জলবিদ্যুৎনির্ভর নেপালে বন্যার ভয়াবহ আঘাত, ঝুঁকিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৩:৩৫
নেপালের বিদ্যুতের প্রায় ১০০ শতাংশই আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। দেশটি প্রয়োজনের তুলনায় এত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যে, ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ রপ্তানি করে বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার (১৪৭ মিলিয়ন পাউন্ড) আয় করে।
তবে যে হিমবাহ ও পর্বতমালা নেপালকে এই বিপুল প্রাকৃতিক সুবিধা দিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সেগুলোই এখন হুমকির মুখে। আর গত বুধবারের ভয়াবহ বন্যা দেশটির জলবিদ্যুৎনির্ভর উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঝুঁকিগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে।
বন্যায় ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ।
নেপাল এবং তিব্বতের বর্ডার তীরবর্তী সমস্ত গ্রামকেই ধ্বংস করে দিয়েছে এই বন্যা। ২০১০ সালে নেপালের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের বিদ্যুৎ সুবিধা ছিল এবং বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা পরিবারগুলোকেও দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হতে হতো।
জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর সম্প্রসারণের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন এবং মৌসুমি বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় ইন্ডিয়া থেকে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় নেপাল। এসব পদক্ষেপের ফলে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশটির অধিকাংশ এলাকায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (এনইএ) বলছে, দেশের জলবিদ্যুৎ কৌশল পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে জলাধারভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। এসব কেন্দ্র পাহাড়ের উঁচু এলাকায় স্থাপনের প্রয়োজন নেই।
জলাধারভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সংরক্ষণ ও ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যয় রয়েছে।
নেপাল জলবিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে কি না, তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘উইন্ডপাওয়ার নেপাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষজ্ঞ কুশল গুরুং বলেন, ‘এমন ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে আমাদের সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা (অর্থাৎ সবকিছুর জন্য একটিমাত্র উৎসের ওপর নির্ভর করা) উচিত নয়।” তিনি আরও বলেন, “সৌর ও বায়ুশক্তির মতো অন্যান্য বিকল্পকেও আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। আর এ জন্য আমাদের বর্তমান জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যা এখন মূলত জলবিদ্যুৎ-কেন্দ্রিক।’
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি’-র গবেষক বিবেক শাস্ত্রীও একই মত পোষণ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, ‘বায়ু ও সৌরশক্তি থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদন এমন একটি কৌশল যা ভবিষ্যতে একক কোনো উৎস বা আন্তঃসংযুক্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় বা অচলবস্থা সৃষ্টির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।
জার্মান সহায়তা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নেপালে সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জলবিদ্যুতের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে দেশটির প্রতিনিধি দলের সদস্য মনজিৎ ঢাকাল মনে করেন, এ ধ্বংসযজ্ঞ প্রমাণ করে যে জলবায়ু-সংক্রান্ত এই দুর্যোগ বৈশ্বিক এবং নেপাল একা তা সামাল দিতে পারবে না।
তিনি বলেন, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে এবং যৌথভাবে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মনজিৎ ঢাকাল আরও বলেন, ‘যেসব গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণের কারণে এসব ঝুঁকি আরও তীব্র হয়েছে, সেসব নিঃসরণে নেপালের দায় সবচেয়ে কম। বিষয়টি অনেকটা বিদ্রূপের মতো—আমাদের জলবিদ্যুৎ খাত মূলত দেশের এমনিতেই কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আরও কমানোর একটি প্রচেষ্টা। এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলার দায় নেপালের একার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না, এবং তা করা উচিতও নয়।’
সূত্র: বিবিসি
ইউডি/রেজা

