রাজবাড়ীতে পাটের বাম্পার ফলন, দাম নিয়ে শঙ্কায় কৃষকরা

রাজবাড়ীতে পাটের বাম্পার ফলন, দাম নিয়ে শঙ্কায় কৃষকরা

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১২:১৩

রাজবাড়ীতে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন পাট কাটা ও জাগ দেয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তবে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

কৃষকদের অভিযোগ, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে তাদের। কৃষকদের মতে, বাম্পার ফলন হলেও লাভ-লোকসান পুরোপুরি নির্ভর করবে পাটের বাজারদরের ওপর। এদিকে শিগগিরই সরকারি পর্যায়ে পাটের মূল্য নির্ধারণের আশ্বাস দিয়েছে কৃষি বিভাগ।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে জেলার পাঁচ উপজেলায় মোট ৪৭ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে পাংশায় ১২ হাজার ৩০০ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ১২ হাজার ১৫০ হেক্টর, কালুখালীতে ৯ হাজার ৮৫০ হেক্টর, সদর উপজেলায় ৯ হাজার ২৬০ হেক্টর এবং গোয়ালন্দে ৪ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ২৭৬ হেক্টর, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৪৬ হাজার ১৫৮ হেক্টর, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৪৯ হাজার ৫০ হেক্টর এবং ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল।

সরেজমিনে বালিয়াকান্দি ও কালুখালী উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দোল খাচ্ছে সবুজ পাট। কোথাও কৃষকরা পাট কাটছেন, কোথাও জাগ দিচ্ছেন, আবার কোথাও জাগ থেকে আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। বাম্পার ফলনে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের দাম নিশ্চিত করা হলে আগামী বছরও পাট চাষে আগ্রহ বাড়বে বলে জানান তারা।

বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের মাশালিয়া বিলে পাট জাগ দেয়ার কাজ করছিলেন কৃষক ইউনূস আলী। তিনি বলেন, ‘এবার সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় পাটের গাছ ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। ফলন খুব ভালো হয়েছে। এখন বাজারে ভালো দাম পেলে গত বছরের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারব।’

পাংশা উপজেলার হাবাসপুর এলাকার কৃষক শফিউল্লাহ খান বলেন, ‘পাটের ফলন খুব ভালো হয়েছে। তবে দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি। কারণ এবার পেঁয়াজ চাষ করে ক্ষতির মুখে পড়েছি। এখন যদি পাটেরও ন্যায্য দাম না পাই, তাহলে ভবিষ্যতে চাষাবাদ ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবতে হবে।’

কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের পাটচাষি কালিমুদ্দিন মণ্ডল বলেন, ‘এবার পাটের ফলন নিয়ে আমরা অনেক খুশি। তবে উৎপাদন খরচ আগের বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ এবারে এক বিঘা জমিতে পাট চাষে খরচ হয়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। পাট বিক্রির মৌসুমে কোনো অসাধু চক্র যেন কৃত্রিমভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম রসূল বলেন, ‘গত বছর পাটের দাম ভালো থাকায় চলতি বছরে কৃষকেরা বেশি জমিতে পাট আবাদ করেছেন। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল তাপমাত্রার কারণে এবারও পাটের উৎপাদন ভালো হবে বলে আশা করছি। তবে দামের বিষয়টি এখনই বলা কঠিন। দেশে কাঁচা পাটের ব্যবহার সীমিত। রফতানি না বাড়লে বাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত বছরের অনেক পাট এখনও কৃষকদের ঘরে মজুত রয়েছে। সাধারণত যে ফসলের দাম বেশি পাওয়া যায়, পরের বছর কৃষকেরা সেই ফসল বেশি আবাদ করেন। বিপরীতে দাম না পেলে ওই ফসলের আবাদে আগ্রহ কমে যায়। উৎপাদন খরচও যদি উঠে না আসে, তাহলে আগামী বছর পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে পাটের উৎপাদনও হ্রাস পেতে পারে।’

রাজবাড়ী জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নাঈম আহম্মেদ বলেন, ‘এখনো সরকারিভাবে পাটের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়নি। কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে দ্রুতই অধিদফতরে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।’

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading