বিশ্বজুড়ে প্রশংসায় ভাসছেন ব্রিটিশ মুসলিম নারী
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২৭ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৫৮
লন্ডনে গত শুক্রবার চলন্ত ট্রেনে এক যুবক যখন এক ইহুদি পরিবারের মুখের সামনে তাদের ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর কথা বলছিলেন, তখন প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছিলেন আসমা শুয়েখ নামে এক ব্রিটিশ মুসলিম নারী। অবমাননাকারী যুবকের সাথে হিজাব পরা আসমা শুয়েখের বাক-বিতণ্ডার ঘটনা মোবাইল ফোনে ভিডিও করে তার টুইটারে পোস্ট করেন আরেক যাত্রী। তারপর থেকে এই ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াও মূলধারায় সংবাদ মাধ্যমেও তুমুল চর্চা চলছে। খবর বিবিসির। এতে বলা হয়, সহযাত্রী পরিবারের পক্ষ নিয়ে ইহুদিবিদ্বেষী কথাবার্তা বলার বিরুদ্ধে সাহস করে রুখে দাঁড়ানোর জন্য টুইটারে সারা বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ আসমা শুয়েখকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আসমা শুয়েখ বিবিসিকে বলেছেন, ‘এত প্রশংসা আমার প্রাপ্য নয়, আমার সামনে এমন ঘটনা ঘটলে আমি আবার মাথা গলাবো।’
কী হয়েছিল ট্রেনে?: লন্ডনের পাতাল রেলে নর্দার্ন লাইন রুটের একটি ট্রেনের যাত্রী ছিল একটি ইহুদি পরিবার। এক বাবা এবং তার দুই বাচ্চা ছেলে। তাদের তিনজনের মাথায় ছিল ‘কিপা’ বা ছোটো টুপি- যেগুলো ধর্মপ্রাণ ইহুদি পুরুষরা ব্যবহার করেন। হঠাত্ করে ট্রেনের ঐ কামরার যাত্রী এক যুবক পরিবারটিকে লক্ষ্য করে জোর গলায় ইহুদি ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর কথাবার্তা শুরু করে। সে বলতে থাকে- ‘ইহুদিরাই যীশু খ্রিষ্টের হত্যাকারী ছিল।’ তার কথার সমর্থনে ব্যাগ থেকে বাইবেল বের করে সংশ্লিষ্ট কিছু অনুচ্ছেদ থেকে তাদের পড়ে শোনাতে শুরু করে। এক পর্যায়ে পাশে দাঁড়ানো আসমা শুয়েখ ঐ যুবককে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে তাকে চুপ করতে বলেন। শুরু হয়ে যায় তাদের দুজনের মধ্যে বাদানুবাদ। ক্রিস আ্য্যটকিন্স নামে এক যাত্রী আসমা এবং ঐ যুবকের তর্কাতর্কি মোবাইল ফোনে ভিডিও করে তার টুইটার অ্যাকাউন্টে পোস্ট করার পরপরই তা নিয়ে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। আসমা শুয়েখ সাংবাদিকদের বলেন, তার এক বন্ধু পরদিন তাকে জানায় যে, তাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক চর্চা চলছে, প্রশংসায় ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাকে।
প্রশংসায় ভাসছেন আসমা: গত সোমবার রাত পর্যন্ত ক্রিস অ্যাটকিন্সের ঐ ভিডিও ফুটেজটি ৫৫ লাখ বার শেয়ার হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ এ নিয়ে মন্তব্য করছেন। প্রখ্যাত ব্রডকাস্ট সাংবাদিক সুজি পেরি টুইটারে লিখেছেন, ‘এই নারী একজন অসাধারণ মানুষ।’ মার্টিনএইচবিওয়েবার নামে একজন লিখেছেন, ‘একজন মুসলিম এক ইহুদি বাবা এবং তার বাচ্চাদের রক্ষায় এগিয়ে আসছে দেখে আমার এই প্রিয় দেশ সম্পর্কে আমি নতুন করে আশাবাদী হচ্ছি।’ ইউরোপীয় সংসদের এমপি ল্যান্স ফোরম্যান লিখেছেন, ‘পাঁচ মিনিটে এই নারী মুসলিম-ইহুদি সম্পর্কে যে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন তা মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন ১০ বছরেও পারেনি।’ শুধু ব্রিটেন নয়, আমেরিকা, ইসরায়েলসহ বিশ্বের বহু দেশে থেকে গত কদিন ধরে আসমাকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিবিসিকে আসমা শুয়েখ বলেছেন, ‘এমন ঘটনা চোখের সামনে দেখলে আবারো হস্তক্ষেপ করতে তিনি দুবার ভাববেন না।’ তিনি বলেন, বিশেষ করে দুটো বাচ্চার সামনে এভাবে তাদের ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা তিনি সহ্য করতে পারেননি। ‘আমার নিজেরও দুটি বাচ্চা রয়েছে। আমি জানি, এমন অবস্থার মুখোমুখি হলে তাদের কেমন লাগতো। সত্যি কথা বলতে কি, একজন মা হিসেবে, একজন ধার্মিক মুসলিম হিসেবে, এদেশের (ব্রিটেন) নাগরিক হিসেবে আমার মনে হয়েছিল, আমার কিছু করা উচিত্। …আপনি সবসময় চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে পারেন না’, বলছিলেন আসমা। প্রধানত ফিলিস্তিনি ইস্যুতে মুসলিমদের সাথে ইহুদিদের সম্পর্কে একটি টানাপড়েন রয়েছে। আর সে কারণে ইহুদি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে একজন হিজাব পরিহিত মুসলিম নারীর এই প্রতিবাদ নিয়ে অসামান্য সাড়া পড়েছে। ইহুদি ঐ সহযাত্রী বাবা নিজে ফুল নিয়ে আসমা শুয়েখের সাথে দেখা করে তাকে এবং তার বাচ্চাদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। ইহুদিদের এবং মুসলিমদের বিভিন্ন সংগঠনও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। আর যে যুবকের বিদ্বেষমূলক কথার প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছিলেন আসমা, তাকে পুলিশ আটক করেছে।

