অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে নীলফামারীর হিমাগারের আলু নিয়ে শঙ্কা

অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে নীলফামারীর হিমাগারের আলু নিয়ে শঙ্কা

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৬:১০

তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন নীলফামারীর হিমাগার মালিকরা। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর জেনারেটর চালিয়ে হিমাগারের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে জেলার ১১টি হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় ৭৭ হাজার মেট্রিক টন আলু নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে সংরক্ষণ করা প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন বীজ আলু নষ্ট হলে আগামী মৌসুমে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা।

তাদের দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু সংরক্ষিত আলু নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিই বাড়বে না, পরবর্তী মৌসুমে ভালো মানের বীজের সংকটও দেখা দিতে পারে।

সারি সারি আলুর বস্তা। হিমাগারের ভেতরে শীতল পরিবেশ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন কর্মীরা। সংরক্ষিত আলু ভালো রাখতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। আর সেই তাপমাত্রা ধরে রাখতে হিমাগারে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। তবে কয়েক দিন ধরে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে হিমাগারগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম।

বিদ্যুৎ চলে গেলেই চালু করতে হচ্ছে জেনারেটর। এতে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। একই সঙ্গে বাইরে তাপমাত্রা বেশি থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর হিমাগারের কক্ষগুলো আবার কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রায় আনতে বেশি সময় লাগছে।

এ বিষয়ে অংকুর হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুফি হায়দার বলেন, হিমাগারের বিভিন্ন মেশিন নির্দিষ্ট সময় ধরে চালাতে হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

তিনি বলেন, মেশিন চালু করার পর মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো কাজটি নষ্ট হয়ে যায়। পরে আবার শুরু থেকে কাজ করতে হয়। এতে বিদ্যুৎ বিল ও শ্রম দুটিই অপচয় হয়। আর দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালিয়ে এই খরচ পুষিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

হিমাগার মালিকদের পাশাপাশি উদ্বেগে রয়েছেন কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরাও। কারণ, বাড়তি উৎপাদন খরচের পর ভবিষ্যৎ মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করা বীজ আলু নষ্ট হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে তাদের।

কৃষক জাহিদুল ইসলাম পরবর্তী মৌসুমে জমিতে রোপণের জন্য হিমাগারে বীজ আলু সংরক্ষণ করেছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, পরবর্তী বছর জমিতে রোপণের জন্য হিমাগারে আলু রেখেছি। কিন্তু বিদ্যুতের যে অবস্থা, শুনছি অনেকের আলু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার আলু কী অবস্থায় আছে, কে জানে। যদি বীজ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে পরের মৌসুমে সেই বীজ দিয়ে ভালো ফসল পাওয়া কঠিন হবে। আমরা চাই হিমাগারগুলোতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হোক, যাতে আমাদের বীজ নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায়।’

আরেক কৃষক রশিদুল ইসলাম বলেন, দিনের অর্ধেক সময় এখানে বিদ্যুৎ থাকে না। হিমাগার মালিকরাও জেনারেটর দিয়ে যথেষ্ট চেষ্টা করছেন। কিন্তু জেনারেটর দিয়ে সব মেশিনের পুরো লোড নেওয়া সম্ভব হয় না বলে আমাদের জানান হিমাগারের লোক। আলু নষ্ট হলে এই দায়ভার কে নেবে? বিপদে পড়ব আমরা সাধারণ মানুষ। এখন আল্লাহর ওপর ভরসা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারীতে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ঘাটতির কারণেই জেলায় বাড়ছে লোডশেডিং। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা যখন বেড়েছে, তখন সরবরাহের ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ নির্ভর হিমাগারগুলোর ওপর।

বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে হিমাগারগুলোতে জেনারেটর চালানো হলেও এতে ব্যয় বাড়ছে কয়েক গুণ। এর সঙ্গে তীব্র গরমে হিমাগারের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে মেশিনগুলোকে অতিরিক্ত সময় চালাতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে উত্তরা হিমাগার নীলফামারীর ব্যবস্থাপক দীপু রায় বলেন, বর্তমান আবহাওয়া অনেক গরম। গরমের কারণে এমনিতেই হিমাগারের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। ফলে মেশিনগুলো বেশি সময় চালাতে হয়। এর মধ্যে মাঝপথে লোডশেডিং হলে পুরো পরিশ্রম বৃথা যায়।

তিনি বলেন, একটি রুম ঠান্ডা করতে যদি এক ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে ৩০ মিনিট মেশিন চলার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে আবার শুরু থেকে হিসাব করতে হয়। এতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ হয়। আর জেনারেটর ব্যবহার করলে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।

হিমাগার ব্যবস্থাপক আরও বলেন, আমাদের ওপর ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ আসে। কিন্তু সরকারকেও আমাদের দিকটা দেখতে হবে। বিদ্যুৎ সংকটে পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আমরা চাই হিমাগারগুলোতে সঠিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হোক। এতে হিমাগার মালিকরা যেমন ক্ষতি থেকে বাঁচবেন, তেমনি কৃষকরাও নিরাপদে তাদের আলু সংরক্ষণ করতে পারবেন।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading