জাবিতে সংঘাত

জাবিতে সংঘাত

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৬ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩০

অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ – শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ

মিলন গাজী : দেশের অন্যতম সেরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরেই জাবিকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু জাবির বর্তমান উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন চলছে ক্যাম্পাসে। অভিযোগ আছে, জাবি ভিসির দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণেই ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ হারাতে হয়েছে শোভন ও রাব্বানীকে।

সেই থেকেই ভিসির পদত্যাগের দাবিতে শোভন ও রাব্বানীর অনুসারীসহ বাম ঘরানার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদেরকে উপাচার্য ফারজানা ইসলাম ‘জামায়াত-শিবির’ হিসেবে দেখছেন। তার বিরুদ্ধে আনিত দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা উল্লেখ করে পদ না ছাড়ার সিদ্ধান্তে এখনও অনঢ় রয়েছে তিনি। যদিও তাকে ঘিরে গতকাল মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) ক্যাম্পাসে সংঘাত ও হতাহতের পর বিশ্ববিদ্যালয়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগেরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবগত আছেন। তিনি সব পর্যবেক্ষণ করছেন। এ ব্যাপারে যদি কোনো ব্যবস্থা নিতে হয়, তিনিই সেই সিদ্ধান্ত দিবেন। এদিন অবশ্য ভিসির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ ৪ জন পদত্যাগ করেছেন। সংঘর্ষের প্রতিবাদে ঢাবি ও শাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভ থেকেও জাবি ভিসি ফারজানার পদত্যাগের দাবি জানানো হয়েছে। অবশ্য নিজের বাসভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ‘মুক্ত’ করাকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জাবি ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। এজন্য তিনি শাখা ছাত্রলীগের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। গতকাল মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স রুমে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন উপাচার্য। তিনি এসময় বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা তিন মাস থেকে বিভিন্নভাবে বাধা দিচ্ছে। আমাদের চিন্তা করতে হবে কারা, কেন, কীভাবে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে চায়। একটা মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে অসম্মান ও অপদস্থ করা হয়েছে। কিন্তু এটা করা হয়েছে কোনও প্রমাণ ছাড়াই। যদি কোনও প্রমাণ থাকে, যদি প্রমাণ পায়, তাহলে যা বিচার হবে তা মেনে নেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমকে তারা অনবরত মিথ্যা তথ্য দিয়েছে, মিথ্যা বলেছে।’ আন্দোলনকারীদের জামায়াত-শিবিরপন্থী বলেও মন্তব্য করেন ফারজানা ইসলাম।

সাংবাদিকদের ব্রিফিং শেষে জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অংশ নেন উপাচার্য। পরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে হলগুলো খালি করতে শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন চলছিল ক্যাম্পাসে। তার অপসারণ দাবিতে গত সোমবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টা থেকে তাকে বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আন্দোলনরতরা। পরেরদিন মঙ্গলবার নিয়ে টানা ১১ দিন প্রশাসনিক ভবন অবরোধ এবং দশম দিনের মতো সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করেন জাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। ফলে কার্যালয়ে যেতে পারছিলেন না উপাচার্য। গতকাল  মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ভিসির অনুসারী একদল শিক্ষার্থী। তারা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এই হামলায় ৮ জন শিক্ষকসহ অন্তত ২৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আহতদের অভিযোগ, জাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এসে আন্দোলনরতদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। হামলা চলাকালে উপাচার্যের বাসভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশকে নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। এছাড়া উপাচার্যপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ‘ধর ধর’, ‘জবাই কর’ স্লোগান দিয়ে হামলায় উসকানি দিতে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। তবে এ বিষয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে দুপুর ১টার দিকে পুলিশ, শাখা ছাত্রলীগ, প্রশাসনপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের কড়া পাহারায় নিজ গাড়িতে করে বাসভবন থেকে বের হন উপাচার্য। তাদের কড়া পাহারায় পুরাতন প্রশাসনিক ভবনে নিজ কার্যালয়ে ৭-৮ মিনিট অবস্থান করেন তিনি। পরে সেখান থেকে নতুন প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।

এর আগে গত আগস্ট থেকেই নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অর্থ নয়-ছয় করে আত্মসাতের অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটা অংশ ভিসি ফারজানা ইসলামের অপসারণ বা পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। কিন্তু কোনোভাবেই ভিসি তার পদ ছাড়তে রাজি নন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংঘর্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া কোনো সমাধান নয়। ভিসির বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এর সত্য-অসত্য জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি সংঘর্ষের ঘটনায় যারাই দোষি প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে, তদন্তের মাধ্যমে। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তখন সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। আর এসবের মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী ও ষড়যন্ত্রকারীচক্র ঘোলা পানিতে মাছ শিকার সুযোগ খুঁজতে পারে। কাজেই সেই সুযোগ তৈরির আগেই বিষয়টি দ্রুত মীমাংসায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল গুরুত্বের সঙ্গে নিবে- সেটাই সচেতন মহলের প্রত্যাশা।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading