ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে বুলবুলের আঘাত, নিহত ২

ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে বুলবুলের আঘাত, নিহত ২

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ০৯ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ২৩ঃ৪৫

বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৯টায় ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশ পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ উপকূলে চলে এসেছে বলে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। ঘণ্টায় ১১৫ কিলোমিটার থেকে ১২৫ কিলোমিটার বাতাসের গতি নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আঘাত হেনেছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল।

Bulbul

ঘূর্ণিঝড়টির ব্যাস ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। ঝড়টি ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার গতিতে উত্তরপূর্ব দিকে এগোচ্ছে। ঝড়ের প্রভাবে কলকাতা ও ওড়িষ্যায় দুজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো। মধ্যরাত নাগাদ ঝড়টি বাংলাদেশে ঢুকবে বলে সেখানকার বহাওয়াবিদরা ধারণা করছেন।

পিটিআই বলছে, ঘর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে ভারি বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় কলকাতায় বহু গাছ উপড়ে গেছে, নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে কলকাতা শহরের একটি নামকরা ক্লাবে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে ভারতের ওড়িষ্যায়ও ভারি বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে একজনের মৃত্যুর খবরও দিয়েছে তারা। ঝড়ের কারণে কলকাতা বিমাবন্দরের সব কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

সুন্দরবনের ইন্ডিয়া-অংশে আছড়ে পড়ল ভয়াল বুলবুল, তাণ্ডব চলবে ভোররাত পর্যন্ত

সুন্দরবনের ইন্ডিয়া-অংশে আছড়ে পড়ল ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। তবে আছড়ে পড়ার আগেই কিছুটা শক্তিক্ষয় হয়েছে বুলবুলের। পশ্চিম বঙ্গের ফ্রেজারগঞ্জ, সাগরদ্বীপ, বকখালি হয়ে স্থলভাগে ঢোকার পর অতি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় থেকে শুধুমাত্র ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে আকার নেয় বুলবুল। আগামী তিন-চার ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চলবে সুন্দরবন বদ্বীপ এলাকাতেই। তারপর বুলবুল এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের খেপুপাড়ার দিকে। স্থলভাগে ঢোকার সময় তার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারের আশেপাশে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের অধিকর্তা গণেশকুমার দাস জানিয়েছেন, ‘‘ নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগেই বুলবুল আছড়ে পড়েছে সুন্দরবন বদ্বীপ অঞ্চলে। তবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি গভীর রাত অবধি চলবে ওই এলাকায়। এরপর বাংলাদেশ হয়ে ত্রিপুরার দিকে এগিয়ে যাবে বুলবুল। 

কলকাতায় ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি

Bulbul

ঘূর্ণিঝড় বুল্বুলের প্রভাবে পশ্চিম বঙ্গের কলকাতায় ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি যেমন চলছে, কাল পর্যন্ত তেমনই চলবে, সেখানকার আবহাওয়া অফিসের খবর। পূর্ব মেদিনীপুর আর দুই ২৪ পরগনায় ঝাপটা মেরে চলেছে দুর্যোগ। রাতে আরও খারাপ হতে পারে পরিস্থিতি। বিশেষত সুন্দরবন এবং সংলগ্ল উপকূল এলাকা নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তা প্রশাসনের।

বুলবুলের মোকাবিলায় সতর্ক সেখানকার প্রশাসন ইতিমধ্যেই উপকূল এলাকা থেকে প্রায় এক লক্ষ ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর,  দুই ২৪ পরগনার ত্রাণকেন্দ্রে মজুত রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত খাবারও।

পশ্মুচিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই কন্ট্রোল রুমে বসে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিচ্ছেন জেলা প্রশাসনকে। মমতা এ দিন টুইট করে জানান, সমস্ত ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলায় তৈরি রয়েছে প্রশাসন। সতর্ক রয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।

বুলবুলের কারণে এ দিন বিকেল ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত দমদম বিমানবন্দরে বিমান ওঠা-নামায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ক্রমশই বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ বাড়ছে। সাগরদ্বীপ, সুন্দরবনের অনেক কাছে চলে এসেছে বুলবুল।

সে কারণে কলকাতাতেও বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার গতিতে হাওয়াও বইছে। এ দিন সকালে ঝোড় হাওয়ার জেরে দক্ষিণ কলকাতায় বালিগঞ্জের একটি অভিযাত ক্লাবে গাছ ভেঙে মৃত্যু হয় এক কর্মীর। মৃতের নাম শেখ সোহেল (২৮)। পুলিশ সূত্রে খবর, এ দিন সকাল ১০টা নাগাদ দমকা হাওয়ায় একটি দেবদারু গাছ উপড়ে যায়। ওই সময় সোহেল গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছিলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।

রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি, কলকাতা পুরসভাতেও কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সেখানে থেকে তদারকি করছেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। এ দিন সকাল থেকে এক নাগারে বৃষ্টি হওয়ায় শহরের বিভিন্ন প্রান্তে জল জমে গিয়েছে। পাম্পিং স্টেশনগুলির সাহায্যে জল নামানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পুর কর্মীরা। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসাবে নদীতে ফেরি চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে।

দিঘাঃ বুলবুলের দাপটে সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস, ঝড়-বৃষ্টি-লোডশেডিং

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আতঙ্কে কাঁপছে দিঘা। শুনশান রাস্তাঘাট থেকে সৈকত। অল্প যে কয়েকজন পর্যটক রয়েছেন, তাঁরা হোটলবন্দি। দোকানপাট খোলেনি। বহু মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে প্রশাসন। দুপুরের পর থেকে শুরু হয়েছে প্রবল ঝড়বৃষ্টি। সতর্ক নজর রয়েছে পুলিশ-প্রশাসনের। সব মিলিয়ে পর্যটকদের আনাগোনায় দিনভর যেখানে সরগরম থাকে, সেই সৈকত শহরই যেন ভয়ে গুটিয়ে। একইরকম তটস্থ শঙ্করপুর, তাজপুর, মন্দারমণি এলাকাও। বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। ফলে কার্যত অন্ধকারে ডুবে গোটা দিঘা শহর। পশ্চিম মেদিনীপুরেও কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঘাটালের সাংসদ দেব।

আবহাওয়া দফতরের শেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দিঘা এবং সাগরদ্বীপ উপকূলের সবচেয়ে কাছে অবস্থান করছে বুলবুল। কিন্তু উপকূলে আছড়ে পড়ার আগেই কার্যত বিপর্যস্ত পর্যটন শহর দিঘা। সকাল থেকেই ঝোড়ো হাওয়া ছিল উপকূলে। সঙ্গে বৃষ্টি। কিন্তু দুপুরের পর বেড়েছে ঝড়-বৃষ্টির দাপট। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঢেউয়ের উচ্চতা। স্থানীয়রা জনিয়েছেন, দুপুরের দিকে ভাটা থাকায় ততটা বোঝা যায়নি। কিন্তু বিকেলের পর জোয়ার শুরু হতেই বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে উপকূলে। শঙ্করপুর, তাজপুর মন্দারমণি— সব জায়গাতেই জলোচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছে। যে কোনও সময় উপকূল ছাপিয়ে শহরে জল ঢুকে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন হোটেলকর্মী ও স্থানীয়রা।

দিঘা থেকে অধিকাংশ পর্যটকই শুক্রবার ফিরে গিয়েছেন। নামমাত্র কিছু পর্যটক যাঁরা তার মধ্যেও থেকে গিয়েছেন, তাঁরা হোটেলবন্দি। দিঘা-শঙ্করপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক তপন মাইতি বলেন, ‘‘এই সময়ের জন্য আগে থেকে যাঁরা বুকিং করে রেখেছিলেন বিভিন্ন হোটেলে, তাঁদের অধিকাংশই বুকিং বাতিল করেছেন। শনিবার ট্রেন-বাস সবই ফাঁকা এসেছে।’’ তপনবাবু আরও জানান, বিকেলের পর থেকে যে ভাবে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সৈকতের ধারের অস্থায়ী দোকানগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা। কিন্তু গ্রামের দিকে আরও বেশি ক্ষতি হতে পারে।’’ একটি বেসরকারি হোটেলের ম্যানেজার বলেন, ‘‘আমাদের হোটেলে কয়েকজন পর্যটক রয়েছেন। তবে তাঁদের কাউকেই বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।’’

পর্যটকদের সঙ্গে আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারাও। প্রচুর মানুষকে উপকূল এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের রাখা হয়েছে দিঘার রতনপুর, জলধা ও চাঁদপুরে আয়লা সেন্টারে। শনিবার থেকে সেখানেই খাবার দেওয়া শুরু হয়েছে। রবিবারের জন্য মজুত রয়েছে শুকনো খাবার।

বিপর্যয়ের মোকাবিলায় শুক্রবারই দিঘা-শঙ্করপুরে পৌঁছে গিয়েছিল এনডিআরএফ। সতর্ক রয়েছেন জওয়ানরা। পাশাপাশি শনিবারও জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করেছেন প্রশাসনিক আধিকারিকরা। দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ওই বৈঠকে পুলিশ, প্রশাসন, হাসপাতাল থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধিরাই উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই উপকূলে প্রচুর ঝাউগাছ ও কাঁচা বাড়ির ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের সতর্কবার্তা পেয়ে শুক্রবারই সমুদ্র থেকে ফিরে এসেছেন মৎস্যজীবীরা।

SekFaruk

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading