আলিফ লাইলা-১৩: আবরারের গণখুন এবং র‌্যাংকিং-এর মৃগতৃষ্ণিকা

আলিফ লাইলা-১৩: আবরারের গণখুন এবং র‌্যাংকিং-এর মৃগতৃষ্ণিকা

[পূর্বকথা: হিন্দুস্তানের বদমেজাজি বাদশাহ শাহরিয়ার তথাকথিত চরিত্রহীনা এক বেগমের পরকীয়ায় যারপরনাই নারাজ হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন যে প্রতি রাতে তিনি এক যুবতীকে নিকাহ-এ-মুতা করবেন এবং ভোর হলেই এক রাতের সেই বেগমকে কতল করবেন। কয়েক বৎসরে শত শত যুবতী বেঘোরে ইন্তেকাল ফরমালে ক্ষুরধার বুদ্ধিমতী উজিরকন্যা শেহেরজাদি করুণাপরবশ হয়ে ছোটবোন দিনারজাদির সঙ্গে সল্লা করে বাদশা শাহরিয়ারকে নিকাহের প্রস্তাব দেন। জীবনের শেষ রাত্রিতে শেহেরজাদির আবদার রাখতে বাসরঘরে ডেকে আনা হয় শ্যালিকা দিনারজাদিকে। রাত গভীর হলে দিনারজাদি পূর্বপরিকল্পনামাফিক শেহেরজাদিকে বাংলাদেশের বিবিধ সমস্যা নিয়ে একেকটি সওয়াল করতে শুরু করেন এবং শেহেরজাদিও কালবিলম্ব না করে সওয়ালের জওয়াব বাৎলাতে শুরু করেন। প্রথম কয়েক রাত্রিতে সওয়াল-জওয়াবের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং। কিন্তু গত ছয় রাত্রি ধরে ‘রবীন্দ্রনাথ বনাম বাঙালি মুসলমান’ কিংবা ‘শাড়ি’-র প্রসঙ্গ এসে র‌্যাংকিং-এর কথা চাপা পড়ে গিয়েছিল। আজ ত্রয়োদশ রাত্রির সওয়াল-জওয়াবে বিশেষত সহপাঠীদের হাতে বুয়েটছাত্র আবরার গণখুন হবার পরিপ্রেক্ষিতে আবার উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ।]

‘দিদি, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটা কি কোনো সমাধান হলো?’ এটা মোটেও ভালো সমাধান নয়, প্রিয় দিনারজাদি। তবে ভয় নেই, এটা আই-ওয়াশ মাত্র। রাজনীতি নিষিদ্ধ করা অসম্ভব। যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন রাজনীতিও থাকবে, কীভাবে, কোন আকারে থাকবে সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। রাজনীতিহীন সমাজ কিংবা জীবন হয় না। রাজনীতি ফেনসিডিলের মতো, প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ হলে গোপনে কণ্ঠস্থ হবে। রাজনীতি হচ্ছে আমার দিক থেকে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। অন্যের দিক থেকে আমাকে অধিকারবঞ্চিত করার চেষ্টা। এই টানাপোড়েনের প্রক্রিয়া বন্ধ করার চেষ্টা করলে নিজের পায়ে কুড়াল মারা হয়।

রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও মানুষ গুন্ডামিতে সিদ্ধ হতে থাকবে। ছাত্র রাজনীতি নয়, মূলত ‘স্বার্থরাজনীতি’ বন্ধ করতে হবে। স্বার্থলীগ, স্বার্থদল, স্বার্থশিবির, স্বার্থমৈত্রী, স্বার্থ ইউনিয়ন গংকে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। হায়! রাজনীতি আর প্রশাসন সমর্থিত গুন্ডামিকে একাকার করে দিয়ে বুয়েটে রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হলো। সবাই শক্তের ভক্ত নরমের যম। রোগ নয়, ঔষধটাকেই নির্মূল করা হলো এবং দাবিটা আসলো সাধারণ ছাত্রদের পক্ষ থেকেই। প্রশাসন যেমন তাল দেয়, ছাগলও তেমন ফাল দেয়।

বাংলাদেশের প্রথম সমস্যা কি জানো দিনারজাদি? এই পোড়া দেশে কোনো নায়ক নেই। এ জাতির প্রথম এবং শেষ নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। দেখো, আবরার যখন মৃত্যুপথযাত্রী, তাকে বাঁচানোর জন্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। কেউ ফোন করে পুলিশ কিংবা প্রশাসনকে খবরটা পর্যন্ত দেয়নি, অথচ সবার হাতে হাতে মুঠোফোন! বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমস্যা: ভুল লোককে ভিলেন মনে করা। আবরারের গণখুনের জন্য দায়ী কে? ভিসি? প্রভোস্ট, প্রক্টর? এরা প্রত্যেকে ক্ষমতার কবলে অসহায়, অথর্ব। এদের কেউ পাত্তা দেয়? ছাগল নাচে খুঁটির জোরে। যে খুঁটির জোরে নেচে ছাগলেরা এই অথর্বগুলোকে পাত্তাই দেয় না সেই খুঁটিই বিচারকের ভূমিকায়। দারুণ এক গোলক ধাঁধা। যে মূল অপরাধী, সেই প্রধান বিচারক। সুতরাং কিছুতেই কিছু হয় না। একই অপরাধ বার বার সংঘটিত হয়।

একাধিক অভ্যুত্থান, দুই দুই জন রাষ্ট্রপতি খুন হওয়া সত্তেও প্রতিরক্ষা বাহিনী বহাল তবিয়তে ছিল। অথচ একটিমাত্র বিদ্রোহে বাতিল হয়েছিল সীমান্ত রক্ষা বাহিনী। একেই বলে, এক যাত্রায় পৃথক ফল। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা যাবে না, বুঝলাম। ছাত্রলীগ কি নিষিদ্ধ হতে পারে? এক কাজের বুয়া একবার মোঘল আমলের এক হুকা সাফ করতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছিল বলে বাড়ির আপা রাগারাগি শুরু করলে বুয়া উত্তর দিয়েছিল: ‘আগে কইবেনতো আফা, ফুরান জিনিস!’ যারা এখনও ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছেন না, তারা নিশ্চয়ই এই সংগঠনটির পুরাতাত্ত্বিক মূল্যের কথাই ভাবছেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading