ইয়েমেনে ফের যুদ্ধে জড়াতে পারে সৌদি আরব!
উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১৪:১৫
হুথিদের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে ইয়েমেনে আবারও সামরিক সংঘাতে জড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে সৌদি আরব। সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নতুন করে যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আমেরিকা হুথিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান চালাতে সৌদি আরবকে কিছুটা স্বাধীনতা দিতে পারে। তবে, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি রিয়াদ।
একজন মার্কিন ও একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, কীভাবে হুথি হুমকির জবাব দেওয়া হবে—এ নিয়ে সৌদি রাজপরিবারের ভেতরে মতপার্থক্য রয়েছে। একই সময়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাতও আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
এই আলোচনা এমন সময়ে হচ্ছে, সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি সাম্প্রতিক সংঘর্ষে নতুন করে চাপের মধ্যে পড়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে হুথি কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি বিমান সানার বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হলেও এতদিন উভয় পক্ষ একটি অনানুষ্ঠানিক কাঠামো মেনে চলছিল। এর আওতায় ইয়েমেন বিমান চলাচল মূলত জর্ডানের আম্মান ও মিসরের কায়রো থেকে পরিচালিত হতো।
হুথিদের অভিযোগ, বিমানটি ফেরত যেতে না দেওয়ার জন্য সৌদি আরব সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে।
মিডল ইস্ট আইকে মার্কিন ও আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সানায় অবতরণ করা ওই বিমানে লেবানন, ইরান, সিরিয়া ও ইরাকের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তারা ছিলেন। ফেরার ফ্লাইটে ইরানে প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হুথি কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতারাও ছিলেন।
এর জবাবে হুথিরা চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আবহা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হলে তা শুধু ইয়েমেনের মানবিক সংকটই বাড়াবে না বরং জ্বালানি বাজার ও সৌদি অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দেবে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে।
ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদারের চেষ্টা করার পর লোহিত সাগর সৌদি তেল রপ্তানির প্রধান পথ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করছে।
আমেরিকাভিত্তিক ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আল-বাসা বলেন, আজ সৌদি আরবের অবস্থায় থাকতে আমি চাইতাম না। ইয়েমেন সংকটের সহজ কোনো সমাধান নেই।
তার ভাষায়, হুথিদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে হলে কয়েকশ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর যুদ্ধ শুরু হলে সৌদির জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ৫০-৫০।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় প্যালেস্টাইনদের প্রতি সংহতি জানিয়ে হুথিরা লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা শুরু করে, যা আরব ও মুসলিম বিশ্বে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ায়।
২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলার নির্দেশ দিলেও পরে সৌদি আরবের অনুরোধে উপসাগরীয় সফরের আগে সেই অভিযান বন্ধ করেন। এরপর থেকে মে ২০২৫ সালের সমুদ্রবিষয়ক যুদ্ধবিরতি উভয় পক্ষ মোটামুটি মেনে চলেছে।
যদিও ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের পর ইরান-আমেরিকা সংঘাতে হুথিরা আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নেয়নি, তবুও উপসাগরীয় ও মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, সৌদি ভূখণ্ডে কয়েকটি স্থল হামলার পেছনে হুথিদেরই ভূমিকা ছিল।
এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য এখনো কার্যকর কোনো বিকল্প পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ জনবহুল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব এডেনভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম জালাল বলেন, যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়-এই অচলাবস্থা কোনো রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যায়নি। একই সঙ্গে সৌদি বিরোধী হুথি বক্তব্যও আবার তীব্র হয়ে উঠেছে।
হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রিয়াদ আবার ইয়েমেনে হামলায় জড়ালে সৌদি আরবের সব তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হবে।
তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরের বদলে বিমানবন্দর, বন্দরের বদলে বন্দর এবং অবরোধের বদলে অবরোধ হবে।
উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সৌদি আরব আমেরিকার সমর্থন আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানও হুথিদের সৌদি আরবে হামলা না চালানোর সতর্কবার্তা দিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
বুধবার রিয়াদে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের উপ-কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্যাট্রিক ফ্রাঙ্ক সৌদি সেনাপ্রধান ফায়াদ আল-রুয়াইলির সঙ্গে বৈঠক করেন।
এছাড়া আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবের কাছে ২০ হাজার অ্যাডভান্সড প্রিসিশন কিল উইপন সিস্টেম (APKWS) বিক্রির অনুমোদনের কথাও ঘোষণা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা সীমিত মাত্রায় এবং হিসাব করে পরিচালিত হয়েছে। যদিও কেউ কেউ সতর্ক করছেন যে হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে। তবে, বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আল-বাসা মনে করেন এমন সম্ভাবনা কম।
ইউডি/রেজা

