ইসরাইলে রাজনীতি উত্তপ্ত নেতানিয়াহু বেকায়দায়
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২৬ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
যেকোনোভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নিজের প্রয়োজনীয়তা জানান দিতে ইহুদি রাষ্ট্রটির সরকারপ্রধান মুসলিম দেশ ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে আসছেন দিনের পর দিন। আন্তর্জাতিক কোনো আইনের তোয়াক্কা না করে তিনি বিমান হামলা তথা গোলাবর্ষণ করে নির্বিচারে ফিলিস্তিনি অসহায় বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করছেন। এর মধ্যে অসংখ্য নারী ও শিশু রয়েছে। যা আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু মার্কিন আমেরিকা নির্লজ্জভাবে ইহুদিবাদী নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোও বৈশ্বয়িক স্বার্থে ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান করছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু নিজের ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনিদের হত্যার পর ইসরাইলের সীমান্ত বৃদ্ধি করছে এবং অবৈধভাবে ইহুদি বসতি তৈরি করছে। তারপরও পুনরায় সরকার গঠনের জন্য একই বছরে দুই দফায় নির্বাচন দিয়েও প্রয়োজনী আসন পেতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে তিন বছর ধরে চলা তদন্তে দুর্নীতির একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন বিশ্বের একমাত্র ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। দেশটিতে তৃতীয় দফায় নির্বাচন হতে যাওয়ার আগে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় যখন তার ক্ষমতা হারানো শতভাগ নিশ্চিত তখন তিনি জোর করেই ক্ষমতা ধরে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে সম্প্রতি গাজা ও দামেস্কে নতুন করে বোমা বর্ষণ করে শত শত মুসলিম হত্যায় মেতে উঠেছেন। কিন্তু তার এসব কর্মদিয়েও ইসরাইলবাসীর সমর্থন ধরে রাখতে পারবেন না বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। তারা বলছেন, শুধু ক্ষমতা হারানো নয়, যত কৌশলই করুন না কেন শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে বিশ্ব মুসলিমদের দুষমণ হিসেবে বিবেচিত নেতানিয়াহুকে হয়তো জেলখানায়ই থাকতে হতে পারে বাকি জীবন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বেলফোর স্ট্রিটে তার টিকে থাকার এই লড়াইয়ের বিপরীতে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় সম্প্রতি একই পরিবারের ৮ সদস্যসহ অন্তত ৩৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর পর সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়। এর আগে আহত হয়েছেন আরও ১১১ জন। হয়ত আগামীতে এই হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে। সূত্র বলছে, সরাসরি হামলা বন্ধ হলেও বিভিন্নভাবে ফিলিস্তিনের নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। জেরুজালের রামাল্লা সীমান্তে অবৈধ স্থাপনা তৈরি অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাকে পাত্তা দিচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি আরবের প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ট নেতানিয়াহু। ‘ইহুদি ও ইসরায়েল রক্ষার দূত’: নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়া তার কাছে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়েও বেশি কিছু। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট, পূর্ব অ্যারিয়েল শ্যারন কিংবা এহুদ বারাকের মতো করে ভাবেন না তিনি। নিজেকে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও ইহুদি জনগণের সুরক্ষায় নিয়োজিত ‘ইতিহাসের নির্বাচিত দূত’ মনে করেন। সংস্কারপন্থী জায়নবাদী জাবোতিনস্কি যা পারেননি, তার বাবা বেনিয়নকে যা করতে দেওয়া হয়নি; সেই অপূর্ণ কাজ করার দায়িত্ব নিয়েছেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ইয়ারের একটি মন্তব্য নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করছে। ইয়ার দাবি করেছেন, তার বাবা ক্ষমতা গ্রহণের আগ পর্যন্ত ইসরায়েল ছিল একটি প্রাচীন রাষ্ট্র, যা কেবল কমলা রফতানি করতো। আসলে নেতানিয়াহুর ছেলে যা শুনতে শুনতে বড় হচ্ছে তা হলো: ‘আমি নিজেই রাষ্ট্র’। অর্থাত্ তার বাবা ও ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং ইহুদি জনগণ সবকিছুই এক। তার কাছে প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার মানে আর ‘বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’ না থাকা। এমনকি শেষ পর্যন্ত তিনি যদি দোষ স্বীকার করে কোনও চুক্তিও করেন, তবু আত্মজীবনী লেখা থেকে কেউ তাকে বিরত করতে পারবে না। ইসরায়েলের রক্ষাকর্তা হিসেবে তিনি নিজের জন্য যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী হতে না পারলে সেই লক্ষ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হবে। নেতানিয়াহুর অবস্থান থেকে প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার কোনও বিকল্প নেই। দায়িত্ব হারালে তাকে যে কেবল বিচারের মুখোমুখি হতে হবে তা নয়, তিনি আরও জানেন যে, বিচারের পর হয়তো কারাগারেও যেতে হবে তাকে। সন্দেহ নেই, এই আশঙ্কা অনেক বড়। কিন্তু এরচেয়েও বড় আশঙ্কা রয়েছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে দুইটি অভিযোগে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। প্রথম অভিযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সাহায্য করার আশ্বাসের বিনিময়ে ইয়েদিয়ত আহারোনত পত্রিকাকে নিজের পক্ষে খবর প্রচার করতে বলা। দ্বিতীয় অভিযোগ, ২০০৯ সাল থেকে হলিউড মোঘল বলে পরিচিত আহনন মিলচ্যানসহ বিভিন্ন ভক্তের কাছে থেকে অন্তত ২ লাখ ৮৩ হাজার ডলার মূল্যের ‘উপহার’ গ্রহণ। মিলচ্যানকে মার্কিন ভিসা পেতে সাহায্য করার বিনিময়ে নেওয়া ওই উপহারগুলোর বেশির ভাগ ছিল শ্যাম্পেন ও সিগার। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি যেসব উপহার গ্রহণ করেছেন তা বেআইনি। তবে ‘ইতিহাসের নির্বাচিত দূত’ কি সামান্য সিগারের জন্য কারাগারে যাবেন? তা যেতে চান না বলেই সংবাদমাধ্যমে নিজের পক্ষে প্রচারণার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে চেয়েছেন তিনি। এখন দেখার অপেক্ষা সেই প্রচারণা বাস্তবে তার দুর্নীতির দণ্ড থেকে রক্ষা করতে পারে কিনা!
ইসরাইলিদের মধ্যে সমর্থন হারাচ্ছেন: এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরের দুটি নির্বাচনে দেখা গেছে, ইসরায়েলের ভোটাররা নেতানিয়াহুর প্রতি আকর্ষণ হারাচ্ছে। তারা তাকে ‘ইতিহাসের নির্বাচিত দূত’ হিসেবে মনে করছে না। নেসেটের (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) ৬৫ আসনের বেশিরভাগ জনগণ তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চায় না। অবশ্য তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্থজ জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন নিয়ে আরবদের সঙ্গে সংখ্যালঘু সরকার গঠনে সফল হননি। ফলে এক বছরে তৃতীয় বারের মতো দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে হচ্ছে। আর এই নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার তথ্য প্রকাশে আগামী নির্বাচনের ফল যে তার জন্য আরও অস্বস্তির হবে- সেকথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তেমন কিছু ঘটলে নেতানিয়াহু যে শুধু বেলফোর স্ট্রিট থেকে সরে যাবেন তা নয়, তার সব কাজও চাপা পড়ে যেতে পারে। মুছে যেতে পারেন ইতিহাস থেকে। অবথা ইসরাইলের ইতিহাসে দুর্নীতিবাজ দণ্ডিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জায়গা হতে পারে নেতানিয়াহুর। নেতানিয়াহুর ন্যায্যতা প্রতিপন্ন হয়েছে জর্ডান নদী থেকে সাগর, পশ্চিম তীর ও গাজা এবং অবৈধ ইসরাইলের সীমান্তের কাছে ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনও ভূমি অগ্রাহ্য করার মধ্য দিয়ে। জাতিরাষ্ট্র আইন পাস, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মর্যাদা খর্ব করা এই ন্যায্যতার ভিত্তিমূল। নেতানিয়াহু ও তার দলের সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে এগুলোই কাজ করছে। তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ও তার দলের এই দাবি ইসরাইলিরা পুরোপুরি মানছে না। সত্য যে, পেতাহ টিকভায় নেতানিয়াহু সমর্থকদের বিক্ষোভ গত কয়েক সপ্তাহে বড় ও আক্রমণাত্মক হয়েছে। কিন্তু এখনও বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার। জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় শিবিরের বলে পরিচিত নেতা নাফতালি বেনেতে স্বীকার করেছেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখতেই কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। ছোট আকারের উগ্র-জাতীয়তাবাদী দলটি ইসরাইলের অবৈধ বসতি প্রকল্পের সমর্থক। তাই এটা কাকতালীয় নয় যে, ডানপন্থী দলগুলোর জোট ইয়ামিনা সর্বশেষ নির্বাচনে মাত্র সাতটি আসনে জয় পেয়েছে। তাদের নেতা বেনেত ও আয়েলেত শাকেদ এপ্রিলে জামানত হারিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের মন্ত্রিসভায় তাদের তিনজন মন্ত্রী রয়েছে।
‘একটি মারাত্মক বিপর্যয়’: উপরের ঘটনা থেকে ধারণা পাওয়া যায় কীভাবে চ্যানেল ১২ এর একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং অবৈধ বসতিতে জন্ম নেওয়া জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় শিবিরের পরিচিত মুখ অমিত সেগাল নেতানিয়াহুর প্রতিরক্ষা দফতরে যুক্ত হয়েছেন। অমিতের বাবা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। নেতানিয়াহুর শিবিরে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে অমিত ডানপন্থী রাজনৈতিক ভাষ্যকারের পরিচয় হারানোর ঝুঁকি পর্যন্ত নিয়েছেন। গত মাসে বেনেতের ফেসবুক পোস্টের নেপথ্যেও ছিল একই কারণ। ওই পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি বিচার ব্যবস্থা নেতানিয়াহুকে উচ্ছেদে সমর্থ হয় তাহলে পুরো জাতীয়তাবাদী শিবিরের জন্য তা হবে একটি বড় বিপর্যয়’। মেগাল, বেজালেল স্মোতরিচ ও অপর জাতীয়তাবাদী ধর্মীয় নেতাদের মতো বেনেতও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত না হওয়ার প্রশ্নে বড় ধরনের উদ্বেগে রয়েছেন। তারা বিশেষ অবস্থান হারানোর আশঙ্কা করছেন, যা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
কারণ নেতানিয়াহুর অধীনে গত এক যুগ ধরে তারা শাসন ক্ষমতার অংশীদার থেকেছেন এবং বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছেন। বিশেষ করে সর্বশেষ সরকারের আমলে। ফলে অন্য সব বিবেচনাকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ইহুদি আধিপত্য চিরস্থায়ী করতে প্রথম ও একমাত্র কাজ হলো নেতানিয়াহুর ন্যায্যতাকে ধরে রাখা। এটিই সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলেছে। প্রায় সব রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইসরায়েলি নাগরিক, এমনকি ডানপন্থী দলের সমর্থকদের অনেকেও বুঝতে পারছেন আবু আল-আত্তা হত্যা কোনও নতুন হামলার পাল্টা আঘাত নয়। একইসঙ্গে পাঁচ বছর পর লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যার নীতিও পুনরায় চালু করা হয়েছে। বেনি গান্থজ যেনও আরব জোটের সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এমনটি করা হয়েছে। আর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই আবু আল-আত্তার স্ত্রী ও আল-আজৌরির ছেলেকে জীবন দিতে হলো। নেতানিয়াহু বা ইসরায়েলের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদিদের সমীকরণে এদের জীবনের কোনও মূল্য নেই। এমনকি এই সহিংসতায় যেসব ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি জীবন দিয়ে মূল্য দিচ্ছেন- নেতানিয়াহুর কাছে তাও বিবেচ্য নয়। ইসরাইল ও গাজার স্বাভাবিক জীবন বিঘ্নিত করা নিয়েও তার কোনও মাথাব্যথা নেই। যদিও এই উসকানিমূলক হামলা মাত্র কয়েকদিন অব্যাহত ছিল। কিন্তু যা ঘটেছে তাতেই নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে বলে মনে করা হয়। সেটি হচ্ছে, প্রতিপক্ষের সংখ্যালঘু সরকার গঠন ঠেকাতে নেতানিয়াহুর এই পরিকল্পনা কাজ দিয়েছে। আর নেতানিয়াহুও দৃশ্যত ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নন। তাই ইসরাইলের রাজনৈতিক সংকট আরও বড় হওয়া এবং ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য সামনে আরও বিপজ্জনক হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

