বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাগাম ছাড়ার আশঙ্কা

বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাগাম ছাড়ার আশঙ্কা

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার (২৬ জুলাই) ২০২৬, আপডেট ০১:০০

লোহিত সাগরের দুটি প্রধান সৌদি তেল বন্দরে হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। গতকাল শনিবারের এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য সংকট এক বিপজ্জনক ধাপে রূপ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরের ইরান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল লোহিত সাগরেও। এতে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হয়ে বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত মে মাসের পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছুঁয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তেলের দাম লাগাম ছাড়ানোর আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

এর আগে সর্বশেষ ২০২২ সালে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ১২৮ ডলারে পৌঁছেছিল। আর ২০০৮ সালে তা ছুঁয়েছিল সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৪৬ ডলারের ঘর। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত সুরাহা না হলে আগামী অক্টোবরের মধ্যেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ ডলার হতে পারে।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে দাবি করেছেন, তারা সৌদি আরবের জিজান ও ইয়ানবু বন্দরে আরামকোর স্থাপনায় সফল হামলা চালিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে জিজানের চার লাখ ব্যারেল ক্ষমতার শোধনাগার এলাকা থেকে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। এশিয়াভিত্তিক তেলের ব্যবসায়ীরা জিজানের জ্বালানি মজুতাগারের ক্ষতির তথ্য রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন।

অন্যদিকে সৌদির প্রধান তেল রপ্তানিকারক বন্দর ইয়ানবু লক্ষ্য করে আসা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে প্রতিহত করার দাবি করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইয়ানবু বন্দরটিই সৌদির তেল সরবরাহের প্রধান বিকল্প পথ।

হুতি হামলার জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী ইয়েমেনের ভেতরে হুতিদের সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। মারিব, আল-জফ এবং লোহিত সাগরের বন্দরনগরী হোদেইদাহর টেলিকম অবকাঠামো, কামারান দ্বীপ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটিতে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বাহিনী।

ইয়েমেনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২২ সাল থেকে চলা অস্ত্রবিরতি ভেঙে দুই পক্ষই নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হুতি নেতা আব্দুল মালিক আল-হুতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সৌদি আরব এ যুদ্ধে জড়ালে তাদের সব তেল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

লোহিত সাগরে প্রতিদিনের প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেলের পারাপার ঝুঁকিতে পড়ায় বিশ্ববাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি জটিল হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, আপাতত ইরানে কোনো বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো হবে না। তিনি জানান, সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পর্দার অন্তরালে সংলাপ চলছে।

টানা ১৩ দিন ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের পর গত শুক্রবার রাতে ইরানের প্রধান শহরগুলোতে বড় হামলার খবর পাওয়া যায়নি। যদিও প্রয়োজন হলে আমেরিকান বাহিনী প্রস্তুত আছে বলে সতর্ক করেন ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইরান হুমকিতে ভয় পায় না এবং চাপের মুখে নতি স্বীকার করে না।

মার্কিন আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেপি মর্গানের তথ্য বলছে, পারস্য উপসাগরের বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগর দিয়ে দিনে ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পার হতো। এখন শুধু সৌদিরই ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে।

জেপি মর্গানের বৈশ্বিক পণ্যসামগ্রী কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা জানান, সৌদি আরব চাইলে সুয়েজ খাল দিয়ে তেল পাঠানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সমস্যা হলো তাদের বড় তেলের ট্যাঙ্কারগুলো গভীরতার কারণে আটকে যাবে। তারা যদি ছোট ছোট ট্যাঙ্কারে করে পাঠায়, তাহলেও চার সপ্তাহের জায়গায় জাহাজগুলোর গন্তব্যে পৌঁছাতে আট সপ্তাহ লাগবে।

যুক্তরাষ্ট্রকে কোনোভাবে পাশ কাটিয়ে ইরানকে টোল দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ারও উপায় নেই। কারণ এতে বীমা সুবিধা মিলবে না। এতদিন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম নিচ্ছিল। এখন তারা ইরানকে টোল দেওয়া জাহাজকে বীমা সুবিধা দেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে বৈশ্বিক তেলের বাজার লাগামছাড়া হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

ইরানের ভেতরে গোপনে যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছিল বাহরাইন ও কুয়েত। চলতি মাসের শুরুর দিকে এ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তথ্য সম্পর্কে অবহিত এক সূত্র জানায়, ওই হামলায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুতাগার আঘাত হানা হয়। উপসাগরীয় রাষ্ট্র দুটির বিমানবাহিনী তুলনামূলকভাবে ছোট এবং তাদের হাতে মার্কিন ও ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান রয়েছে।

DUD.NEWS

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading