নতুন ‘সড়ক পরিবহন আইন’ বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২৩ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
শ্রমিকদের এই আচরণ সমর্থনযোগ্য নয়
হিল্লোল বাউলিয়া : নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সরকারের ঘোষণার পর একটি মহল সারাদেশে সড়কে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করে। নতুন আইন সংশোধনের দাবিতে গত কয়েকদিন দেশের বাস-ট্রাক শ্রমিকরা যে ‘কর্মবিরতি’র নামে বিরোধিতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পায়তারা করে। যেখানে সরকারেরই সাবেক দুজন মন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠে। অভিযোগ আছে, ওই সাবেক দুই মন্ত্রী, যারা বর্তমানে এমপি সড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টির পেছনে মূল উস্কানি ও ইন্ধনদাতা। তারা একই সঙ্গে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাও। তাদের সঙ্গে সড়কে নৈরাজ্য তৈরিতে বাস-ট্রাক মালিক ও শ্রমিকরা তো যুক্ত হওয়ায় সরকারও কিছুটা অস্বস্তিতে পরে। ফলে তাদের চাপের কাছে কিছুটা নমনীয় করা হয়েছে সড়ক পরিবন আইন প্রয়োগের বিষয়টি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে ওই সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠকের পর ট্রাক চলাচল স্বাভাবিক হলেও গণপরিবন চলাচল গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে আজ শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাবেক বিতর্কিত মন্ত্রী শাজাহান খান এমপির নেতৃত্বে ফের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে, পরিবহন শ্রমিকদের কথিত ওই কর্মবিরতি পালনের মধ্যে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের প্রধান ও অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিকে হেয় প্রতিপন্ন করার অভিযোগ উঠে। ইন্টারনেট-ভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে, ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি সম্বলিত ব্যানার টাঙিয়ে কিংবা কুশপুত্তলিকা তৈরি করে সেখানে জুতার মালা দেয়া হয়েছে। দেশের বেশ কিছু এলাকার মতো গাজীপুরে পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলনে এমন ব্যানার লক্ষ্য করা গেছে। ‘ইলিয়াস কাঞ্চনের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’ এমন স্লোগানও দেয়া হয়েছে ওইসব কর্মসূচি থেকে। ব্যানারেও এমন স্লোগান লেখা হয়। এসব ছবি গণমাধ্যমের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর এখন বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে নেট দুনিয়ায়। অধিকাংশই এই ইস্যুতে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের পক্ষ অবলম্বন করেছেন। বিষয়টি নায়কেরও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, সড়ক পরিবন আইন বাস্তবায়নে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের এই বিরোধিতা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে সরকারের নমনীয় হওয়া ঠিক হবে না বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, শ্রমিকদের কর্মকাণ্ড তাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। তার মতে, ‘কখনো-কখনো
খারাপ লাগে। এতোটাই খারাপ লাগে যে, যাদের জন্য আমি এতো কিছু জলাঞ্জলি দিয়েছি কোনও কিছু পাওয়ার আশায় নয়। আমি আমার সিনেমার ক্যারিয়ার শেষ করেছি নিরাপদ সড়কের জন্য। আমার সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করেছি। প্রশ্ন হচ্ছে, ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতি শ্রমিকদের এতো ক্ষোভের কারণ কী? তিনি বলেন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য যে আন্দোলন সেটি তার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। তার প্রতি শ্রমিকদের ক্ষিপ্ত হবার এটিই কারণ বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘শ্রমিকরা মনে করে, সড়ক দুর্ঘটনায় কারো হাত নেই। এটা আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। আমি কেন বিষয়টা নিয়ে বলবো? তারা এটাই মনে করে।’ তবে ট্রাক মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব তাজুল ইসলাম স্বীকার করেন যে, সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বিভিন্ন সময় টেলিভিশনে নানা মন্তব্য এবং দাবি তোলার কারণে শ্রমিকদের কেউ-কেউ তার ওপর ক্ষুব্ধ হতে পারে। তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আইন পাস করব সরকার। উনি (ইলিয়াস কাঞ্চন) যেখানে বলে আইন পাস করলো না কেন, আরো আইন হওয়া উচিত- এগুলো অনেক সময় শ্রমিকরা মনে হয় শোনে, সেজন্য আমার মনে হয় একটা উত্তেজনা আইসা পড়ে।’ ইলিয়াস কাঞ্চন মনে করেন, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার পেছনে মালিক-শ্রমিক নেতাদের উস্কানি রয়েছে। ‘এই শ্রমিকরা নেতাদের কথা দ্বারা প্রভাবিত। নেতারা যা বলে শ্রমিকরা তাই শোনে। তাদেরকে বলা হয়, সড়কে যা কিছু হোক না কেন আমরা আছি। সেটা ন্যায় হোক, অন্যায় হোক, যা কিছু হোক,’ বলছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি আরও বলেন, ‘এটা (তাকে অপমান) শ্রমিকরা ঠিক এককভাবে করে নাই। শ্রমিক-মালিক সংগঠনের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছে তারাই এ বিষয়টা করেছে।’ তবে শ্রমিক নেতা তাজুল ইসলাম মনে করেন, ইলিয়াস কাঞ্চন তাদের প্রতিপক্ষ নয়। তার কথায়, ‘লাখ-লাখ শ্রমিকের ভেতরে উত্তেজনা হইতেই পারে। শ্রমিকের ব্যাপারটা কন্ট্রোল করা অনেক কষ্ট।’ ইলিয়াস কাঞ্চন প্রশ্ন তোলেন, ‘এই মালিক সমিতির নামে শ্রমিক সমিতির নামে যে কোটি-কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে, সে চাঁদা কোন উন্নয়নের কাজে লাগে?’ তিনি অভিযোগ করেন, মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো শ্রমিকদের উন্নয়ন চায় না। কারণ শ্রমিকরা যদি যথাযথ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে কাজ করে তাহলে তার কাছ থেকে সংগঠনগুলো কোনও চাঁদা নিতে পারবে না। মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো দাবি করেছে গত কয়েকদিনের ‘কর্মবিরতি’র সাথে সংগঠনের কোনও সম্পর্ক নেই। শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওই কর্মবিরতি পালন করেছে। তবে ইলিয়াস কাঞ্চন প্রশ্ন তোলেন, মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর নির্দেশে যদি আন্দোলন না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের নির্দেশে আন্দোলন প্রত্যাহার হয় কিভাবে? গত বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সাথে বাস-ট্রাক মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর বৈঠকের পর কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেছে শ্রমিকরা। সে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী নতুন সড়ক পরিবহন আইন খতিয়ে দেখার জন্য সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হবে। ইলিয়াস কাঞ্চন মনে করেন, আইনের কোনও বিষয় নিয়ে ছাড় দেয়া ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ‘এবার যদি আমরা হেরে যাই, তাহলে হেরে যাবে পুরো বাংলাদেশ।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়: বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেসবুকে তোলপাড় চলছে। অনেকেই পরিবহন শ্রমিকদের হিংস্রতা ও নৈরাজ্যকর আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, ইলিয়াস কাঞ্চনের আন্দোলন শ্রমিক, ড্রাইভার ও সাধারণ মানুষ- সবার জন্য। এদেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার ফসল একজন ইলিয়াস কাঞ্চন। রাতারাতি ইলিয়াস কাঞ্চন হওয়া যায় না। আজকের ইলিয়াস কাঞ্চন মানে শুধু একজন চিত্র নায়কই নন। ইলিয়াস কাঞ্চন মানে একটি আন্দোলনের নাম, একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পুরোধা-প্রধান মানুষটি হচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি এদেশের মানুষকে সড়ক নিরাপত্তায় সচেতন করে তুলতে যে প্রাথমিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন প্রায় তিন দশকের ব্যবধানে তা আজ মাইলফলকে পরিনত হয়েছে। রাষ্ট্র তার দাবি ও আন্দোলনের মুখে নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করছে। দেশের মানুষ সোচ্চার ও সচেতন হয়েছেন তার এই আন্দোলনের মাধ্যমে। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে তিনি যখন কথা বলেন, কর্মসূচির ডাক দেন তা কোন ব্যক্তি স্বার্থের পক্ষে নয়। তার সকল আন্দোলনই জনস্বার্থে। তার এ আন্দোলন আজ সারা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এমন কি আপনার ছোট সন্তানটিকে ঘিরেও এ আন্দোলন। নয়তো প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের অকাল মৃত্যুর মিছিলে আপনার নামটিও যেকোনো মুহূর্তে লেখা হয়ে যেতে পারে। ইলিয়াস কাঞ্চন নিজের প্রিয়জনকে (স্ত্রী) হারিয়ে একজন ভুক্তভোগী। তাই তিনি চান, দেশে এমন আর একটিও যেন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু না হয়। এ জন্য সবাইকে সচেতন ও সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সরকারে সময় উপযোগী আইন প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করাই তার ‘অপরাধ’! ফেসবুকে ইলিয়াস কাঞ্চনের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে অনেকে বলছেন, আপনি এগিয়ে যান। আপনিই প্রকৃত নায়ক। দেশবাসী আপনার সঙ্গে। আমরা এই সমাজেরই বিবেকবান মানুষ। আমাদের ন্যায়-অন্যায়ের বোধ জাগ্রত হোক।

