগুলো নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী নিষ্পত্তি হবে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading