দুর্নীতি বিরোধী অভিযান আইওয়াশ নয়, আপন-পর দেখছি নাঃ প্রধানমন্ত্রী

দুর্নীতি বিরোধী অভিযান আইওয়াশ নয়, আপন-পর দেখছি নাঃ প্রধানমন্ত্রী

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২৯ অক্টোবর ২০১৯ । ১৯ঃ০২ । আপডেট ২০ঃ৫৩

খালেদা-তারেক শাস্তি পেয়েছেন অন্যরাও পাবে

উত্তরদক্ষিণ ষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মূল দুর্নীতিবাজদের দুজন তো শাস্তি পেয়েই গেছেন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান। তাদের আরও কিছু খুচরা নেতা আছে। দুর্নীতি, অগ্নিসন্ত্রাস, মানুষ খুন বহু অপরাধে অপরাধী এই নেতাদেরও সাজা পেতে হবে। ১৮তম জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনের (ন্যাম) অভিজ্ঞতা জানাতে গতকাল মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান এসব কথা বলেন। চলমান শুদ্ধি অভিযান নিয়ে বিএনপির সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অপেক্ষা করলেই বোঝা যাবে এই অভিযান ‘লোকদেখানো’ কি না। পর্যায়ক্রমে সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, দুর্নীতিতে বিএনপির শীর্ষ নেতারা দণ্ডিত হয়েছেন, এখন তাদের ‘খুচরা নেতাদেরও’ সাজা পেতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন তিনি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যুবলীগ নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে ঢাকার বিভিন্ন ক্রীড়া ক্লাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। সেই অভিযানে ক্লাবগুলোতে অবৈধভাবে ক্যাসিনা পরিচালনায় যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সম্পৃক্ততার তথ্য বেরিয়ে আসে। জুয়া ছাড়াও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে যুবলীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা ছাড়াও বিভিন্ন ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, ব্যাংক হিসাব জব্দ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্নোত্তরে এক সাংবাদিক বলেন, বিএনপি এ অভিযানকে ‘আইওয়াশ’ বলছে এবং সরকার পদত্যাগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে বলে তারা দাবি করছে। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এটাকে আইওয়াশ তারা বলে যাচ্ছে। ঠিক আছে দেখেন, অপেক্ষা করেন। আইওয়াশ না কি তা দেখা যাবে। এখানে আইওয়াশ করতে যাব কেন? আমি তো কোনও আপন-পর কিছু দেখিনি। যারা অপরাধী চক্রের সাথে সম্পৃক্ত সে যে-ই আমরা তাকে ধরছি। ওই সব আইওয়াশের ব্যবসা বিএনপি ভালো জানে।”

Image may contain: 3 people

শেখ হাসিনা বলেন, “কিন্তু এই দেশটাকে দুর্নীতিতে নিয়ে আসা এটাতো বিএনপিরই করা। জিয়াউর রহমানের সময় শুরু, এরশাদ এক ধাপ উপরে এবং এরপর খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় আসল তখন দোকান খুলে বসল। এদিকে হাওয়া ভবন, ওদিকে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে উন্নয়ন উইং। উন্নয়ন মানে হল ঘুষ খাওয়ার উইং। অন্তত আমরা সরকারে আসার পরে তো এই সব হয়নি।” বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের মতো বিএনপির ‘কিছু খুচরো’ নেতাকেও শাস্তি পেতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “যারা আসল দুর্নীতিবাজ তার দুইটাতো শাস্তি পেয়েই গেছে। খালেদা জিয়া আর তার ছেলে- এই দুইটাতো আগেই শাস্তি পেয়ে গেছে। এবং তাদের আরও কিছু খুচরা নেতা আছে। তাদেরও দুর্নীতি, অগ্নিসন্ত্রাস, মানুষ খুন বহু অপরাধে তারা অপরাধী। পর্যায়ক্রমে সবগুলোই শাস্তি পাবে। সাজা তাদেরও পেতে হবে। তাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু পাবে তারা। এতে কোনও সন্দেহ নাই।”

এক পত্রিকার সম্পাদক ফোন করে টাকা চায়, নইলে…

Image may contain: 1 person, sitting

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন ১০০ জনের তালিকা আপনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে দিয়েছেন ব্যবস্থা নিতে। এ রকম আর কতজনের তালিকা আপনার হাতে আছে? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কতজনের তালিকা আছে, সেটা কেন আমি বলব এখন। তবে এটুকু বলতে পারি, কোনও এক পত্রিকার সম্পাদক কোনও এক ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে ফোন করে বলেছে যে, কিছু একটা টাকা চায়। সেটা যদি না দেওয়া হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে এমন লেখা লিখবে যে তার জীবনটাই ধ্বংস করে দেবে। সে নামটা নিশ্চয়ই শুনতে চাইবেন না এখন। সেটা বের হোক তারপরে জানবেন। ব্যাংকের এমডিকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে, চেয়ারম্যানকে বলতে যে, কত দিতে হবে। না দিলে তার বিরুদ্ধে লেগে যাবে। নামটাম সবই আছে। রেকর্ডও আছে।”

ভয়! ওই শব্দটা আমার ডিকশনারিতে নাই

একাদশ সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জোট শরিক দলের নেতা রাশেদ খান মেননের বক্তব্য ধরে বিএনপি নেতারা সরকারকে ‘জুজুর ভয়’ দেখাচ্ছেন মন্তব্য করে এক সাংবাদিক জানতে চান, এতে প্রধানমন্ত্রী ভয় পাচ্ছেন কি না। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “ভয় শব্দটা আমার নেই। ছোটবেলা থেকেই নেই। আর ভয় পাওয়া লোক আমি না। আর ভয় পেলে এই অভিযানে আমি নামতাম না। আর আমি যখন এখানে নেমেছি তখন কে কী করে, কোন দলের, কোন জায়গার সেটা আমার কাছে বিবেচ্য বিষয় না। বরং আমি তো আগেই বলেছি, শুরু করলে ঘর থেকেই করতে হয়। নয়ত বলবেন যে, রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য আমরা করছি। তাতো না। আর যে দলের কথা বললেন, কথা বলছে। তারা আর কী বলবে? তারাতো দুর্নীতির খনি,” বিএনপির নাম উল্লেখ ননা করে বলেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে ওই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত ও নিষ্কন্টক করার জন্য বাংলাদেশে দুর্নীতির ‘দুয়ার খুলে দেওয়া হয়েছিল’। “এটা শুরু করেছিল জিয়াউর রহমান। আর তার হাতে গড়া দল। আপনারা দেখেন, সেখানে যারা আছে, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলাতো আছেই। হত্যা, খুন, দুর্নীতি এমন ধরনের কোনও কাজ নেই যা নাই। সেই দলের নেতা ‍যিনি চেয়ারপারসন, তিনি দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত, কারাগারে।” বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দুর্নীতি, অর্থপাচার ও একুশ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বিদেশে রয়েছেন।

Image may contain: 4 people, people smiling, people sitting, people standing and indoor

শেখ হাসিনা বলেন, “তো তাদের মুখে আবার এত কথা আসে কোত্থেকে, আমার সেটাই প্রশ্ন। তাদের মুখে এত কথা আসে কোত্থেকে? কোন সাহসে এ কথা বলে, যারা এতিমের সামান্য টাকার লোভ সামলাতে পারে না? তাদের মুখে এত কথা শোনার তো আমার দরকার নাই। যাদের আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ভরা, যারা খুনি, এদের মতো একটা খুনি, দুর্নীতিবাজ।” প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আর ভয় ওই শব্দটা আমার ডিকশনারিতে নাই। এটা আমি বলতে পারি।” সমালোচনার জবাব দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে নাকি দেশ বেঁচে দেবে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে নাকি দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন দেখা গেল উল্টো। দেশের উন্নয়ন করলে আওয়ামী লীগই করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর যে সম্মান পেয়েছিল, যে সম্মান হারিয়ে গিয়েছিল ’৭৫ এর ১৫ অগাস্টের পর; বাংলাদেশ আবার সেই সম্মানটা ফিরে পেয়েছে।”

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনা: বিদেশে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তরে তিনি বলেন, “জাতির পিতার কয়েকজন খুনি বিদেশে আছে। আমেরিকায় একজন আছে। আমেরিকার সাথে কথা বলছি। নূর আছে কাডানায়। তার ব্যাপারেও আমরা আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আর কে কোথায় আছে সেটার তথ্য আমরা নেওয়ার চেষ্টা করছি, তাদেরকে কীভাবে দেশে আনা যায়।”

Image may contain: 12 people, people smiling

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দুইজনকে আমরা আনতে পেরেছিলাম। হুদা, তাকে আমরা নিয়ে এসেছিলাম থাইল্যান্ড থেকে। মহিউদ্দিনকে এনেছিলাম আমেরিকা থেকে। বাকিরা তো লুকিয়েই আছে। কিছু কিছু ট্রেস আমরা করতে পারছি। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। দেখা যাক।” বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি। বাকিদের একজন মারা গেলেও রাশেদ চৌধুরীসহ অন্যরা বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছেন। পঁচাত্তরে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পালিয়ে যাওয়া নূর চৌধুরী কানাডার টরন্টোতে রয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে বিচারে ফাঁসির রায় হয়। বাংলাদেশের আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা রাশেদ চৌধুরী ১৯৯৬ সালে পর্যটক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে সেখানে রয়েছেন। বিভিন্ন দেশের মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “একটা সমস্যা হয়ে গিয়েছে। যেহেতু তাদের মৃত্যুদণ্ড। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিরুদ্ধে। ওই ছুতো ধরে এরা অনেকেইৃ নূরতো ওইটা ধরে ধরেই থেকে যাচ্ছে। এটা তাদের কোর্টের উপর নির্ভর করে। আমি তাদের প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর সাথে কথা বলেছিলাম। তারা সবাই চায়, কিন্তু তারা তাদের কোর্টের রায়টার উপর নির্ভর করে, এখানেই সমস্যাটা। আমি আশাবাদী হয়ত আর কয়েকজনকে আমরা নিয়ে আসতে পারব।”

ক্যাসিনোকাণ্ডে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

দেশে যেখানে এক হাজারের বেশি সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে, ৩২টির বেশি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চলছে, বাংলাদেশে এভাবে ক্যাসিনো বসিয়ে জুয়ার আসর চলার খবর কেন কেউ আগে প্রকাশ করল না- সেই প্রশ্ন রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনের অভিজ্ঞতা জানাতে গতকাল মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এই প্রশ্ন রাখেন সরকারপ্রধান। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সামনে রেখে তিনি বলেন, ‘আপনারা এত খবর রাখেন, তো এরকম আধুনিক আধুনিক সমস্ত যন্ত্রপাতি এসে গেছে, এত কিছু হল, আপনারা কেউ খবর রাখলেন না? কেউ খবর পেলেন না? কোনোদিন কেউ তো নিউজ করলেন না। কীভাবে হয়?’

Image may contain: 12 people

ক্রিকেটারদের আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে লোকমানের প্রসঙ্গ টেনে একজন সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বোর্ডে একজন ‘ক্যাসিনোবাজ’ ঢুকে পড়েছেন, এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। বোর্ড ‘প্রপারলি ফাংশন’ করছে কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে।

Image may contain: 11 people, people sitting

উত্তর দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্রিকেটারদের আন্দোলনের সঙ্গে ক্যাসিনো টেনে আনা ঠিক হচ্ছে না। ‘এই কাসিনো খেলার সাথে কে জড়িত- এটা তো ক্রিকেট বোর্ডের বিষয় না। হয়ত এখানে একজন ছিল। সে রকম তো আপনাদের সাংবাদিক মহলেও যদি খোঁজ করা যায়, অনেককে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে যদি খুঁজে পাওয়া যায় তো কী করব আমি? সেটাও তো আপনাদের ভাবতে হবে।

নুসরাত কিছুতেই নত হয়নি, অত্যন্ত সাহসী

যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় নিজ মাদরাসার অধ্যক্ষের প্রতিহিংসার বলি হয়ে আগুনে প্রাণ দেওয়া নুসরাত জাহান রাফিকে ‘অত্যন্ত সাহসী’ বলে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, নুসরাত অত্যন্ত সাহসী মেয়ে। সে জীবন দিয়ে গেছে, কিন্তু অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখে গেছে। সে কোনোকিছুতেই নত হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন মামলার বিচার হচ্ছে। নুসরাত হত্যা দ্রুতবিচারের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই বিচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা যেটা ছিল, নুসরাত নিজেই জবানবন্দি দিতে পেরেছিল। যেকোনো হত্যা মামলার ক্ষেত্রে চাক্ষুস সাক্ষী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সাক্ষীর অভাবে মামলায় অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া যায় না, কিছু ঝামেলা হয় এটা ঠিক। তবে নুসরাত হত্যা মামলার ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি।

Image may contain: 17 people, people sitting

নুসরাত হত্যায় গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, নুসরাত হত্যা মামলার ক্ষেত্রে জনমতও তৈরি হয়েছিল দেশব্যাপী। আপনাদেরও (গণমাধ্যম) বড় ভূমিকা ছিল। আপনাদের কারণে অপরাধীদের চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে অনেক কাজই দ্রুত করা সম্ভব হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে সাহসী মেয়ে নুসরাত হত্যার মামলার রায় দ্রুত দেওয়া গেছে। এটি দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে। পাশাপাশি অন্য মামলাগুলোতেও যেন দ্রুতবিচার হয়, সে ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বিচার বিভাগকে মামলার আধিক্যে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পর মামলার পরিমাণ বেড়েছে, মামলা জট তৈরি হয়েছে। আগে তো অনেক মামলাই ম্যাজিস্ট্রেসি কোর্টে (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) শেষ হয়ে যেত। এখন সব মামলাই বিচার বিভাগে নিষ্পত্তি হতে হয়। ফলে মামলার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এখন বিচার বিভাগ বিচারাধীন মামলার পরিমাণও শেষ করতে পারছেন

নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুললে ‘তার জয়ও প্রশ্নবিদ্ধ’ হয়

সম্প্রতি বরিশালে গিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির এক অনুষ্ঠানে একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এরপরও আওয়ামী লীগের নির্বাচনি জোট ১৪ দল তার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হওয়ায় এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এক সাংবাদিক। তার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুললে ১৪ দলীয় জোটের ওই নেতাও বিতর্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমাদের জোটের নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, তার মনে তো কষ্ট থাকতেই পারে। তিনি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুললে, তিনিও তো বিতর্কিত হয়ে যান। এ বিষয়ে জোটের মুখপাত্র নাসিম সাহেব আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে আমি বলেছি, এ বিষয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই। গতকাল মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) গণভবনে আজারবাইজান সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

Image may contain: 8 people

 বিকাল ৪ টায় এ সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। শেখ হাসিনা বলেন, জনগণ যদি ভোট না দিত, আমাদের পক্ষে না থাকতো, তাহলে আমাদের সমর্থন থাকতো না। তাদের (বিএনপি) ভোটবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে আমরা গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। আমাদের জনসমর্থন ছিল। এবারের নির্বাচনের পর জনগণ, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষ আমাদের সমর্থন দিয়েছেন। শুধু আওয়ামী লীগের না, বিএনপির ব্যবসায়ীরাও আমাদের সমর্থন দিয়েছেন। কারণ আমরা সবার কাজ করার সুযোগ করে দিতে পেরেছি। ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন সম্প্রতি বরিশালের এক জনসভায় বলেছেন, ‘একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেননি, আমি সাক্ষী দিচ্ছি।’ এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ছাত্র আন্দোলন থেকে তিনি (রাশেদ খান মেনন) এমন আচরণ করছেন। স্বাধীনতার আগে বলেছেন ভোটের বাক্সে লাথি মারো বাংলাদেশ স্বাধীন করো, পরে ইন্দিরা-মুজিব আমলে স্থল সীমানা চুক্তির সময় বলেছেন বেলুবাড়ি বেচে দিলো, এমন কথা তিনি অনেক বলেছেন। এসবের প্রেক্ষিতে ১৪ দল বসেছে, তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এমন বক্তব্য তিনি হয়তো আরও দেবেন, এতে আমার কোনও মন্তব্য নেই। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমি বাংলাদেশে যেদিন এসেছি, সেদিন থেকেই ভয় নেই। আমার বিরোধীরা বিদেশের মাটিতে স্বক্রিয়, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে আমাকে হত্যা করা হতে পারে। তবে আমি এসবকে ভয় পাই না।

Image may contain: 13 people, people smiling, people sitting

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ দেশের উন্নয়ন করে। আমরা ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়। বাংলাদেশের সম্মান ফিরে এসেছে। ন্যাম সম্মেলনে যাওয়ার পর সবাই বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। সেখানকার প্রবাসীদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা বলেছেন তারা ভালো আছেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে তারা খুশি। তাই কারও কথায় কিছু যায়-আসে না।

আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান জোরদার করেছে

উত্তরদক্ষিণ ষ সামগ্রিক উন্নয়ন ও এসডিজি বাস্তবায়নে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ জনগণের বহুপাক্ষিক ফোরাম ন্যামে’র ভূমিকা অনস্বীকার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এতে অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থানকে জোরদার করেছে। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের অব্যবহিত পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থানকে জোরদার করেছে বলে আমি মনে করি।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে ন্যাম সম্মেলন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তৃতায় এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ন্যাম-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা, বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবদান, পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণে আমাদের অঙ্গীকার, ফিলিস্তিনি জনগণসহ বিশ্বব্যাপী শোষিত মানুষের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।’ ‘এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, রোহিঙ্গা সমস্যাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ন্যামের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের একযোগে কাজ করার বিষয়গুলো বিশ্ববাসীকে অবহিত করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের পাশাপাশি ন্যাম-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, ’যোগ করেন তিনি।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলীয় জোটের জেষ্ঠ্য নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সংবাদ পত্র, সংবাদ সংস্থাসহ গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। গত ২৫ ও ২৬-এ অক্টোবর আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত ‘১৮তম ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে’ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৩ সালে ন্যামে’র সদস্যপদ লাভের পর সে বছরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত ন্যাম-এর ৪র্থ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত নিরপেক্ষতার নীতির অনুসারী হিসেবে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে ন্যাম-এ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৮তম সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন, বলেন প্রধানমন্ত্রী। ন্যাম-এর সাধারণ বিতর্ক পর্বে প্রধানমন্ত্রী ন্যামে’র মুলনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির সামঞ্জস্যের বিষয়টি উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি শোষিত মানুষের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের বিষয়ে ১৯৭৩ সালে ন্যাম-এর ৪র্থ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরেন এবং সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে ন্যামে’র মূলনীতিকে সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সংঘর্ষ পরিহারে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য প্রদানের বিষয়টির উপরও জোর দেন। এছাড়া, একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সম্প্রীতিময় বিশ্ব নির্মাণে একবিংশ শতাব্দীর মূল্যবোধের আলোকে সকলের একযোগে কাজ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি, বিভিন্ন দেশে চলমান সংঘাত নিরসন, এসডিজি বাস্তবায়ন, পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রিকরণ, ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তির বিষয়সমূহ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘সমসাময়িক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ের পাশাপাশি আমি বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্যসহ দারিদ্র্য দূরীকরণ, চিকিত্সা সেবা, নারী উন্নয়ন, লিঙ্গ সমতা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশের অর্জনসমূহ সকলের সামনে তুলে ধরি। বিশেষ করে বাংলাদেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টি উল্লেখপূর্বক আমি সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থা, মাদক-পাচার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সরকারের দৃঢ় অবস্থান তুলে করি। ’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের জন্য প্রধান দুটি চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের শান্তি, নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যাওয়াই যে রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান তা তিনি ন্যাম রাষ্ট্রসমূহের প্রতিনিধিদের সামনেও তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী মূল সম্মেলনের সাইডলাইনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ইরানের প্রেসিডেন্ট, আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ও নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন এবং ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী তাঁর সঙ্গে সৌজন্য স্বাক্ষাত্ করেন। ন্যাম-এ প্রদত্ত ভাষণে ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করা এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি বাংলাদেশের অব্যাহত সমর্থনের জন্য ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এসময় ফিলিস্তিনের হেবরনে অবস্থিত একটি সড়কের নাম বঙ্গবন্ধুর নামে নামকরণ করা হবে বলেও ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ঘোষণা দেন। এছাড়া, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের সঙ্গে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট প্যালেসে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। এসময় বাংলাদেশ ও আজারবাইজানের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী সফরকালে বাকুতে অবস্থিত ‘মারটিয়ার্স লেন’ সমাধিস্থল পরিদর্শন করেন এবং আজারবাইজানে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

SekFaruk

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading