মিরপুরে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৬ শিশু নিহত, আহত ১৪, রূপনগরে শোকের মাতম
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ৩১ অক্টোবর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:১৮
মুহূর্তেই ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে যায় এলাকা: প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
সিলিন্ডারে ‘ত্রুটি’ ছিল: ফায়ার সার্ভিস
রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ছয় শিশু মারা গেছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ১৪ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। আহত পাঁচ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন চিকিত্সক। গতকাল বুধবার (৩০ অক্টোবর) বেলা ৩টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। নিহত ছয় শিশু হলো- ফারজানা (৭), নূপুর (১১), রুবেল (১০), রমজান (৮), শাহিন (৯) ও রিয়া মনি (১০)। এদের মধ্যে সন্ধ্যার পর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় রিয়া মারা যায়। সবার লাশ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যালের মর্গে রাখা হয়েছে। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত শিশুদের মা-বাবাসহ স্বজনদের বুক ফাটা আর্তনাদে প্রতিবেশীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। হঠাত্ এমন হতাহতের ঘটনায় অনেকেই হতবাক। জানা গেছে, মৃত্যু ফারজানার বাবার নাম আবু তালেব, মা নার্গিস বেগম। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলার বাপদার চেউয়াখালী। বিস্ফোরণে নিহত ফারজানার বোন মরিয়মও আহত হয়েছে। সে চিকিত্সাধীন। তারা পাঁচ বোন ও দুই ভাই। ফারজানা বস্তির ব্র্যাক স্কুলে পড়তো। নূপুরের বাবার নাম নূর আলম, মা সুরমা বেগম। গ্রামের বাড়ি ভোলার দুলারহাটের নুরাবাদ। রুবেলের বাবার নাম নূর ইসলাম, মা পারভীন বেগম। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশনে। নিহত রমজানের বাবার নাম বদিউল আলম। তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ফুলবাড়িতে। রমজান মাদ্রাসায় পড়তো। এছাড়া, শাহিনের (৯) বাবার নাম শাহজাহান। ঝিলপাড়া বস্তিতে পরিবারের সঙ্গে থাকতো সে। নিহত রিয়া মনির বাবার নাম মো. মিলন। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার আটপাড়া। নিহত এই ছয় শিশুই পরিবারের সঙ্গে ঝিলপাড় বস্তিতে (ফজর আলী মাদবর বস্তি) থাকতো। তারা সবাই গরীব পরিবারের সন্তান। কারো বাবা রিকশাচালক, কারো মা গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। তাদের দাফনের টাকাও পরিবারের হাতে নেই বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। অনেকে আবার সন্তানের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চান। এজন্য তারা সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।
সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অবস্থানরত রূপনগর থানার পরিদর্শক (অপারেশন্স) মোকাম্মেল হক জানান, পাঁচজনের মরদেহ এসেছিল। চিকিত্সাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এই হাসপাতালে আহত ৭ জনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে তিনজনকে চিকিত্সা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি চারজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঢামেক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ১৪ জনের মধ্যে রয়েছে মিম (৮), সিয়াম (১১), মোস্তাকিন (৮), অজুফা (৭), তানিয়া (৭), জামিলা (৮), সোহেল (২৫), জুয়েল (২৯), জান্নাত (২৫), নেহা (৮), অর্ণব (১০), জনি (৯) ও মোরসালিনা (১০)। তাত্ক্ষণিকভাবে বাকিদের নাম জানা যায়নি। ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আবাসিক চিকিত্সক ডা. আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এখানে ১৪ জন আহত অবস্থায় এসেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। এর মধ্যে ৪-৫ জনের অবস্থা গুরুতর। আমরা তাদের সব ধরনের চিকিত্সা দিচ্ছি।’
সিলিন্ডারের ত্রুটি: সিলিন্ডারে ত্রুটি থাকার কারণেই বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। সংস্থার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা ধারণা করছি সিলিন্ডারের ত্রুটির কারণেই বিস্ফোরণ হয়েছে। তবে তদন্ত ছাড়া বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না। মিরপুর ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন ম্যানেজার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বিকাল সাড়ে ৩টায় ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি। এখানে এসে চার শিশুর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করি। আরেক শিশুর লাশ স্পট থেকে তার পরিবার বস্তিতে নিয়ে যায়। আমরা সেটিও উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বেলুনের গ্যাসের সিলিন্ডারটি এসে আমরা টুকরো টুকরো অবস্থায় দেখতে পাই। যে ভ্যানটির ওপর সিলিন্ডার ছিল, সেটিও বিস্ফোরণে ভেঙে গেছে। সেগুলোর আলামত পুলিশ সংগ্রহ করেছে।’
হঠাত্ কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় চারপাশ: প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের স্বজনরা বলছেন, তারা বিকট একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। এরপরেই কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন ঝালমুড়িওয়ালা হোসেন। তিনি রূপনগরের ১১ নম্বর সড়কের ফজর আলী মাদবরের ছেলে। কামরুল মাদবরের বস্তির সামনে বসে ঝালমুড়ি বিক্রি করছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভ্যানে করে বেলুন নিয়ে আসে এক লোক। মাঝে মাঝে সে আসে। আমার ঝালমুড়ির পাশে এসে দাঁড়ায়, আমি তাকে সরিয়ে দেই। বলেছি দূরে দাঁড়াও। এরপর সে ১১ নম্বর সড়কের মুখে লোহার গেটের সামনে দাঁড়ায়। এ সময় কয়েকটা বাচ্চা এসে তাকে ঘিরে ধরে। এর ৫/৬ মিনিট পরেই বিকট শব্দ। সব অন্ধকার হয়ে গেল। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ছাইয়ের মতো ধোঁয়া। আমি দৌড়ে উত্তর দিকে যাই। পরিষ্কার হতে প্রায় ৩/৪ মিনিট লাগে। শিশুদের চিত্কার শুনতে পাই। ধোঁয়া শেষ হলে এসে দেখতে পাই, লোহার গেটের সামনে রক্ত। শিশুদের ছিন্নভিন্ন দেহ লাফাচ্ছে। আমি চিত্কার দিয়ে মানুষ ডাকি। এর ১৫/২০ মিনিট পরেই পুলিশ আসে। তারপর ফায়ার সার্ভিস। তারা এসে লাশ তুলে নিয়ে গেছে। আহতদের ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয়েছে।’ ঘটনার সময় বেলুনওয়ালা ভ্যানের কাছ থেকে ছিটকে প্রায় ২০ ফুট দূরে গিয়ে পড়ে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে পাশের টিনশেড ঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাশিদা বেগম দুর্ঘটনাস্থলের পাশেই পিঠা বিক্রি করছিলেন। তিনিও ফজর মাদবরের বস্তিতে থাকেন। রাশিদা বেগম বলেন, ‘আমি ঘরে আসছি, এরমধ্যে ঠাস করে শব্দ। সব ধোঁয়া হয়ে যায়। আমার ছেলে আমাকে ডাকতে থাকে। আমি অন্ধকারে বের হতে পারছিলাম না। এরপর আমি নেমে দেখি রাস্তায় বাচ্চাদের লাশ পড়ে আছে। কেউ আহত হয়ে পড়ে আছে। আমার ভাগ্নে-বউ জান্নাত পড়ে আছে, সে ধড়ফড় করতেছে। তার হাত ছিঁড়ে গেছে। আমি গিয়ে ধরলাম। এরপর আরও লোক আসে।’ প্রত্যক্ষদর্শী মোস্তফা বলেন, ‘ছোট্ট সিলিন্ডার ছিল। বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়ে কালো ছাইয়ের মতো ধোঁয়া হয়ে যায়। এসে দেখি শিশুদের লাশ পড়ে আছে। সড়কে সিলিন্ডারের ভাঙা অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। শিশুদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। চুল পুড়ে গেছে। শরীর ঝলসে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিলিন্ডারের এত শক্তিশালী বিস্ফোরণ হয়েছে, কাছে যারা ছিল, তারা প্রায় দুই তিন মিনিট কানে কিছু শোনেননি।’ নিহত শিশুদের বেশিরভাগই ফজর আলী মাদবর বস্তির বলে জানান তিনি। মিন্টু নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এরপর কালো ধোঁয়া। আমি এসে দেখি অনেক শিশুর নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে গেছে। সিলিন্ডারের বিস্ফোরিত অংশ, টিন, ইটভাঙা শিশুদের শরীরে গেঁথে ছিল।’ আহত জান্নাতের দেবর মনির হোসেন জানান, ‘ভাবি (জান্নাত) বাসাবাড়িতে কাজ করেন। মাদবরের বস্তিতে থাকেন। কাজ থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি।’ আরেক আহত শিশু সিয়ামের মামা আরিফ জানান, সিয়ামের বাবা তোফাজ্জল কাঁচামাল বিক্রেতা। ঘটনাস্থলের পাশে রাস্তায় বসে সবজি বিক্রি করেন। পাশের বস্তিতে তাদের বাসা। সিয়াম স্থানীয় স্কুলের ৫ম শ্রেণির ছাত্র। সে তার বাবার দোকানে গিয়েছিল। সেখানে সে আহত হয়। আহত এক রিকশাচালক জুয়েলের স্ত্রী রূপা দাবি করেছেন, তার স্বামী ওই সময় রিকশা নিয়ে সেখান দিয়ে যাওয়ার পথে আহত হন। বিস্ফোরণের শব্দে জুয়েল পড়ে যান বলে জানান তিনি। বেলুনওয়ালাও আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে তার পরিচয় জানা যায়নি।

