থাইল্যান্ডে প্রথমবারের মতো ক্যন্সারের ভ্যাক্সিন নিলেন ২ বিদেশি

থাইল্যান্ডে প্রথমবারের মতো ক্যন্সারের ভ্যাক্সিন নিলেন ২ বিদেশি

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৪:৩১

থাইল্যান্ডের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় দুই বিদেশি রোগী প্রথমবারের মতো পার্সোনালাইজড (ব্যক্তিভিত্তিক) ক্যানসার ভ্যাকসিনের চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। তবে এই চিকিৎসার এক বছরের কোর্স অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যার খরচ প্রায় ৪ থেকে ৭ মিলিয়ন বাথ।

থাইল্যান্ডের গভর্মেন্ট ফার্মাসিউটিক্যাল অর্গানাইজেশন (জিপিও)-এর পরিচালক ড. মিংকওয়ান সুফানফং সম্প্রতি এই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই সেবা সম্প্রসারিত হলে সাধারণ থাই রোগীদের জন্য এই চিকিৎসা অনেক সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে।

ড. মিংকওয়ান সংবাদমাধ্যমকে জানান, অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুই বাসিন্দা চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালের যৌথ গবেষণা ও চিকিৎসাসেবা প্রকল্পের অধীনে এই চিকিৎসা নিয়েছেন।

বর্তমানে উচ্চবিত্তদের লক্ষ্য করে এই চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে এবং একই সাথে রোগীদের কেস স্টাডি সংগ্রহ করা হচ্ছে।

জিপিও, সিককার বায়োসায়েন্সেস ইনকর্পোরেটেড এবং চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের যৌথ উদ্যোগে এই বিশেষ ভ্যাকসিনটি তৈরি করছে।

থাইল্যান্ডে প্রিসিশন মেডিসিন এবং ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বরে জিপিও এবং সিককারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।

ড. মিংকওয়ান জানিয়েছেন, প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে এবং রাজাভিথি হাসপাতালের মতো সরকারি হাসপাতালগুলোতে এর পরিধি বাড়ানো সম্ভব হলে চিকিৎসার খরচ ১ মিলিয়ন বাথ (৪০ লাখ টাকা) নিচে নেমে আসতে পারে।

বেসরকারি হাসপাতালের বিলাসবহুল আবাসন ও আতিথেয়তার খরচ কমিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দিলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। বর্তমানে এক বছরের কোর্সে মোট চারবার এই ভ্যাকসিন নিতে হয়, যার খরচ ৪-৭ মিলিয়ন বাথ (দেড় থেকে আড়াই কোটি টাকা)।

ড. মিংকওয়ান বলেন, এই খরচ বিদেশে চিকিৎসার চেয়ে অনেক কম হলেও সাধারণ থাই নাগরিকদের জন্য তা এখনও অনেক বেশি। কারণ তাদের কাছে এর চেয়ে কম খরচের বিকল্প চিকিৎসা রয়েছে। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে এই ভ্যাকসিনের কোনো রোগী নেই, কারণ এটি এখনো সরকারি স্বাস্থ্য সুবিধার (বেনিফিট প্যাকেজ) অন্তর্ভুক্ত নয় এবং রোগীদের সম্পূর্ণ খরচ নিজেদের বহন করতে হয়।

দুই বিদেশি রোগী মূলত তাদের নিজেদের দেশের চেয়ে খরচ কম হওয়ায় থাইল্যান্ডের বেসরকারি হাসপাতালে এই চিকিৎসা বেছে নিয়েছেন।

এই পার্সোনালাইজড ভ্যাকসিনটি মূলত রোগীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে (ইমিউন সিস্টেম) উদ্দীপিত করে শরীরের ক্যানসার কোষগুলোকে সঠিকভাবে চিনে আক্রমণ করতে সাহায্য করে। এটি কোনো প্রতিরোধমূলক প্রতিষেধক নয়, বরং আক্রান্ত রোগীদের প্রচলিত ক্যানসার ওষুধের পাশাপাশি এটি ব্যবহার করতে হয়।

এই ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। প্রথমে রোগীর টিউমারের নমুনার জেনেটিক সিকোয়েন্সিং করে এর অস্বাভাবিকতা এবং প্রোটিন তৈরির ওপর এর প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট জিন বা প্রোটিন চিহ্নিত করে কৃত্রিমভাবে প্রোটিন সংশ্লেষণ করা হয়, যা কেবল ওই নির্দিষ্ট রোগীর টিউমারের বিরুদ্ধে কাজ করবে।

ফুসফুসের ক্যানসারের উদাহরণ দিয়ে ড. মিংকওয়ান জানান, একই ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও বিভিন্ন রোগীর জেনেটিক পরিবর্তন ভিন্ন হতে পারে। তাই সবার জন্য একই ওষুধ না বানিয়ে প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে এটি তৈরি করতে হয়। আন্তর্জাতিকভাবে ত্বক, কিডনি, ফুসফুস এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসায় এই ভ্যাকসিনের ওপর গবেষণা চলছে। থাইল্যান্ডে স্তন, পাকস্থলী এবং কোলোরেক্টাল ক্যানসার রোগীদের ওপর মানব ট্রায়াল চালানো হচ্ছে।

ইউরোপ বা আমেরিকার তুলনায় থাইল্যান্ডে এই চিকিৎসার খরচ প্রায় ৪ থেকে ৫ গুণ কম হতে পারে। পরবর্তী পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদী ভিসা গবেষণার বর্তমান ধাপে প্রায় ৭ থেকে ১০ জন রোগীর ওপর নজর রাখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হয়েছে এবং এটি বর্তমানে তৃতীয় বা চতুর্থ ধাপে রয়েছে।

ড. মিংকওয়ান আশা করছেন, ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে এই গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া যাবে। তিনি আরও জানান, তৃতীয় একজন রোগী এই চিকিৎসা পাওয়ার পর তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে বিদেশি রোগীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী মেডিকেল ভিসার আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন। যেহেতু বছরে ৪ থেকে ৭ বার এই ভ্যাকসিন নিতে থাইল্যান্ডে আসতে হয়, তাই দীর্ঘমেয়াদী ভিসা থাকলে রোগীদের বারবার যাতায়াত করতে হবে না।

চিকিৎসাসেবা খাতকে আরও এগিয়ে নিতে এবং থাইল্যান্ডকে একটি আন্তর্জাতিক মেডিকেল হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাংককের বাইরে ফুকেটকে একটি পাইলট বা ‘স্যান্ডবক্স’ এলাকা করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যেখানে রোগীরা অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে পারবেন।

ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ব্যাংককের রামা ৬ রোডে অবস্থিত জিপিও-এর মূল কেন্দ্রটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে জরুরি ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে রোগীদের কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছানো যায়। ফুকেটের মতো দূরবর্তী স্থানে অভ্যন্তরীণ বিমান ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৩ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে ড. মিংকওয়ান জানান। আগ্রহী রোগীদের এই প্রকল্পে অংশ নিতে হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading