জনশক্তি রপ্তানিঃ মালয়েশিয়ার জট খুলছে
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৮ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১
হিল্লোল বাউলিয়া : দেশের আয়ের অন্যতম উত্স বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি। তাদের মাধ্যমে যে রেমিট্যান্স আসে তা জাতীয় উন্নয়নে বড় অবদান রাখছে। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বড় বাজার ছিল। কিন্তু নানা কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া হয়ে উঠে অন্যতম দ্বিতীয় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। কিন্তু একটি দুষ্টচক্রের কারণে গত বছর হঠাত্ই বন্ধ হয়ে যায় সম্ভাবনার সেই দুয়ারও। ফলে অনেকটা মুখ থুবরে পড়ে দেশের জনশক্তি রপ্তানি। অবশ্য সরকারের আন্তরিকতা ও নানা উদ্যোগে সেই হতাশা অনেকটা টাকতে শুরু করেছে। বেশ কিছুদিন আগে জাপানে বড় ধরনের জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশসহ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসবের পাশাপাশি সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফিরে পেতে বেশ তত্পর ছিল শুরু থেকেই। এরই মধ্যে সেই প্রচেষ্টার সুফল পাওয়ার সব আয়োজন প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। বড় কোনো ব্যত্যায় না ঘটলে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকেই ফের দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হবে। নিশ্চয়ই এ মুহূর্তে বিষয়টি আনন্দের খবর। কারণ, গত কয়েকদিন ধরে সৌদি আরব থেকে শ্রমিকরা ফেরত আসছেন। দেশটির নতুন আইনের কারণে তারা সেখানে অবৈধ হয়ে পড়েছেন। যদিও সব ধরনের নিয়মকানুন মেনেই এই শ্রমিকরা অনেক অর্থ খরচ করে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি আরবের চলমান সংস্কার ও নীতির পরিবর্তনে দেশটিতে বিদেশি শ্রমিকদের জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। যার ভুক্তভোগী বাংলাদেশি শ্রমিকরাও। যদিও এখনও সৌদি আরবই বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, দেশটিতে প্রায় ৮০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন। তবে দেশটির নতুন আইনের ফলে কতদিন সেখানে টিকে থাকতে পারবেন সেটিই বড় চিন্তার বিষয়। এমন প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ায় বন্ধ থাকা শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। এ নিয়ে আলোচনা করতে আগামী ২৪ কিংবা ২৫ নভেম্বর ঢাকায় আসছে দেশটির একটি প্রতিনিধিদল। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই দেশটিতে কর্মী পাঠাতে আগ্রহী বাংলাদেশ। গত বুধবার কুয়ালামপুরের স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় দুই দেশের সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ।

মালয়েশিয়ার পক্ষে ছিলেন দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারান। মন্ত্রী ইমরান আহমদের সঙ্গে আরও ছিলেন একই মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজা, অতিরিক্ত সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীনযুগ্ম সচিব ফজলুল করিম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক আজিজুর রহমান এবং বিএমইটির পরিচালক নুরুল ইসলাম। এ ছাড়া কুয়ালালামপুর থেকে প্রতিনিধিদলে যোগ দেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম এবং কনস্যুলার (শ্রম) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। দেশটির পার্লামেন্টে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকসূত্রে জানা যায়, এতে শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ডিসেম্বরেই যাতে বাংলাদেশ কর্মী পাঠাতে পারে, তা নিশ্চিত করতে আগামী ১১ নভেম্বর মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারান। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে বুধবার দুদেশের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে। গেল বছরের ১ সেপ্টেম্বর হঠাত্ বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনলাইন পদ্ধতি এসপিপিএ। চলতি বছরের ১৪ মে ইমরান আহমদ মালয়েশিয়া সফরে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তানশ্রি মুহিউদ্দিন ইয়াসিন ও মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের অগ্রগতি হিসেবে গত ২৯ ও ৩০ মে মালয়েশিয়ায় দুদেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের আরেকটি বৈঠক হয়েছিল। এসব বৈঠকে দু’দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঐক্যমত্যে ভিত্তিতে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য বন্ধ থাকা মাশয়েশয়ার শ্রমবাজারের দাড় খুলতে যাচ্ছে চলতি বছরেই।
আগামী ২৪ বা ২৫ নভেম্বর প্রতিনিধিদলটি ঢাকা সফরে আসার পর সমঝোতা স্মারক সই হবে। এরপরই খুলতে পারে বন্ধ থাকা বাংলাদেশের শ্রমবাজার। গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারানের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। ওই বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠক সূত্র নিশ্চিত করেছে। বৈঠকে ন্যূনতম অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানো, উভয় দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির সম্পৃক্ততার পরিধি, মেডিক্যাল পরীক্ষা এবং কর্মীর সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা, ডাটা শেয়ারিং ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে ন্যূনতম অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানো এবং কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বিড়ম্বনা কমাতে বাংলাদেশ থেকে বহির্গমনের আগে মাত্র একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদার কথা বৈঠকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার পক্ষে ছিলেন সে দেশের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেল দাতুআমির বিন ওমর, ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল দাতু কয়া আবুন, ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল দাতু মো. খাইরুজ্জামান, লেবার ডিপার্টমেন্টের মহাপরিচালক দাতু মোহাম্মদ জেফরি জোয়াকিম আসরী, আন্ডারসেক্রেটারি মিস বেটি হাসান, আন্ডারসেক্রেটারি আব্দুর রহমান, ডেপুটি আন্ডারসেক্রেটারি শাহাবুদ্দিন এবং ডেপুটি আন্ডারসেক্রেটারি শাহ বাচিক প্রমুখ। এর আগে, ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে জনপ্রতি সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগে মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদের নতুন সরকার গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মী পাঠানোর অনলাইন পদ্ধতি বন্ধ করে দেয়। তত্কালীন প্রবাসী ও বৈদেশিক কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি মালয়েশিয়ায় গিয়ে একাধিক বৈঠক করার পরও শ্রমবাজার চালু করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য নতুন এবং বর্ধিক কলেবরে সেই সিন্ডিকেটই বাজার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় বলে খবর চাউর হয়েছে। বাজার খুলতে আলোচনায় গিয়ে খোদ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীকেই সিন্ডিকেটের বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। মন্ত্রীর উত্তেজক বক্তব্যে সন্দেহের ডালপালা আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন করে মালয়েশিয়ায় যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন আগের ছিন্ডিকেট ও দুষ্টুচক্রের অপকর্মের কারণে হুমকির মুখে না পড়ে- সে জন্য দুদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। জনশক্তি রপ্তানির নামে যাতে মানব পাচারকারীচক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে না পারে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

