পুরোনো গাছ বাঁচানোই কি মানুষের জীবন রক্ষার সেরা উপায়?
উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, আপডেট ০৯:০০
শহরের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ার এই চরম দিনে প্রবীণ ও বয়স্ক গাছ কেটে ফেলা যে কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি করছে না বরং মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে; তার এক চাঞ্চল্যকর সত্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। শিকাগো শহরের বিভিন্ন পাড়াগুলোতে টানা ১১ বছর ধরে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় গাছের মোট পাতা ও ডালপালার বিস্তার অর্থাৎ ক্যানোপির পরিমাণ দিন দিন কমেছে, সেখানে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শহরের সবচেয়ে উত্তপ্ত বা গরম অঞ্চলগুলোতে এই প্রবণতা ছিল মারাত্মক।
পক্ষান্তরে, যেসব এলাকায় বছরজুড়ে গাছের ক্যানোপি বেড়েছে, সেখানে মানুষের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। জিওহেলথ সাময়িকীতে গত ৫ আগস্ট প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে যে, কোনো পাড়ায় ঠিক কতগুলো গাছ রয়েছে তা বড় কথা নয়; আসল প্রভাব ফেলছে বছর বছর সেই গাছের ক্যানোপি কতটা বাড়ছে বা কমছে।
যদিও এই পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণাটি সরাসরি দাবি করতে পারে না যে কেবল গাছ কমার কারণেই মৃত্যু বেড়েছে, কারণ এটি মূলত দুটি ভিন্ন ঘটনার পারস্পরিক সম্পর্ককে তুলে ধরেছে; তবুও পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে চরম তাপপ্রবাহ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে শহুরে বৃক্ষরাজির ভূমিকা যে কতটা অপরিসীম, এই গবেষণা তারই একটি শক্ত প্রমাণ তুলে ধরেছে। প্রবীণ প্রকাণ্ড গাছগুলো তাদের ছায়ার মাধ্যমে পাকা রাস্তা ও দালানকোঠাকে ঠাণ্ডা রাখে এবং বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বাতাসে আর্দ্রতা ছড়িয়ে আশপাশের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখে।
পোর্টল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর বিবেক শান্দাস জানান, গাছ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, এটি নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। তবে গবেষকরা যেভাবে বছরের পর বছর সময় ধরে তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন, সেটাই এই গবেষণাকে অনন্য করে তুলেছে।
অতীতে এ সংক্রান্ত বেশিরভাগ গবেষণাতেই নির্দিষ্ট সময়ের স্থিতিশীল চিত্রের ওপর নির্ভর করা হতো। কিন্তু শিকাগোর এই গবেষণায় গবেষকরা ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরের ক্যানোপির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি বছর গাছের ক্যানোপি এক শতাংশ বাড়লে মৃত্যুর হার গড়ে প্রায় দশ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। বিশেষ করে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই স্বস্তিদায়ক ফল সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। গবেষকরা স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ক্যানোপির তথ্য এবং রাজ্য ও শহরের স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে প্রাপ্ত দুই লাখ বিশ হাজারের বেশি মৃত্যুর রেকর্ড বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন। এতে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা, বায়ুদূষণ, বাসিন্দাদের আয় এবং আবাসন ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোকেও পরিসংখ্যানের মডেলে সমানভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে এক করুণ ঐতিহাসিক সত্য। শিকাগোর সাউথ সাইড এবং ওয়েস্ট সাইডের মতো সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলোতে গাছের ক্যানোপি কমার হার ছিল সবচেয়ে বেশি, সেখানে প্রখর গরম এবং মৃত্যুর হারও ছিল সর্বোচ্চ; যদিও অতীতে এলাকাগুলোতে প্রচুর গাছ ছিল। এর বিপরীতে শিকাগোর লেকফ্রন্ট সংলগ্ন এলাকাগুলো ছিল তুলনামূলক ঠাণ্ডা এবং সেখানে মৃত্যুর হারও ছিল বেশ কম।
এই গবেষণার সহ-লেখক ও নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হ্যারিসন গার্সিয়া জানান, শিকাগোর বৃক্ষহীন রাস্তাগুলোতে হেঁটে হাঁপিয়ে ওঠার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই তাকে এই গবেষণায় অনুপ্রাণিত করেছিল। গবেষকরা হিসাব করে দেখেছেন যে, শহরে বর্তমানে যেভাবে বছরে ১৪ হাজার করে গাছ লাগানো হচ্ছে, তাতে ক্যানোপি প্রতি বছর মাত্র ০.০৩ শতাংশ করে বাড়লেও বছরে অন্তত ১০৫ জন মানুষের অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব।
তবে পোর্টল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শান্দাস মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি নতুন রোপণ করা চারা গাছ কখনোই একটি পুরোনো প্রবীণ গাছের মতো রাতারাতি বিশাল ছায়া বা সুরক্ষা দিতে পারে না। পূর্বে পরিচালিত গবেষণাতেও দেখা গেছে যে, রোপণ করা নতুন গাছগুলো যত বড় ও প্রবীণ হয়, মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষমতা তত বৃদ্ধি পায়। সব মিলিয়ে গবেষণার মূল বার্তাটি এক চূড়ান্ত সত্যের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছে, শহরে কেবল নতুন চারা রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং মানুষের জীবন বাঁচাতে হলে বছরের পর বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ও বয়স্ক গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স
ইউডি/কেএস

