‘স্বাধীনতা স্বাধীন স্বাধীনতায়’
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২৭ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
মোহাম্মদ শিহাব : ‘..মানুষ প্রধানত দুই ধরনের/একদল ক্ষণজন্মা/ আরেক দল কেনজন্মা/ আমি ওই কেনজন্মা দলের/ তিনি শুধু দিতে জানতেন/ নিতে জানতেন না/ মানুষের ভালোটাই দেখতেন/এবং কীভাবে প্রশংসা করতে হয়/ সেটা জানতেন খুব ভালো করে..’। পংক্তিগুলো কবি বেলাল চৌধুরী স্মরণে কবি রবিউল হুসাইনের লেখা একটি কবিতার অংশ। তার এই কবিতার সঙ্গে কবির নিজের জীবন-চরিত্রও মিলেমিশে একাকার। তিনি দেশ, জাতি, সমাজ, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি- সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুকে অনাগত প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সারাজীবন নিস্বার্থ এবং নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তার সেই অনাবদ্য সৃষ্টি নিয়ে তিনি নিজেই জানিয়েছেন তার অভিব্যক্তি। যেখানে তরুণ প্রজন্মের লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য রয়েছে দিক-নির্দেশনা। ‘লেখালেখি করলে পড়াপড়ি করতেই হবে’: সাহিত্য চর্চা প্রসঙ্গে কবি রবিউল হুসাইনের বিখ্যাত উক্তি, ‘লেখক প্রথম সারির পড়ুয়া না হয়ে পারেন না।’ তিনি বলতেন, আমরা জানি লিখতে হলে পড়তে হবে। আসলে যারা লেখালেখি করে তাদের পড়াপড়ি করতেই হবে। আমার মনে হয় বা মনে করি লেখক প্রথম সারির পড়ুয়া না হয়ে পারেন না। লেখা যা হয় তা তো পড়ার জন্য এবং যিনি লিখবেন তিনি যদি পড়াশোনা না করেন তাহলে অন্যজনেরা কি লিখেছেন বা লিখছেন সে খবর কীভাবে জানবেন। তার নিজের শিক্ষার ও জ্ঞানের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির জন্য পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। কোথায় কী হচ্ছে সাহিত্যের জগতে, কারা লিখছেন, কেমন লিখছেন, সেগুলোর সঙ্গে নিজের বা সামগ্রিকভাবে দেশের সাহিত্য কোন পথে এগুচ্ছে, কতটুকু ও কীভাবে চলমান, সেইসব জানার জন্যই পড়তে হবে। তাই বলা যায়, পড়া মানে জানা। অপরের সাহিত্য-খবর জানতে গেলে পড়তে হবে। অতীতকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই স্রোতধারা নিঃশব্দে বয়ে চলেছে লেখক আর বইয়ের ভেতর দিয়ে পাঠকের মনোশ্চক্ষু বরাবর। নিজের সম্পর্কে তার মূল্যায়ন ছিল ঠিক এরকম, আমার সেই হিসেবে পড়াশোনা তেমন গভীর ও বিস্তৃত নয়। আমাকে তাই মধ্যম শ্রেণীর পড়ুয়া হিসেবে চিহ্নিত করলে যথাযথ হয়। তবে তিনি সব ধরনের বিষয় নিয়ে পড়তে পছন্দ করতেন। তার কথায়, যেহেতু সব ধরনের লেখা যেমন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বিশেষ করে বহমান সংস্কৃতি, চিত্রশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, চলচ্চিত্রশিল্প ইত্যাদি সম্বন্ধে একটু লেখালেখি করতে হয়, তাই পড়াশোনার পরিধি বেশ ছড়ানো ছিটানো। কিন্তু সঙ্গত কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না। বলা যায়, সবকিছুকে যেন একটু ছুঁয়ে ছুঁয়ে অগ্রসর হওয়া। তাই কোনো বিষয়েই বিশেষভাবে সফলতার মুখ দেখা হয় না বা সেইভাবে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। পেশায় একজন স্থপতি ছিলেন কবি রবিউল হুসাইন। তবে সাহিত্যচর্চা তার কাছে ছিল নেশার মতো। নিজে পেশা ও নেশা সম্পর্কে তার বক্তব্য, স্থাপত্যপেশার চর্চায় এখনো ব্যতিব্যস্ত থাকি জীবিকা ও পেশার তাগিদে। সাহিত্যচর্চা নেশার মতো এক অদৃশ্য ও রহস্যময় অস্তিত্বের নির্দেশে এসব সমাধা করে থাকি। কতটুকু হয় শিল্পমূল্যের দিক থেকে তা কেমন; এসবের দিকে গুরুত্ব দিই না বা দেয়াও যায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও করে যেতে হয়, এটিই বড় কথা। লিখে যেতে হবে। লিখতে লিখতে ক্লান্তি আসবে, তবুও।
সাহিত্য সৃষ্টি ও গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, পাঠক এবং সর্বোপরি সময় ও কাল এদের দ্বারাই মূল্য তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। লেখার দায়িত্ব যেমন লেখকের তেমনি তুল্যমূল্য বিচারে টিকে থাকবে নাকি থাকবে না বা কতকাল থাকবে এসবের দায়িত্ব সময়কালের। ব্যক্তিগতভাবে তাই সার্বিক প্রেক্ষিতে আমি মনে করি, এইসব নিয়ে বিততিক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে অপ্রয়োজনীয়। ভবিষ্যত্ বা মহাকাল যদি গ্রহণ করে করবে, যদি না করে করবে না, এতে কিচ্ছুটি যায় আসে না। মোদ্দা কথা, তাহলে এরকম দাঁড়াল যে, লেখা চালিয়ে যাওয়া মুখ্য অন্যসব গৌণ। নিজের জীবন দর্শন সম্পর্কে কবি রবিউল হুসাইনের মত, আমি সম্পূর্ণভাবে এমনিতেই অদৃষ্টবাদী। কোনো কিছুতে বিশ্বাস করি না। জ্ঞানত করতে পরি না। অনিচ্ছাকৃত জন্মলাভ করেছি দৈবাত্ কোনো এক প্রতিশক্তির কারণে। তাই বলি সেই প্রেক্ষিতে যতদিন পারি লিখে যাব, এবং সময়-বর্তমান ও ভবিতব্য যদি গ্রহণ করে ভালো, যদি না করে সেটাও ভালো। একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে কবির দেশ-সমাজ নিয়েও ভাবনার কমতি ছিল না। তার মতে, ..আর একটি কথা মনে হয় যে, আমাদের দেশের মতো দরিদ্র, শিক্ষার হার কম এমন কৃষিনির্ভর স্বধর্মথ ধর্মে দিক্ষিত বিপুল জনঅধ্যুষিত জনপদেই একমাত্র সম্ভব সব্যসাচী নামীয় একশ্রেণীর লেখক হওয়ার, যারা সব সাহিত্য মাধ্যমেই কমবেশি সৃষ্টি করার প্রয়াস পান। বিশেষ করে সপ্তাহান্তে সাহিত্য বাসর যেগুলো দৈনিক খবরের কাগজে ছুটির দিনে প্রকাশ পায়- সেগুলোতে। এই সর্বমাধ্যমে ব্যস্ত লেখক হিসেবে এমন কাউকে আজকাল অন্যদেশে খুব একটা দেখা যায় না। বোধ হয় সেইমতো লেখক আমি একজন, ওইরূপ এক তথাকথিত অসম্পূর্ণ সভ্যসাচী যে সাহিত্য চর্চায় নিমগ্ন। শিল্প-সাহিত্য চর্চা এবং তাতে সফল-অসফল হওয়া এক রহস্যময় বিষয় আর তাই সবার কাছে এটি আকর্ষণীয় ও অব্যক্ত-অনির্ধারিত কার্যক্রম। তাই কোনো কিছুই হলাম না, না স্থপতি, না কবি, না গাল্পিক, না প্রাবন্ধিক- কোনো কিছুতেই সাফল্য লাভ হল না এবং সবচেয়ে উল্লেখ্য যে, তাতে আমার কোনো দুঃখ বা আফসোস নেই। হলে হবে, না হলে হবে না, তাই না! নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি এভাবেই অকপটে সোজা সাপটা কথা বলেছেন।
তার বর্ণাঢ্য জীবন: ১৯৪৩ সালে জন্ম নেয়া রবিউল হুসাইন গতকাল মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) মারা যান। ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে একুশে পদক পাওয়া কবি ও সাহিত্যিক রবিউল হুসাইন কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের জন্যও। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্রের ট্রাস্টি। সেইসঙ্গে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন রবিউল হুসাইন। ঝিনাইদহের শৈলকূপার সন্তান রবিউল হুসাইনের জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি। কুষ্টিয়ায় মেট্রিক আর ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে তিনি ভর্তি হন ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজির (বর্তমান বুয়েট) আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টিতে। ষাটের দশকে ছাত্র থাকাকালেই তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস মিলিয়ে দুই ডজনের বেশি বই রয়েছে তার। ১৯৬৮ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং স্থপতি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পেশায় রবিউল ছিলেন স্থপতি। তার নকশায় বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিসার্চ কাউন্সিল (বিএআরসি) ভবনটি ছিল তার প্রিয় একটি কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট, ভাসানি হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল, খালেদা জিয়া হল, ওয়াজেদ মিয়া সায়েন্স কমপ্লেক্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়াম ও একাডেমিক ভবন কমপ্লেক্স নির্মিত হয়েছে রবিউল হুসাইনের নকশায়। বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য রবিউল শিশু কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় কচি কাচার মেলা, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটেও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার লেখা উল্লেখযোগ্য বই: ‘কী আছে এই অন্ধকারের গভীরে’, ‘আরও ঊনত্রিশটি চাঁদ’, ‘স্থিরবিন্দুর মোহন সংকট’, ‘কর্পূরের ডানাঅলা পাখি’, ‘আমগ্ন কাটাকুটি খেলা’, ‘বিষুবরেখা’, ‘দুর্দান্ত’, ‘অমনিবাস’, ‘কবিতাপুঞ্জ’, ‘স্বপ্নের সাহসী মানুষেরা’, ‘যে নদী রাত্রির’, ‘এইসব নীল অপমান’, ‘অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ’, ‘দুরন্ত কিশোর’, ‘বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘গল্পগাথা’, ‘ছড়িয়ে দিলাম ছড়াগুলি’ ইত্যাদি।
পুরস্কার অর্জন: একুশে পদক ছাড়াও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও সার্চ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এই কবি। তবে তিনি তার অম্লান সৃষ্টির মাধ্যমে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন মনব হূদয় মন্দিরে।
শেষ করছি কবি রবিউল হুসাইনের ‘স্বাধীনতা স্বাধীন স্বাধীনতায়’ কবিতাটি দিয়ে-
আমাদের সুখগুলো বিষণ্ন হলে
দুঃখগুলো হেসে ওঠে
আনন্দরা অশ্রুসজল হলে
বেদনারা পুলকিত বোধ করে
বিখ্যাত ব্যক্তিগণ আরো খ্যাতি পান
যাবতীয় খ্যাতি লোপ করে
কুখ্যাতরা যাবতীয় কুকর্ম করে
আরো কুখ্যাত হন এবং এভাবে
অতিখ্যাতি লাভ করেন
সম্মানীয়রা আরো সম্মানিত হন
নিজেদের সম্মান হারিয়ে
অসম্মানীয়রা আরো অসম্মানিত হন
সমাজে সম্মান অর্জন করে
কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্যদের
অপমানিত করে থাকেন হীনমন্যতায়
নিজেদের তথাকথিত ব্যক্তিত্ব বাড়াতে
আর বেচারা অন্যজনেরা তাদের দ্বারা
ব্যক্তিত্ব হারিয়ে নিজেদের
শুধু শুধু বিশিষ্ট ভাবেন
নিঃস্বতা নিঃশূন্য খুব সবকিছু পেয়ে
পূর্ণতা পরিপূর্ণতা পায় সর্বস্ব হারিয়ে
বিজয়ী জয়ী হয় অপরাজয়ে
পরাজয়ী হেরে যায় বিজয়ী হয়ে
পরাধীনতা পরাধীন পরাধীনতায়
স্বাধীনতা স্বাধীন স্বাধীনতায়।

