মাইক্রোপ্লাস্টিক কী? কেন ক্ষতিকর, কীভাবে বাঁচা সম্ভব

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী? কেন ক্ষতিকর, কীভাবে বাঁচা সম্ভব

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ০৮:০০

সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ। এরপর এক বোতল পানি পান, অফিসে যাওয়ার পথে বাতাসের ধুলাবালি, দুপুরে মাছ-ভাত, বিকেলে এক কাপ চা—দৈনন্দিন জীবনের এসব সাধারণ অভ্যাসের মধ্যেই অজান্তে শরীরে প্রবেশ করছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা।

খালি চোখে দেখা যায় না বলে এর উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্ষুদ্র কণাগুলো এখন মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, প্লাসেন্টা, এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও শনাক্ত হয়েছে। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

সম্প্রতি বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কয়েকটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি দেশেও ব্যাপক আলোচনায় আসে।

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টুথপেস্টই একমাত্র উৎস নয়। প্রতিদিনের খাবার, পানি, বাতাস, প্রসাধনী, পোশাক ও প্লাস্টিকজাত অসংখ্য পণ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে এই অদৃশ্য দূষক।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?
সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এতটাই ছোট যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত দুই ধরনের। একটি শিল্পকারখানায় শুরু থেকেই ক্ষুদ্র আকারে তৈরি হয়, যা কিছু প্রসাধনী বা শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হয়। অন্যটি তৈরি হয় প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাদ্য মোড়ক, টায়ার, সিনথেটিক কাপড়সহ বিভিন্ন প্লাস্টিকজাত পণ্য দীর্ঘদিন ব্যবহার, রোদ, তাপ, ঘর্ষণ বা পরিবেশগত প্রভাবে ভেঙে ছোট ছোট কণায় পরিণত হওয়ার মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে এসব কণা সহজে নষ্ট হয় না। বরং নদী, সমুদ্র, মাটি ও বাতাসে বছরের পর বছর থেকে যায় এবং খাদ্যচক্রের অংশ হয়ে ওঠে।

কীভাবে শরীরে ঢুকছে?
মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রধানত তিনটি পথে প্রবেশ করে—খাবারের মাধ্যমে, পানির মাধ্যমে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে।

সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, ঝিনুক, লবণ, বোতলজাত পানি, কলের পানি, চা-ব্যাগ, কিছু টুথপেস্ট ও প্রসাধনীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাতাসে ভেসে থাকা সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণাও শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা বা প্লাস্টিকের বোতলে দীর্ঘ সময় পানি সংরক্ষণ করলে সেখান থেকেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবার বা পানীয়তে মিশে যেতে পারে।

কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
কয়েক বছর আগেও মাইক্রোপ্লাস্টিককে মূলত পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ অনেক বেড়েছে।

গবেষকরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু প্লাস্টিক নয়; এর সঙ্গে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। কিছু প্লাস্টিকে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে প্রদাহ, কোষের ক্ষতি, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্যহীনতা এবং হৃদ্‌রোগের সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে এখনও আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

শিশুদের শরীর এখনও বিকাশমান থাকায় দূষকের প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে গর্ভবতী নারীর শরীরে প্রবেশ করা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে।

কেন নতুন করে আলোচনায়?
বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণ নতুন কোনো সমস্যা নয়। তবে সম্প্রতি বাজারে বিক্রি হওয়া বেশ কয়েকটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু টুথপেস্ট নয়—একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, পলিথিন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ দ্রুত বাড়ছে।

নদী, খাল ও জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য জমে থাকার কারণে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর শরীরেও এই কণা প্রবেশ করছে। পরে সেই মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হচ্ছে।

পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। কারণ এটি ইতোমধ্যে পরিবেশের প্রায় সব স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে শরীরে এর প্রবেশের পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

কীভাবে ঝুঁকি কমানো যাবে?
প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ও খাবারের পাত্র ব্যবহার করা।

গরম খাবার কখনোই প্লাস্টিকের পাত্রে না রাখা বা গরম না করা।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো।

নিরাপদ ও মানসম্মত পানি ব্যবহার করা।

ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত পরিষ্কার করা।

সিনথেটিক কাপড়ের বদলে সুতি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া।

টুথপেস্ট ও প্রসাধনী কেনার সময় উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকা।

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহারে কার্যকর নীতিমালা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, শিল্পকারখানার ওপর কঠোর নজরদারি এবং নিরাপদ বিকল্প পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে দেশে আরও গবেষণা প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশে এই দূষণের প্রকৃত মাত্রা, মানুষের শরীরে এর প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে এখনও পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

অদৃশ্য হলেও বাস্তব হুমকি
মাইক্রোপ্লাস্টিক চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হতে পারে। তাই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading